এআইভিত্তিক চীনা প্রযুক্তি বদলাতে পারে বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা
ছবি- এআই দিয়ে তৈরি
জাহিদুর রহমান, গুয়াংজু (চীন) থেকে
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ড্রোন ব্যবহার করে ফসলের মাঠে সার দেন চীনের আনহুই প্রদেশের ৮২ বছর বয়সী কৃষক দাই শুইং। ড্রোন দিয়ে ভিডিও ও ছবি তুলে অনলাইনে বিক্রি করেন নিজের উৎপাদিত কৃষিপণ্য। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর পরিচিতি ‘হার্ডকোর গ্র্যান্ডমা’ নামে। ড্রোন চালানো থেকে শুরু করে অনলাইনে পণ্য বিক্রি, সবকিছুতেই প্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছেন এই প্রবীণ কৃষক। দাই শুইংয়ের গল্প চীনের কৃষিপ্রযুক্তিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। কৃষিকাজে ড্রোনের ব্যবহার শুধু শ্রম ও সময় বাঁচাচ্ছে না, উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার নতুন সুযোগও তৈরি করছে।
চীনের গুয়াংজুতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য মেলা ক্যান্টন ফেয়ারে গিয়ে দেখা গেল, কৃষিতে প্রযুক্তির এই পরিবর্তন এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। মেলায় কৃষি ড্রোনের জন্য তৈরি করা হয়েছে আলাদা প্রদর্শনী অঞ্চল। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আধুনিক ড্রোন দেখতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। ইউরোপ, পশ্চিমা দেশসহ বিভিন্ন দেশের ক্রেতারা এসব ড্রোনের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন, অর্ডারও দিচ্ছেন। মেলায় প্রদর্শিত প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে ফসলের মাঠে সার, বীজ ও কীটনাশক প্রয়োগের ড্রোন, জমির অবস্থা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা এবং তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক স্মার্ট কৃষিপ্রযুক্তি। বাংলাদেশের কৃষিতেও এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। জমিতে প্রয়োজন অনুযায়ী সার ও পানি প্রয়োগ, রোগ শনাক্তকরণ, কীটনাশকের ব্যবহার কমানো এবং দুর্যোগের আগাম সতর্কতা দিতে পারে এআইভিত্তিক কৃষিব্যবস্থা। এতে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি কৃষকের সময় ও শ্রম সাশ্রয় হতে পারে। তবে প্রযুক্তিগুলো দেশের ক্ষুদ্র জমি, কৃষকের সামর্থ্য এবং স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ব্যবহার করতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
১৯৫৭ সালে যাত্রা শুরু করা ক্যান্টন ফেয়ার চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। বসন্ত ও শরৎ–দুই মৌসুমে অনুষ্ঠিত এই মেলায় এবার ৩২ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৯০০টি প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছে। ফেয়ারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের ড্রোন প্রদর্শন করছে। কোনোটি দিয়ে জমিতে সার ও কীটনাশক ছিটানো যায়, কোনোটি ব্যবহার করা যায় ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণে। চীনের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এক্সএজি কৃষি ড্রোন, এআই, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবহার করে স্মার্ট কৃষিব্যবস্থার উন্নয়ন করছে। তাদের প্রযুক্তির সাহায্যে জমির মানচিত্র তৈরি এবং নির্দিষ্ট স্থানে প্রয়োজন অনুযায়ী সার, বীজ বা কীটনাশক প্রয়োগ করা যায়। মেলায় প্রদর্শক শান চাওছুন জানান, এবারই প্রথম তারা ক্যান্টন ফেয়ারে অংশ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে চারটি দেশের ক্রেতাদের সঙ্গে প্রায় ১০০ ইউনিট ড্রোনের অর্ডার চূড়ান্ত হয়েছে। তারা বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতে চীনের ড্রোন ও রোবট বিশ্ববাজারে আরও ছড়িয়ে যাবে।
বাংলাদেশের কৃষকরা সাধারণত জমির অবস্থা, গাছের রং, মাটির আর্দ্রতা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন। কখন সেচ দিতে হবে, কোথায় সার কম পড়েছে কিংবা কোন গাছে রোগ ধরেছে, তা নির্ধারণে স্থানীয় পরামর্শের ওপরও নির্ভর করতে হয়। কিন্তু জমির প্রতিটি অংশের অবস্থা এক রকম হয় না। ফলে এখানে কাজে আসতে পারে এআইভিত্তিক স্মার্ট কৃষি।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল পান্না ক্যান্টন ফেয়ার ঘুরে বলেন, চীনে কৃষিতে ড্রোনের ব্যবহার অনেক আগে থেকেই চলছে। তবে চীনের স্মার্ট কৃষির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কাজে লাগাতে হলে শুধু ড্রোন আমদানি যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে স্থানীয় গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা ও সহজলভ্য প্রযুক্তিসেবা। চীনের কৃষিপ্রযুক্তির যে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের জন্যও একটি সুযোগ। তবে বাংলাদেশের কৃষিতে প্রযুক্তির সাফল্য নির্ভর করবে সেটি কতটা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও কার্যকর তার ওপর। বাংলাদেশের কৃষিজমি ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত। ফলে অনেক কৃষকের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে ড্রোন বা সেন্সর কেনা সম্ভব নয়। তাই সমবায় কিংবা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ড্রোন ব্যবহারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ক্যান্টন ফেয়ারে প্রথমবার এসেছেন কৃষিবিদ আমিরুল হক টিপু। টিপু বলেন, ‘ক্যান্টন ফেয়ারে যে কৃষিপ্রযুক্তি দেখেছি, তা আমাদের দেশের কৃষিব্যবস্থার জন্য খুবই উপযোগী।’ তবে শুধু উৎপাদন বাড়াতে প্রযুক্তি ব্যবহারের সাফল্য হিসেবে দেখতে চান না এই কৃষিবিদ। তিনি বলেন, কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, অপচয় রোধ, শ্রম সাশ্রয় এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়াকে দক্ষ করে তোলা হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
চীনের কৃষি গবেষণা ও গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের প্রধান জাতীয় প্রতিষ্ঠান চায়নিজ একাডেমি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের পিএইচডি গবেষক মো. সোলায়মান হোসেন বলেন, বাংলাদেশের কৃষির বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি জলবায়ু পরিবর্তন। অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এআইভিত্তিক পূর্বাভাসব্যবস্থা কাজে লাগতে পারে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, নদীর পানির উচ্চতা, মাটির আর্দ্রতা, স্যাটেলাইটের ছবি ও অতীতের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনো অঞ্চলে বন্যা বা অতিরিক্ত পানির ঝুঁকি বাড়ছে কিনা, তা নিরূপণের চেষ্টা করা যায়। এর ভিত্তিতে কৃষককে ফসল কাটার উপযুক্ত সময়, বিকল্প ফসল নির্বাচন কিংবা সেচব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আগাম পরামর্শ দেওয়া সম্ভব।
- বিষয় :
- প্রযুক্তি