ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

ঐতিহ্য

ঘোষ স্কয়ার ১৯৩৯

ঘোষ স্কয়ার ১৯৩৯
×
×

চট্টগ্রামের লালদীঘির পাড়ে শতবর্ষী রায় বাহাদুর রাজকুমার ঘোষ স্কয়ার ১৯৩৯ সমকাল

 আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৩ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম নগরীর লালদীঘির ২ দশমিক ৭০ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। দীঘির নিচের অংশে একটি ওয়াকওয়ে রয়েছে। ওপরের মূল সড়কের সঙ্গে মিলিয়ে রয়েছে আরেকটি ওয়াকওয়ে। দীঘির চারদিকে থাকা বাগান ফুল ও ফল গাছে ভরপুর। বিশ্রামের জন্য রয়েছে বেঞ্চও। তবে দীঘির উত্তর পাড়ে গোলাকৃতির গম্বুজবিশিষ্ট নান্দনিক একটি কুটির নজর কাড়ে সবার। গম্বুজের মাথার ওপর চিকন ‘ফিনিয়াল’ এখনও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। 

স্থাপত্যশৈলীর কারুকার্যে নির্মিত লাল কুটিরে খোদাই করে লেখা রয়েছে ‘রায় বাহাদুর রাজকুমার ঘোষ স্কয়ার ১৯৩৯’। দীঘির পাড়ে খোলামেলা প্রাকৃতিক পরিবেশে লাল কুটিরে বসে জমিদার রায় বাহাদুর অবসর সময় কাটাতেন। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর প্রায় শতবর্ষী সেই লাল কুটিরটি টিকে আছে।

রাজকুমারের অবসর সময় কাটানো কুটিরটি লাল-সাদা রঙে মঠের মতো তৈরি করা হয়। এতে রয়েছে নানা কারুকাজের নিদর্শন। লাল কুটিরটির দুপাশে দুটি পানির ফোয়ারা। ঘোষ স্কয়ারে যাওয়ার জন্য একটি লাল কার্পেটের মতো রাস্তাও তৈরি করেছিলেন রাজকুমার। লালদীঘি পার্কে যারাই ভ্রমণে যান, তাদের চোখে এ দৃশ্য ধরা পড়ে। সেই সঙ্গে দর্শনার্থীরা এক টুকরো ইতিহাসের সাক্ষী ও তথ্যে সমৃদ্ধ হতে পারছেন। রাজকুমার পরবর্তীকালে দীঘিটির মালিকানা চট্টগ্রাম পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করেন। এখন এটি সিটি করপোরেশন দেখাশোনা করছে। রায় বাহাদুর রাজকুমার চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার চিকদাইর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত লালদীঘি শুধু একটি জলাধার নয়; এটি বন্দরনগরীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক প্রতিবাদের প্রতীকী স্থান। লালদীঘির নাম উচ্চারিত হলেই ভেসে ওঠে বন্দরনগরীর রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক চর্চা ও নাগরিক জীবনের বাস্তব চিত্র। দেড়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে দীঘিটি ও উন্মুক্ত মাঠে পড়ে আছে বন্দরনগরীর ইতিহাসের প্রতিচ্ছায়া। 

বিশিষ্ট কবি, লেখক ও সাংবাদিক প্রয়াত ওহীদুল আলম তাঁর ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ বইয়ে উল্লেখ করেন, ‘১৭৬১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামের শাসনভার নেওয়ার পর এন্তেকালী কাছারি অফিসগুলো লাল রঙ দিয়ে সাজাতে শুরু করে। তাই লোকজন লালদীঘির লাল কুটিরকে লালকুঠির বলে। এটি পরবর্তী সময়ে লালঘর নামে পরিচিতি লাভ করে। লাল কুটিরে রাজকুমারের অবসরের সময় লাল পাগড়ি পরিহিত পাহারাদারেরা পাহারা দিতেন।’ 

ইতিহাস গবেষক কবি, লেখক ও সাংবাদিক শতদল বড়ুয়া বলেন, লালদীঘি কেবল চট্টগ্রাম নগরীর বৃহত্তম পুকুরই নয়; এটি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মতো অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষীও এটি। এখানে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের চুম্বক অংশ সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে যারাই আসেন, তারাই শতবছর আগের লালদীঘির গোড়াপত্তনের তথ্যে সমৃদ্ধ হন।

স্থানীয় বকশীরহাটের বাসিন্দা মো. আলম বলেন, বাবা-দাদার থেকে লালদীঘির জমিদারদের জমিদারির নানা গল্প শুনেছি। রাজকুমারের একটি ঘর দীঘিপাড়ে বিদ্যমান। এখন দীঘির চারপাশ ঘিরে থাকা পার্ক ও ওয়াকওয়েতে মানুষ দুই বেলা হাঁটাচলা ও সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে থাকেন। 

চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানার অদূরে শহরের প্রাণকেন্দ্রে ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে দীঘিটি খনন করা হয়। ইতিহাসবিদ আব্দুল হক তাঁর ‘পোর্ট সিটি চিটাগং’ বইয়ে লিখেছেন, লালদীঘিটির মালিক রায় বাহাদুর রাজকুমার ঘোষ ছিলেন বার্মার আকিয়াব প্রদেশের বিখ্যাত জমিদার। পরে তিনি দীঘিটি পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করেন। পুকুরটির দক্ষিণ দিকে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট বাকল্যান্ডের স্মৃতির উদ্দেশে একটি ঘাট ও একটি হলরুম নির্মাণ করা হয়েছিল। এ ছাড়া দীঘির পশ্চিম দিকে তৎকালীন কমিশনার স্যার হেনরি রকেটসের স্মরণে রকেটস ঘাট নামে আরেকটি ঘাট ছিল। দীঘির এক পাশে রানী ভিক্টোরিয়ার একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল, যা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় ধ্বংস হয়ে যায়।
 

আরও পড়ুন

×