ঢাকা সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

তীব্র গরমে ২০২৫ সালে দেশে আয়ক্ষতি ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা

ল্যানসেটের প্রতিবেদনে তথ্য

তীব্র গরমে ২০২৫ সালে দেশে আয়ক্ষতি ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা
×
×

ছবি: ফাইল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১২:১২

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। শুধু তীব্র গরমের কারণে ২০২৫ সালে দেশে আয়ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। একই সময়ে ১৯৮৬ ও ২০০৫ সালের তুলনায় তাপপ্রবাহের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি শিশুর মধ্যে ১৬২ শতাংশ ও প্রবীণদের মধ্যে ১৩৬ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, মানবসৃষ্ট সূক্ষ্ম কণাদূষণের কারণে ২০২৩ সালে বাংলাদেশে আনুমানিক ২ লাখ ৩৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

‘ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৬: স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা। জলবায়ু নীতিতে কার্বন নিঃসরণ কমানো ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রতিবেদনটির দশম বার্ষিক সংস্করণের শিরোনাম ‘এক দশকে বাড়তে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সবার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়’। এতে বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির অনেক সূচক আগের দশকের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে।

গতকাল রোববার ঢাকার ব্র্যাক সেন্টারে এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরা হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সি৩ইআর) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে কারিগরি সহায়তা দেয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ইউনিট (সিসিএইচপিইউ)। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবেশ অর্থনীতিবিদ শৌর্য দাশগুপ্ত।

অনুষ্ঠানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সি৩ইআরের পরিচালক গোলাম রব্বানী বলেন, গত দুই দশকে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে মূলত ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার মতো দুর্যোগকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এসবের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর যে প্রভাব পড়ে, তা তুলনামূলক কম গুরুত্ব পেয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ুনীতিতে কৃষি ও পানির পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব নীতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে। তীব্র গরমে কৃষক, বাইরে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ ও শহরের বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ডেঙ্গুও নিয়মিত জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এসব ঝুঁকি মানুষের স্বাস্থ্য, জীবিকা ও নিরাপদে কাজ করার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে। প্রতিবেদনের তথ্য কাজে লাগিয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, আগাম সতর্কতা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি জোরদার করার আহ্বান জানান এ পরিচালক।

গরমে বছরে ২৬ বিলিয়ন শ্রমঘণ্টা নষ্ট

মূল প্রবন্ধে শৌর্য দাশগুপ্ত বলেন, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গরমের কারণে প্রতিবছর গড়ে ২৬ বিলিয়নের বেশি শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের বার্ষিক গড়ের তুলনায় এই ক্ষতি ৭১ শতাংশ বেশি। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে এক বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬ ও ৭ দশমিক ২ দিন তাপপ্রবাহের মধ্যে কাটিয়েছে। ১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সালের তুলনায় এ হার যথাক্রমে ১৬২ ও ১৩৬ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের তাপজনিত মৃত্যুর আর্থিক মূল্য বছরে গড়ে ৩৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ২০০০ থেকে ২০০৪ সালের তুলনায় এ ক্ষতি ৪৯৫ শতাংশ বেশি।

বায়ুদূষণে মৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতি

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে মানবসৃষ্ট অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা (পিএম২.৫) বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩ সালে এ ধরনের দূষণজনিত মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল জীবাশ্ম জ্বালানি। একই বছরে গৃহস্থালি বায়ুদূষণের সঙ্গে ৭৭ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯০ হাজার ৭০০। বায়ুদূষণের কারণে অকালমৃত্যুর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ৭৬০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৬ দশমিক ৪ শতাংশের সমান।

অন্যদিকে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার কার্বন নিঃসরণ তীব্রতা ৯ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে জীবাশ্ম জ্বালানিতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫৩০ কোটি ডলার, যা জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের ৫২ দশমিক ৯ শতাংশের সমান।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক বলেন, ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৬ প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় (ন্যাপ) স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন এসব অঙ্গীকার বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে। বায়ুদূষণে ২ লাখ ৩৯ হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য দূষণ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের (সিএসডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আতিক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাপমাত্রা বাড়ায় শ্রমজীবী মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ছে। আগে উদ্যোগ নিলে মানুষকে এসব ক্ষতি থেকে আরও ভালোভাবে সুরক্ষা দেওয়া যেত।

বাড়তি অর্থায়ন প্রয়োজন

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পানিসম্পদবিষয়ক সরকারি সংস্থাগুলো স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু তথ্য সরবরাহ করছে। এসব তথ্য জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও কার্যক্রম গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বাংলাদেশের বক্তব্যেও টানা দ্বিতীয় বছরের মতো জলবায়ু ও স্বাস্থ্যের সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই বছর পর্যালোচনা করা জলবায়ু-সম্পর্কিত পাঁচটি আইনগত নথির মধ্যে দুটিতে স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এতে আরও বলা হয়, ৪৮টি উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য বছরে অন্তত ৩৩০ কোটি ডলার প্রয়োজন। অথচ ২০২৪ সালে এ খাতে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে মাত্র ১১০ কোটি ডলার, যা চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থ ও দক্ষ জনবলের অভাবকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনভিত্তিক ল্যানসেট কাউন্টডাউনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মেরিনা রোমানেলো বলেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতিতে কিছু অগ্রগতি হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যক্ষতি মোকাবিলায় বৈশ্বিক পদক্ষেপের চেয়ে ক্ষতির গতি অনেক বেশি।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ল্যানসেট কাউন্টডাউনের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। তবে পদক্ষেপ নিতে হবে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায়। তীব্র গরমের মধ্যেও অনেক মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে কাজ করতে বাধ্য হন।

তিনি বলেন, বর্তমান হারে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ গড় তাপমাত্রা ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। তাই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে দূষণও কমবে।

আইনুন নিশাত বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি এবং মশাবাহিত রোগের ঝুঁকির বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংক্রামক রোগের বিস্তারও বাড়ছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকাটা উদ্বেগজনক।

জিএসসিসির গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ লিড তাহরিম আরিবা চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতে যে ব্যয় বাড়ছে, বিশেষ করে পরিবারের নিজস্ব অর্থে চিকিৎসা খরচ মেটানোর বিষয়টি, তা কপ-৩১-এর আলোচনায় গুরুত্ব পেতে হবে।

আরও পড়ুন

×