পাথর নিক্ষেপ প্রতিরোধ
ট্রেনে বসানো এআই ক্যামেরায় গলদ
৬০-৭০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চললেও ক্যামেরায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে না কোনো মুখ
তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৪ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৯:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে নেওয়া বিভিন্ন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর দুর্বৃত্তদের শনাক্তে ট্রেনে সিসি ক্যামেরা বসিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের ‘পর্যটক এক্সপ্রেসে’ পরীক্ষামূলকভাবে নাইটভিশন ক্যামেরা লাগানো হয়। ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে কয়েকটি স্থানে কিছু মুখ শনাক্ত করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারে পরিচালিত ক্যামেরা ‘সন্দেহজনক’ মুখ চিহ্নিত করছে। কিন্তু যখন মুখগুলো ক্যামেরায় ধরা পড়ে তখন তাদের পাথর ছুড়তে দেখা যায়নি। তাই সন্দেহের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। ট্রেনে বসানো সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনায় আরও কয়েকটি গলদ ধরা পড়ে।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল করে ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার গতিতে। এই গতিতে ট্রেন চললে সিসি ক্যামেরার ভিডিও-ছবি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে না। এতে পাথর নিক্ষেপকারীকেও নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। আবার ট্রেনের মাঝামাঝি দুই পাশে দুটি ক্যামেরা বসানো হলেও পেছনের দিকের বগিতে যদি পাথর কিংবা ঢিল ছোড়া হয়, তাহলে দুর্বৃত্তকে শনাক্তও করা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া সন্দেহভাজন মুখ শনাক্ত হলেও প্রকৃত দুর্বৃত্ত শনাক্ত করতে পারছে না এআই ক্যামেরাগুলো।
পরীক্ষামূলকভাবে গত ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রেনে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়। এরপর ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ দিনের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। এতে পাথর নিক্ষেপকারী শনাক্তের পাশাপাশি ক্যামেরায় কী ধরনের ত্রুটি রয়েছে, সেটাও শনাক্ত করেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সংকেত এবং টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলীরা। তাতে কিছু গলদ ধরা পড়ে। তাই আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসাতে চায় কর্তৃপক্ষ। এ জন্য আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে একাধিক ট্রেনে চার থেকে ছয়টি করে ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিয়েছেন তারা।
এদিকে ট্রেনে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পর পাথর নিক্ষেপের ঘটনা কমেছে। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় দুর্বৃত্তরা সতর্ক হয়েছে। এটাকে ক্যামেরার স্থাপনের একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান সংকেত এবং টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী তারেক মোহাম্মদ সামছ তুষার সমকালকে বলেন, ‘ট্রেনে বসানো সিসি ক্যামেরার ১০ দিনের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। দুয়েকটি স্থানে কিছু মানুষের মুখ ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। ক্যামেরাগুলো এআই অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন। মুখগুলোকে এআই সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে সেসব মানুষকে পাথর ছুড়তে দেখা যায়নি। নিশ্চিত না হয়ে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।’
এক প্রশ্নের জবাবে রেলের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে আমরা এটা নিয়ে আরও কাজ করতে চাই। এবার একাধিক ট্রেনে চার থেকে ছয়টি করে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে। পেছনে ক্যামেরা না থাকার কারণে পেছনের বগিতে ঢিল ছোড়া হলে শনাক্ত করা কঠিন। তাই ট্রেনের পেছনেও দুই পাশে দুটি কামেরা বসানো হবে। এতে পুরো ট্রেনই কামেরার আওতায় থাকবে।’
রেলওয়ে সূত্র জানায়, পাথর নিক্ষেপ আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, স্কুলশিক্ষক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময়, লিফলেট বিতরণ, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি এবং পুরস্কার ঘোষণা করেও পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে ট্রেনে অপরাধী শনাক্তে সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে।
২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পাথরের আঘাতে প্রীতি দাশ নামে এক নারী প্রকৌশলীর মৃত্যুর পর ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে প্রশাসনের। সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে। এই রুটের রামু, ইসলামাবাদ, ডুলাহাজারা, চকরিয়া ও হারবাং, লোহাগাড়া চুনতি এলাকায় কয়েক দিন পর পর পাথর ছোড়া হয়ে থাকে। গত দেড় বছরে এই রুটে ৫০টির বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছেন শতাধিক যাত্রী।
১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারা অনুযায়ী, যাত্রীদের ক্ষতির উদ্দেশ্যে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করলে সর্বনিম্ন ১০ বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।