ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

নকল মদে মরছে মানুষ, সাবধান!

নকল মদে মরছে মানুষ, সাবধান!
×

সাহাদাত হোসেন পরশ ও বকুল আহমেদ

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ২০:২৩

স্বর্ণালী বাগচী তন্বী (২৫)। ডিজে পার্টিতে নিয়মিত নাচ-গান করতেন এই তরুণী। তন্বী তার দুই বন্ধু শরীফুল ইসলাম নাঈম (২৭) ও সারোয়ার হোসেন অভির (২৭) সঙ্গে ভাটারার নূরের চালা এলাকায় একটি বাসায় বসবাস করতেন। দুই বন্ধুর মধ্যে একজনকে স্বামী হিসেবেও পরিচয় দিতেন তিনি। গত ১৮ জানুয়ারি তন্বী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। দুই বন্ধু তাকে স্থানীয় উপশম হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে ওই দিনই মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ওই হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তন্বীকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর মৃতদেহ নিয়ে দুই বন্ধু তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে যান। সেখানে লাশের সৎকার করা হয়। ময়মনসিংহে বান্ধবীর লাশ সৎকারের পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়েন নাঈম ও অভি। একপর্যায়ে দু'জনই সেখানে মারা যান। বান্ধবীর লাশ সৎকারে এসে অসুস্থ হয়ে দুই বন্ধুর মারা যাওয়ার তথ্য জানার পর পুলিশের সন্দেহ হয়। এরপর তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিন বন্ধু ভাটারার যে বাসায় ভাড়া থাকতেন সেখানে তল্লাশি চালিয়ে মদের দুটি বোতল পাওয়া যায়। দুটি বোতলেই অল্প কিছু মদ অবশিষ্ট ছিল। ওই আলামত নিয়ে সিআইডির ফরেনসিক টিম পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে। এরই মধ্যে চিকিৎসক তিনজনের মৃত্যুর কারণ নিয়ে তাদের প্রাথমিক মতামতে জানান- বিষাক্ত কোনো কিছু পান করায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশও নিশ্চিত হয় নকল ও বিষাক্ত মদই তাদের মৃত্যুর কারণ। পরে এই ঘটনায় ভাটারা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন নিহত একজনের স্বজন।

শুধু ভাটারা থানা এলাকার ওই দুঃখজনক ঘটনা নয়; প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও নকল ও বিষাক্ত মদ খেয়ে অকালে প্রাণ হারানোর ঘটনা ঘটছে। সমকালের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৫ জন নকল মদপানে মারা গেছেন। অসুস্থ হয়েছেন অর্ধশতাধিক। সর্বশেষ গতকাল সোমবার বগুড়ায় বিষাক্ত মদপানে মারা গেছেন ছয়জন। ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে গত রোববার রাতে মো. মামুন নামে এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী একই কারণে মারা গেছেন। তিনি নদী এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার বারিধারার অফিসে এক বন্ধুকে নিয়ে নকল মদ খেয়েছিলেন মামুন। এরপর অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মামুনের বন্ধু এখনও কিছুটা অসুস্থ।

এ ছাড়া গত শুক্রবার উত্তরার ব্যাল্ফু্ব শট নামে একটি রেস্তোরাঁয় পার্টিতে বিষাক্ত মদ খান ধানমন্ডির একটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটির পাঁচ বন্ধু। তাদের মধ্যে আরাফাত ও তার বান্ধবী এরই মধ্যে মারা গেছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, বিষাক্ত মদপানের কারণেই তারা মারা গেছেন। এ ছাড়া গাজীপুরের একটি রিসোর্টে গত সোমবার পার্টির আয়োজন করেছিল ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। পুরান ঢাকা থেকে সেখানে মদ সরবরাহ করেছিল একটি চক্র। ওই মদের পার্টিতে অংশ নেওয়া তিনজন এরই মধ্যে মারা গেছেন। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আরও অন্তত ১০ জন। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, মদ খেয়ে মৃত্যু ও অসুস্থতার ঘটনা প্রকৃতপক্ষে আরও বেশি। লোকলজ্জার ভয়ে অনেক পরিবার এ ধরনের মৃত্যু ও অসুস্থতা গোপন করছেন। সতর্ক না হয়ে যেনতেন জায়গা থেকে মদ খেলে প্রাণহানির ঘটনা বাড়তে পারে। পার্টিতে অংশ নিয়ে মদ খেয়ে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা এরই মধ্যে এসব মদের উৎস নিশ্চিত হতে অনুসন্ধান শুরু করেছেন। আবার যারা কালেভদ্রে বা নিয়মিত মদ খেতে অভ্যস্ত, তারাও রয়েছেন এক ধরনের আতঙ্কে।

সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২-৩ মাস ধরে বাজারে বৈধ মদের সংকট চলছে। চাহিদার তুলনায় জোগান কম। রাজধানীর বারগুলোতে আগে বিদেশি মদের প্যাগ কমবেশি আড়াইশ' টাকায় বিক্রি হতো। এখন তা ৪৫০-৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বিদেশি মদের বোতল এখন দ্বিগুণ দাম।

ওয়্যারহাউস, বার, রিসোর্ট ও তারকা হোটেলে সব শ্রেণির মদের তীব্র সংকট। এ সুযোগে অসাধু সংঘবদ্ধ চক্র দামি দামি ব্র্যান্ডের মদের খালি বোতল সংগ্রহ করে নকল ও বিষাক্ত মদ তৈরি করছে। পুরান ঢাকায় ছোট ছোট ঘরে দামি ব্র্যান্ডের মদের নকল লেবেলও বানাচ্ছে তারা। অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রুপ খুলে দামি ব্র্যান্ডের মদ সরবরাহের কথা বলে বিষাক্ত মদ বিক্রি করছে ওই চক্র। সাদা রঙের মদ বেশি নকল হচ্ছে। কারণ এতে কোনো ধরনের কালার মেশাতে হয় না। হুইস্কি বা রেড ওয়াইনে নকল কালার মেশালে তা ধরা খাওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

কেন বাজারে হঠাৎ মদের সংকট- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পুলিশ, কাস্টমস ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, ওয়্যারহাউস থেকে কেবল বিদেশি নাগরিকরা শুল্ক্কমুক্ত মদ কিনতে পারেন। তবে আগে ওয়্যারহাউস থেকে অনেক প্রভাবশালী অবৈধ পথে শুল্ক্কমুক্তভাবে যে মদ বিদেশির কাছে বিক্রি করার কথা, তা বের করে বাইরে বার, রিসোর্ট, হোটেলে সরবরাহ করতেন। বর্তমান প্রশাসন ওয়্যারহাউস থেকে অবৈধভাবে বাইরে যে চেইনের মাধ্যমে মদ যেত, তা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারণে বাজারে বৈধ মদের ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছে। ওয়্যারহাউসে এখন গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, যাতে কোনো বিদেশি নাগরিকও তার পাসপোর্ট দেখানো ছাড়া মদ কিনতে না পারেন।

কেন এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো- এমন প্রশ্নে এক কর্মকর্তা বলেন, বৈধভাবে দেশে মদ আনতে হলে ৪০০ শতাংশ শুল্ক্ক দিতে হয়। এ কারণে অনেকে অবৈধভাবে মদ ঢোকাতে তৎপর থাকে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, যাতে বিদেশি নাগরিক ছাড়া কেউ লাগেজে মদ আনতে না পারেন। নীতিনির্ধারকরা চান, মদের চাহিদা পূরণে বৈধ চ্যানেলে তা দেশে আসুক। এতে এ খাতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। যারা অবৈধ চ্যানেলে মদ নিয়ে আসত, তারা এখন বৈধ লাইসেন্সের দিকে ঝুঁকবে। এতে মদের যে চলমান সংকট তা নিরসন হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, নানা জটিলতায় বিদেশি মদ আমদানি কম হচ্ছে। কিন্তু মদের চাহিদা বেশি, যা আমদানিকৃত মদে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, পুরান ঢাকার ঠাঁটারীবাজারে বিদেশি মদের খালি বোতলের দোকান রয়েছে। এসব দোকান থেকে বোতল কিনে নিয়ে যায় নকল মদ তৈরির সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিরা। তাতে নকল মদ ঢুকিয়ে বিদেশি নামিদামি ব্র্যান্ডের লেবেল লাগিয়ে দেওয়া হয়।

সূত্র জানিয়েছে, বারের লাইসেন্স তিন ধরনের। এক. রেস্টুরেন্ট বার। দুই. ক্লাব-বার। তিন. হোটেল বার। রাজধানীতে অন্তত এমন ৬৫টি প্রতিষ্ঠানে ১২০টি লাইসেন্স রয়েছে মদ বিক্রির।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক দুলাল কৃষ্ণ সাহা সমকালকে বলেন, যারা বিদেশি মদের নামে নকল মদ তৈরি করছে তারা যথাযথ কেমিক্যাল মিশ্রণ করছে না। যে কারণে সেটি বিষাক্ত হয়ে উঠছে। ইথানলের পরিবর্তে মিথাইল মেশালে সেই মদ মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠবে।

