ডেঙ্গু পরিস্থিতি
ডেঙ্গুতে বছরের সর্বোচ্চ মৃত্যু অক্টোবরে, নভেম্বরেও ঝুঁকি
এক মাসে প্রাণ গেছে ১৭৪ জনের
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৯:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার লক্ষণ নেই। বছরের প্রথম ১০ মাসে এ রোগে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, এর মধ্যে সর্বোচ্চ প্রাণহানি ঘটেছে অক্টোবরে। এ মাসে মারা গেছেন ১৭৪ জন। একই সময়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৬ হাজার ৩৮০ জন।
এ পরিস্থিতিতে নভেম্বরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ অব্যাহত থাকার শঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বৃষ্টি হলে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়তে পারে। এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তবে মশার লার্ভার ঘনত্ব কমে আসায় নভেম্বরের শেষ দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কমতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, বৃষ্টি হলে নভেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অক্টোবরের চেয়েও খারাপ হতে পারে। অন্যদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশারের ধারণা, এডিস মশার লার্ভা কমে আসায় নভেম্বরের শেষের দিকে সংক্রমণ কিছুটা কমতে পারে। তবে নতুন করে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় মশার বংশবিস্তারের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৬৩৩ জন। এই সময়ে মারা গেছেন একজন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১৯-এ। আর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এক লাখ ৩৫ হাজারে পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছয় হাজার ২৩৬ জন। ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে, ৬০৪ জন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২৮১, বরিশালে ২৩৪, খুলনায় ২২৮, রাজশাহীতে ১৪৯, ময়মনসিংহে ৭০ ও রংপুরে ৬৭ জন ভর্তি হয়েছেন। সিলেটে নতুন কোনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হননি। এই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তি খুলনা বিভাগের বাসিন্দা।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম ছিল। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে মারা যান। মার্চ ও এপ্রিলে কোনো মৃত্যু হয়নি। মে মাসে একজন এবং জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। এর পর পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জন মারা যান। সর্বশেষ অক্টোবরে প্রাণ গেছে ১৭৪ জনের। অর্থাৎ, এক মাসে মৃত্যুর সংখ্যা আগের মাসের চেয়ে আরও বেড়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। ওই বছর আক্রান্ত হয়েছিলেন তিন লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ। মৃত্যু হয়েছিল এক হাজার ৭০৫ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন, মারা যান ৫৭৫ জন। আর ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজার ৮৬১। মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের।
বর্তমানে দেশে ডেঙ্গু, হাম ও ইনফ্লুয়েঞ্জার ভাইরাসে আক্রান্ত বেশি হচ্ছে। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে আরএসভি এবং অ্যাডিনোভাইরাসের মতো শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের সংক্রমণও মিলছে। তবে কোন ভাইরাসের কারণে এসব জ্বর হচ্ছে, তা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এসব জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট।
প্রতিষ্ঠানটির ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলম বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গু, হামসহ পরিচিত কয়েকটি রোগের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। এর বাইরে ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের সংক্রমণও থাকতে পারে। তবে নতুন কোনো ভাইরাস শনাক্ত হয়নি।
নভেম্বরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ অব্যাহত থাকার শঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ। তিনি বলেন, নিম্নচাপ বা অন্য কোনো কারণে বৃষ্টি হলে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়তে পারে। এতে নভেম্বরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অক্টোবরকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার কামড় থেকে বেঁচে থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশা সাধারণত বাসাবাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। দরজা-জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে মানুষকে কামড়ায়। তাই ঘরবাড়ি মশামুক্ত রাখতে হবে। বাসায় একটি মশা দেখা গেলেও সেটি মেরে ফেলতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইলেকট্রিক মশা মারার র্যাকেট ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত মশারি টানিয়ে ঘুমানোর পরামর্শ দেন তিনি।
নভেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে পারে বলে মনে করছেন কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, গত ১৫ দিনে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব কিছুটা কমেছিল। এতে সংক্রমণ কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে আবার বৃষ্টি শুরু হওয়ায় মশার বংশবিস্তার বাড়তে পারে। তাঁর ধারণা, নভেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ অক্টোবরের মতো তীব্র না-ও হতে পারে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল খাবার এবং উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। জ্বর ও শরীর ব্যথা কমাতে প্রয়োজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।