ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

রূপপুরের বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ এক বছর পর

রূপপুরের বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ এক বছর পর
×
×

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (ছবি: সংগৃহীত)

 হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ লাগতে পারে। এ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে আরও এক বছর লাগতে পারে। এর মধ্যে কয়েক মাস চলবে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। চুল্লির ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পরই নিয়মিত বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে কেন্দ্রটি।

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) প্রথম ইউনিটের পরবর্তী পর্যায়ের কাজ শুরুর অনুমোদন দেয়। এ পর্যায়কে বলা হয়, পাওয়ার স্টার্টআপ বা সি-স্টেজ (তাপ উৎপাদন প্রক্রিয়া)। অনুমোদনের পর গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টা ৩ মিনিটে এ পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয়। চুল্লির ভেতরে চাপ ও তাপমাত্রা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এ প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তাপ তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি চালুর প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সি-স্টেজে চুল্লির ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে চুল্লি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, টারবাইন, জেনারেটর, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। এসব পরীক্ষার উদ্দেশ্য হলো, বিভিন্ন ক্ষমতায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নিরাপদ ও স্থিতিশীলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব কিনা, তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে তাপ থেকে বাষ্প তৈরি, সেই বাষ্পের চাপে টারবাইন ঘোরানো এবং জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া যাচাই করা হবে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি সাধারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো হলেও এখানে তাপ তৈরির উৎস আলাদা। চুল্লির ভেতরে ইউরেনিয়াম জ্বালানির পরমাণু ভাঙার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়। এ প্রক্রিয়াকে পারমাণবিক বিভাজন বলা হয়। উৎপন্ন তাপে পানি গরম হয়ে বাষ্প তৈরি করে। সেই বাষ্পের চাপে ঘোরে টারবাইন। টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর ঘুরে বিদ্যুৎ তৈরি করে। অর্থাৎ, চুল্লিতে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হওয়া মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু নয়। তাপ থেকে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ও জেনারেটর চালু হওয়ার পরই বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।

বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চুল্লির তাপ উৎপাদনক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ পর্যায়ে পৌঁছলে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা নির্ভর করবে সব পরীক্ষার ফল এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ওপর।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাছান সমকালকে জানান, সি-স্টেজে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে। চুল্লির ক্ষমতা শূন্য থেকে ৩০ শতাংশে পৌঁছলে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর পর সাত থেকে আট মাস পর্যন্ত বিভিন্ন পরীক্ষা চলতে পারে। এ সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার প্রক্রিয়া হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কারিগরি ভাষায় একে সিঙ্ক্রোনাইজেশন বলা হয়। 

তবে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হলেই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে না। সি-স্টেজের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রটির পরীক্ষামূলক পরিচালনা, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ও নিরাপত্তা যাচাই করতে হবে। বিভিন্ন ক্ষমতায় কেন্দ্রটি নির্ভরযোগ্যভাবে চলছে কিনা, তাও নিশ্চিত করা হবে। এর পর প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক পরিচালনায় যেতে হবে। অর্থাৎ, গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়া আর নিয়মিত বাণিজ্যিক উৎপাদন এক বিষয় নয়।

এর আগে ১১ অক্টোবর রূপপুরের প্রথম ইউনিটে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়। সেপ্টেম্বরে এ কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় তা পিছিয়ে যায়। পরে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করে বায়েরা থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় শুরুর আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়।
প্রথম ইউনিট থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল পরিকল্পনা ছিল। তবে কভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন এবং কারিগরি জটিলতার (যেমন- সেফটি ভালভের ত্রুটি) কারণে এই সময়সূচি বারবার পিছিয়েছে।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মা নদীতীরে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে। দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে। প্রকল্পের বর্তমান ব্যয় এক লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিদ্যুতের দাম নিয়ে আলোচনা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য এখনও চূড়ান্ত হয়নি। পিডিবির প্রাথমিক হিসাবে, সম্ভাব্য দাম প্রতি ইউনিট ছয় টাকা ৭২ পয়সা। অন্যদিকে, প্রকল্প কর্তৃপক্ষের হিসাবে সরাসরি উৎপাদন ব্যয় চার থেকে ছয় টাকা। তবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, বীমা এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার খরচ যুক্ত হলে দাম আরও বাড়বে।

গত ২০ মে বিদ্যুতের দাম নিয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানান, রূপপুরের বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের জন্য কেন্দ্রটির মোট প্রকল্প ব্যয় এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ায় তখন প্রাথমিকভাবে অনুমানের ভিত্তিতে প্রতি ইউনিটের দাম ছয় টাকা ৭২ পয়সা ধরা হয়েছে।
রূপপুর প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কেন্দ্রটির সরাসরি উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট চার টাকা ৩১ পয়সার মতো। তবে এ হিসাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, বীমা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সব ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নেই। এসব খরচ যুক্ত হলে প্রতি ইউনিটের দাম বাড়বে। প্রকল্প শুরুর সময় সরকার জানিয়েছিল, সম্ভাব্য ইউনিটপ্রতি দাম ছয় টাকা হতে পারে।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, রূপপুরের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে। এ প্রাক্কলনে প্রকল্প নির্মাণের ব্যয়, ঋণের সুদ, জ্বালানি, ব্যবহৃত জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্র পরিচালনার ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে এটিও হিসাব, চূড়ান্ত ক্রয়মূল্য নয়। ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার বাড়লে প্রকল্পের ব্যয় ও বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে।

রূপপুরের বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে পিডিবি ও এনপিসিবিএলের মধ্যে আলোচনা চলছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) খসড়া নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তবে পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণসহ কেন্দ্রের বিভিন্ন ব্যয়ের হিসাব চূড়ান্ত না হওয়ায় প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারণ করা যায়নি। এসব ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব চূড়ান্ত হলেই বিদ্যুতের দাম ও ক্রয়-বিক্রয়ের শর্ত নির্ধারিত হবে। এর পর পিপিএ সই হবে।

ভারতের সরকারি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোম্পানি নিউক্লিয়ার পাওয়ার করপোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেডের (এনপিসিআইএল) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের কেন্দ্রগুলোর গড় বিদ্যুৎ বিক্রয়মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ৩ দশমিক ৯০ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা প্রায় পাঁচ টাকা ৮ পয়সা। তবে  খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, ভারতের কেন্দ্রগুলোর গড় বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে রূপপুরের সম্ভাব্য দামের সরাসরি তুলনা করা কঠিন। কারণ নির্মাণ ব্যয়, ঋণের শর্ত, পরিচালন ব্যয়, কেন্দ্রের বয়স এবং হিসাব পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে।

আরও পড়ুন

×