বাংলামটরের বার 'শ্যালের' চিফ ফিন্যান্স অফিসার তন্ময় কর্মকার সমকালকে বলেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতির শুরু থেকেই বিদেশি মদ আমদানিতে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে চাহিদার তুলনায় বিদেশি মদের সরবরাহ কম। এই সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু লোকজন নকল মদ তৈরি করে বাজারজাত করছে। তবে বিদেশি মদ আমদানি বাড়ানো হলে নকল মদ স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে। এ ধরনের মদ শ্যালেতে বিক্রি করা হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা নিজেরাই সরাসরি বিদেশি মদ আমদানি করি। করোনার কারণে বিদেশে মদের মূল্য দ্বিগুণ হয়েছে। বিদেশি মদ আমদানি কম হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, যে মদের প্রতি কেইসের দাম বিদেশে ছিল ৬০ ডলার, এখন সেটি একশ থেকে একশ ২০ ডলার হয়েছে। দেশে মদ আমদানি করতে সব মিলিয়ে ডিউটি দিতে হয় চারশ থেকে সাড়ে চারশ শতাংশ। এ ছাড়া করোনার কারণে বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব কারণেই মূলত মদ আমদানি কম বলে মনে করছেন তিনি। তিনি জানান, নিয়ম অনুযায়ী বারে এক বছরে যে পরিমাণ মদ বিক্রি হবে, পরবর্তী বছরে তার সাড়ে সাত শতাংশ মদ আমদানি করা যায়; যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। সাড়ে সাত শতাংশের জায়গায় ২০ শতাংশ আমদানি করার অনুমতি দিলে চাহিদা অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব হবে। এতে নকল মদ তৈরি করার সুযোগ পাবেন না অসাধু ব্যবসায়ীরা।

শ্যালের ম্যানেজার এমএ হাই রানা জানান, বিদেশি মদের সরবরাহ না থাকায় সম্প্রতি কেরু এবং হান্টার বিক্রি করছেন তারা। আগের তুলনায় করোনা পরিস্থিতিতে গ্রাহকও কম বলে জানালেন তিনি।

পরীবাগের সাকুরা রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের ম্যানেজার জামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিদেশি মদের সরবরাহের পাশাপাশি গ্রাহকের সংখ্যাও কমেছে বর্তমানে। এরপরও চাহিদার তুলনায় মদ আমদানি কম বলে জানালেন তিনি। তিনি বলেন, পর্যটন করপোরেশন থেকে তারা বিদেশি মদ এনে বিক্রি করেন। করোনার কারণে এলসি করতে সমস্যা হচ্ছে বলেও জানালেন তিনি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার সমকালকে বলেন, মদপানে যারা মারা গেছে, তারা কোথা থেকে মদ সংগ্রহ করেছিল সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি লাইসেন্সধারী কোনো বার থেকে এসব মদ সংগ্রহ করা হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্নিষ্ট বারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, যারা মারা গেছে, তারা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে মাদক সেবনের পারমিট নিয়েছিল কিনা সেটিও দেখা হচ্ছে। নকল মদ তৈরির কারখানার সন্ধান করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী সমকালকে বলেন, আমরা দেখছি বৈধ কোনো সোর্স ছাড়াই অনেকে মদ নিয়ে খাচ্ছেন। কেউ অভ্যাসগত আবার কেউ সাময়িক কোনো বিনোদন উপলক্ষে এ ধরনের আসর বসাচ্ছেন। তবে সঠিক সোর্স থেকে মদ না নিয়ে কেউ খেলে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ডিসি সুদীপ কুমার আরও বলেন, যেসব সোর্স থেকে নকল এসব মদ এসেছে সে ব্যাপারে কিছু তথ্য এরই মধ্যে পাওয়া গেছে। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। যারা নকল মদ খেয়ে মারা যাচ্ছে, তাদের অধিকাংশের বয়স অল্প। তাদের বেশিরভাগের বৈধ লাইসেন্স নেই। জানা গেছে, বৈধভাবে লাইসেন্স নিয়ে অনেকে মদ খান। দিনে তারা বারে বসে ১৮০ এমএল মদ খেতে পারেন। আর মাসে সাত লিটার মদ তারা বার বা বৈধ ক্লাব থেকে বহন করে নিতে পারবেন।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের ডা. শেখ আল ফুয়াদ সমকালকে বলেন, বিষাক্ত মদ মানুষের লিভার, কিডনি এবং মস্তিস্কসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা নষ্ট করে ফেলে। এ কারণেই মৃত্যু ঘটে।

আরও পড়ুন

×