ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

অসদাচরণের অভিযোগ

তিন বিচারপতির তদন্ত নিয়ে কেউ মুখ খুলছে না

তিন বিচারপতির তদন্ত নিয়ে কেউ মুখ খুলছে না
×

ওয়াকিল আহমেদ হিরন

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১২

দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগে বিচারকাজ থেকে বিরত রাখা হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে গত প্রায় তিন মাসেও তদন্তের অগ্রগতি জানা যায়নি। সপ্তাহের কার্যদিবসগুলোতে বিচারপতিরা নিজ নিজ খাস কামরায় বসছেন। কিন্তু কোনো বিচারকাজ করছেন না। এ নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে জানার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কী পর্যায়ে রয়েছে, তা কেউ জানেন না। ফলে অনেকটা ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে তদন্ত কার্যক্রম। আইনজীবীদের দাবি, তারা (বিচারপতি) যদি কোনো অসদাচরণ করে থাকেন- অবিলম্বে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা উচিত। অন্যথায় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। যদিও গত ৭ নভেম্বর জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, হাইকোর্টের কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

গত ২২ আগস্ট থেকে তিন বিচারপতিকে বিচারকাজ থেকে সাময়িকভাবে বিরত রাখা হয়। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে বলা হয়, তিনজন বিচারপতির বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে তাদের বিচারকাজ থেকে বিরত রাখা হয়। পরে তারা ছুটি প্রার্থনা করেন। এই তিনজন হলেন- বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক।

জানা গেছে, এই তিন বিচারপতি অল্প কয়েকদিন ছুটিতে ছিলেন। এরপর (১ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত) প্রায় দেড় মাস সুপ্রিম কোর্ট অবকাশের পর তিন বিচারপতি আবার নিয়মিত অফিস করছেন। খাস কামরায় বসছেন। অবকাশের পর তারা আর ছুটির জন্য আবেদন করেননি। তবে তাদের বেঞ্চ অফিসারদের (বিও) এজলাসে থাকা মামলাগুলো সংশ্নিষ্ট শাখায় ফেরত পাঠাতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সমকালকে বলেন, 'বিচারপতিদের তদন্তের বিষয়টি রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির অভ্যন্তরীণ (ইন্টারনাল) বিষয়। এ ব্যাপারে আমার কিছু জানা নেই।' এর তদন্ত হচ্ছে কি-না তাও জানেন না রাষ্ট্রের প্রধান এই আইন কর্মকর্তা।

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সৈয়দ আমীরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে প্রধান বিচারপতি তিন বিচারপতিকে বিচারকার্য থেকে বিরত রেখেছেন। তারা যদি কোনো অসদাচরণ করে থাকেন, তাহলে অবিলম্বে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা উচিত। সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে।'

তিনি বলেন, 'আশা করব প্রধান বিচারপতি দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন। এরপর রাষ্ট্রপতিকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে অবহিত করবেন, যাতে তিনি পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারেন।'

সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার এএম মাহবুবউদ্দিন খোকন সমকালকে বলেন, 'সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতিদের বিরুদ্ধে তদন্ত হবে। কীভাবে তদন্ত হচ্ছে বা তদন্তের অগ্রগতি নিশ্চয়ই জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।'

দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সমকালকে বলেন, 'বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এটা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার। কাজেই এ ব্যাপারে রেজিস্ট্রার জেনারেল দপ্তর থেকে কোনো তথ্য জানানো না হলে জানার সুযোগ নেই।'

হাইকোর্ট বিভাগের মুখপাত্র স্পেশাল অফিসার ব্যারিস্টার সাইফুর রহমান সমকালকে জানান, তার কাছে তদন্তের ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই।

অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি এ তদন্তকাজ করছে। তদন্ত শেষ হলে দ্রুতই রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হবে।

অসদাচরণের অভিযোগ কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় তদন্ত হবে, এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সৈয়দ আমীরুল ইসলাম বলেন, এ ব্যাপারে আইনজীবীদের নানা মত রয়েছে। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পর সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী বিধান সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। কেউ কেউ বলেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে এখন এই তদন্ত হবে। এরপর সরকার আপিল বিভাগের ওই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ দাখিল করে, যা আপিল বিভাগে এখনও বিচারাধীন।

তার মতে, রিভিউতে কোনো স্থগিতাদেশ নেই। কিন্তু সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর সংসদ কোনো আইন পাস করেনি, যা সুপ্রিম জুডিশিয়াল পদ্ধতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে। যেহেতু রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এই তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে, সে কারণেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সে ক্ষেত্রে জেনারেল ক্লজেজ অ্যাক্টের ১৬ ধারা অনুযায়ী এমন একটা পদ্ধতি তদন্তের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা উচিত, যা প্রিন্সিপাল অব ন্যাচারাল জাস্টিসের সঙ্গে সামঞ্জস্য হয়। তিনি আরও বলেন, যদি তদন্তে বিচারপতিরা অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

প্রসঙ্গত, গত ১৬ মে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিম্ন আদালতের মামলায় হস্তক্ষেপ করে ডিক্রি পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল হাইকোর্টের বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের বিরুদ্ধে। ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ-সংক্রান্ত এক রিট মামলায় অবৈধ হস্তক্ষেপ করে ডিক্রি জারির মাধ্যমে হাইকোর্টের ওই বেঞ্চ রায় পাল্টে দেন বলে আপিল বিভাগে অভিযোগ তুলেছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ সংশ্নিষ্ট অর্থঋণ আদালতের (নিম্ন আদালত) মামলাটির সব ডিক্রি ও আদেশ বাতিল ঘোষণা করেছিলেন।

এর পরই বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরীসহ একাধিক বিচারপতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ পাঠান সুপ্রিম কোর্ট। এতে অভিযুক্ত তিন বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক ও বিচারপতি কাজী রেজাউল হকের বিরুদ্ধে তদন্তের পরামর্শ দেওয়া হয় প্রধান বিচারপতিকে। এর পরই তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।

বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ২০০২ সালের ২৯ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি নিযুক্ত হন। দুই বছর পর স্থায়ী বিচারপতির শপথ নেন তিনি। বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল অতিরিক্ত বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল স্থায়ী বিচারপতি হন তারা।

আরও পড়ুন

×