ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

গৃহস্থালির সেবামূলক কাজ: ১

গ্রামীণ নারীর দিনভর কাজ, নেই মূল্যায়ন

গ্রামীণ নারীর দিনভর কাজ, নেই মূল্যায়ন
×

গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি কৃষি কাজেও ব্যস্ত থাকেন অনেক গ্রামীণ নারী। মানিকগঞ্জের সিংগাইর এলাকা থেকে তোলা ছবি-মাহবুব হোসেন নবীন

জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২০ | ০৪:২৮

নোয়াখালীর উপকূলীয় সুবর্ণচরের চরনাঙ্গলিয়ায় স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন হনুফা বেগম। দুর্গম এই অঞ্চলে সংসার জীবন কেমন কাটে, তা নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, ঘরের সব কাজ তিনি একাই করেন। খাবার পানির সংকটসহ নানা সমস্যা তাকে সামাল দিতে হয়। আধা কিলোমিটার দূর থেকে কলসি ভরে খাবার পানি আনতে হয়। কোমরে ব্যথা হয়ে যায়। তবে বিয়ের পর থেকে ১৫ বছর ধরেই তাকে এ কাজ করতে হচ্ছে। শুস্ক মৌসুমে পুকুর শুকিয়ে গেলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে পড়তে হয় আরও বিপাকে। তখন গোসল করতে অন্যের বাড়িতে যেতে হয়। বর্ষায় ভোগান্তি আরও বাড়ে। যেবার ঘরে পানি উঠে যায়, সেবার কষ্টের শেষ থাকে না। রান্না করতে না পারায় খাওয়াদাওয়া বন্ধ হয়ে যায় প্রায়। এত কিছুর পরও হনুফা বেগম ঘরের কোণে শাকসবজি চাষ, গরু, ছাগল ও মুরগি পালনের পাশপাশি স্বামীকেও কৃষিকাজে সহায়তা করেন। তবুও পরিবারে এ কাজের কোনো মূল্যায়ন নেই। তার কাজে আয় বাড়লেও সেই অর্থ হনুফার হাতে আসে না।

সুবর্ণচরের গ্রামে গ্রামে ঘুরে নারীদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেল হনুফার মতোই গল্প। তবে উপকূলের নারীর জীবন অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে একটু আলাদা। সংসার সামলানোর পাশাপাশি তাদের যুদ্ধ করতে হয় প্রাকৃতিক বৈরিতার সঙ্গেও। সেসব লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে হাতিয়ার কেয়ারিং চরের বাসিন্দা রাহেনা বেগম বলেন, 'গরমকালে লোনাভাবের কারণে পুকুরের পানি মুখেই নিতে পারি না। অথচ তাতেই গোসলসহ সব কাজ করতে হয়। এতে শরীরে দেখা দিয়েছে নানা রোগ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বিপদ আরও বেড়ে যায়।' রাহেনা বলেন, তাদের রান্নার কাজও সহজ নয়। মাটির চুলায় লাকড়ি আর কুড়িয়ে আনা শুকনো খড়-কুটোর জ্বালে ধোঁয়ার কালিঝুলি মেখে রান্না করেন তারা। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালাপোড়া ও শ্বাসকষ্টসহ শরীরে নানা সমস্যা দেখা দেয়। এত লড়াই করেও তিন বেলা ঠিকমতো খাবার জোটে না। চিকিৎসা তো দূরের কথা, রোগশোকের মাঝেই খাবার জোগাতে কৃষিকাজও করতে হয়।

জন্ম থেকে বঞ্চনা আর অবহেলায় বেড়ে ওঠা উপকূলের নারীদের শিক্ষার চেয়ে সাংসারিক কাজের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশি। তাই সংসার সামলাতে কোনোমতে প্রাথমিকের গণ্ডি পার করেই ইতি টানা হয় শিক্ষাজীবনের। হাঁস-মুরগি পালন, কৃষিকাজ, কুটির শিল্পসহ পারিবারিক সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক নানা কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকার পরও নারীর কাজের মূল্যায়ন নেই। বরং কঠোর পরিশ্রমে যে সংসারের বোঝা টেনে নিয়ে যাচ্ছেন নারী, সেই সংসারেই নির্যাতিত হতে হয় কাউকে কাউকে।

দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বয়ারচরের বাসিন্দা আলেয়া বেগম (ছদ্মনাম)। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকে দেখছি পরিবারে নারীদের কোনো সম্মান নেই। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত সংসারের কাজ করার পরও প্রায়ই নানা অজুহাতে স্বামী মারধর করে। আলেয়া এখন তার কাজের স্বীকৃতি চান। আয় করার মতো কাজে নিজেদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে অবহেলা থেকে মুক্তি চান।

'গৃহস্থালির সেবামূলক কাজে নারী ও পুরুষের সময়ের ব্যবহার' বিষয়ে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ-এর গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একজন নারী প্রতিদিন প্রায় ৮ ঘণ্টা গৃহস্থালির সেবামূলক কাজে ব্যয় করেন। যেখানে পুরুষের ব্যয় হয় দেড় ঘণ্টা। সংস্থার পাওয়ার প্রকল্পের আওতায় লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার তৃণমূল নারী-পুরুষের বিভিন্ন কাজে সময়ের ব্যবহার নিয়ে ২০১৬ সালের শেষের দিকে করা গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। তবে ওই দুই জেলায় এখন অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, নারী আয়মূলক কাজে ২ ঘণ্টা ১৩ নিমিট এবং গৃহস্থালির সেবামূলক কাজে সময় দেন ৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট। অথচ ২০১৭ সালে দেখা যায়, আয়মূলক কাজে ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট এবং গৃহস্থালির সেবামূলক কাজে নারী সময় দেন ৭ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট। এ ছাড়া উৎপাদনমুখী কাজে ৩ ঘণ্টা ৩২ মিনিট ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও স্বতন্ত্র কাজে তাদের সময় ব্যয় হয় ৩ ঘণ্টা ৮০ মিনিট।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ-এর 'পাওয়ার' প্রকল্পের সহায়তায় বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে গৃহস্থালির সেবামূলক কাজে নারীদের ভার লাঘব করতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনটি জেলায় সংস্থাটি কাজ করছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, শ্রম জরিপ ও নীতিকাঠামোতে 'শ্রম' হিসেবে এই গৃহস্থালির কাজের স্বীকৃতি না থাকায় এই কাজের মূল্যায়ন, বরাদ্দ প্রদান এবং পুনর্বণ্টন ও হ্রাসের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না।

দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ নারী, কৃষি, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ উপকূলের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করছে পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রাণ)। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী নুরুল আলম মাসুদ বলেন, সংসারের অভাব-অনটন, স্বামীর নির্যাতন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে উপকূলের নারীদের টিকে থাকতে হয়। নারীর উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য থেকে লাভবান হচ্ছেন পুরুষ। অথচ কোথাও নেই এতটুকু স্বীকৃতি। নেই আলাদা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি সমকালকে বলেন, নারীরা গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন পান না। এর মূল কারণ দারিদ্র্য, শিক্ষা ও ক্ষমতার অভাব। নারীদের কাজের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। নিজেদের চিন্তা করে উপায় বের করতে হবে যে, কীভাবে গৃহস্থালি কাজের চাপ কমিয়ে বেশি আয়মূলক কাজ করা যায়। আয়মূলক কাজে অংশগ্রহণ নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে ও স্বাবলম্বী করে তুলবে।

আরও পড়ুন

×