নারায়ণগঞ্জে ৭ খুন, কক্সবাজারে সিনহা ও আবরার হত্যা মামলার আপিল শুনানি নভেম্বরে
ছবি: ফাইল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:৫৯
নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন, কক্সবাজারে মেজর (অব.) সিনহা হত্যা ও বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চূড়ান্ত আপিল দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পৃথক এ তিন মামলার আপিল শুনানির জন্য রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের বিচারপতি মোহাম্মদ রেজাউল হক আজ রোববার এসব তারিখ নির্ধারণ করেন।
তারিখ অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার আপিল শুনানি শুরু হবে আগামী ১৭ নভেম্বর। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার আপিল শুনানি ২৪ নভেম্বর এবং কক্সবাজারে মেজর (অব.) মোহাম্মদ রাশেদ খান সিনহা হত্যা মামলার আপিল শুনানির জন্য ১ ডিসেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে। এসব তারিখে আপিল শুনানি শুরু হবে বলে আশা করছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
আজ রোববার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, এসব মামলা শুধু কয়েকটি পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করেছে। আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় নিজ উদ্যোগে মামলাগুলো দ্রুত শুনানির জন্য আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
তিনি আরও বলেন, আপিল শুনানির জন্য কিছু পদ্ধতিগত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। একই রায় থেকে একাধিক আসামির পৃথক আপিল বা লিভ টু আপিল থাকায় একটি মামলার সঙ্গে একাধিক আবেদন যুক্ত থাকতে পারে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় বিভিন্ন আসামির করা ২১টি আপিল এবং বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের ১৬টি ফৌজদারি আপিল শুনানির জন্য আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় অতিরিক্ত ১৪টি আপিলের বিষয়ও আদালতের নজরে আনা হয়েছে। মেজর সিনহা হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাসের আপিলসহ সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলোও শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিচারক-সংকট ও দ্রুত বিচার নিয়ে যা বললেন অ্যাটর্নি জেনারেল
আলোচিত এসব মামলার শুনানির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ায় অন্য মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় বৈষম্য তৈরি হবে কি না; এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার কাজল বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা একপক্ষের বিষয় নয়; এটি সব পক্ষের অধিকার। অপরাধী যেন তার প্রাপ্য সাজা পান, আবার নিরপরাধ কেউ যেন সাজা না পান; এ নীতিতে অটল থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিচারক-সংকট, মামলার স্তূপ এবং আদালতের ব্যস্ততার কারণে সব মামলার শুনানি প্রত্যাশিত সময়ে করা কঠিন। আপিল বিভাগে আগের তুলনায় বিচারকের সংখ্যা কম রয়েছে। তবে কতজন বিচারক প্রয়োজন এবং কাদের নিয়োগ দেওয়া হবে, তা সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের বিষয়।
সাত খুনের মামলা
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে অপহরণ করা হয়। ঘটনাটি দেখে ফেলায় আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিমকেও অপহরণ করা হয়। তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে ছয়জনের মরদেহ পাওয়া যায়। পরদিন উদ্ধার করা হয় আরও একজনের মরদেহ।
২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের আদালত এ মামলায় র্যাব-১১-এর সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন, কমান্ডার এম এম রানাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এ ছাড়া নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ১১ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। স্বল্পমেয়াদি কারাদণ্ড পাওয়া নয়জনের সাজাও বহাল থাকে। এসব রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন দণ্ডিত ব্যক্তিরা।
আবরার হত্যা মামলা
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আবরারের বাবা রমজান আলীর দায়ের করা মামলায় ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে হাইকোর্ট ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন দণ্ডিত ব্যক্তিরা।
মেজর সিনহা হত্যা মামলা
২০২০ সালের ৩১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় করা মামলায় ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের আদালত ১৫ আসামির মধ্যে দু’জনকে মৃত্যুদণ্ড, ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং সাতজনকে খালাস দেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দু’জন হলেন টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাস এবং শামলাপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের বরখাস্ত পরিদর্শক লিয়াকত আলী। ২০২৫ সালের ২ জুন হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। এরপর দণ্ডিত ব্যক্তিরা আপিল করেন। এসব মামলা আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
- বিষয় :
- নারায়ণগঞ্জ