ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

রাজাকারের তালিকা: বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি

রাজাকারের তালিকা: বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০৯:৩৩

স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম অন্তর্ভুক্তির ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। পাশাপাশি সঠিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে রাজাকারসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের সংশোধিত তালিকা প্রকাশেররও দাবি জানান তারা।

বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সংগঠনের এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। লিখিত বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে বিভাগীয় তদন্ত হবে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে; কিন্তু আমরা কোনো প্রশাসনিক তদন্ত চাই না, আমরা বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে তার সুপারিশের ভিত্তিতে দায়ীদের শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে এই তদন্ত কমিশন হতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন- ১৯৭১-গণহত্যা নির্যাতন আর্কাইভ জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, অধ্যাপক কামরুজ্জামান এবং রাজাকার তালিকায় নাম আসা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর মেয়ে ডানা নাজলী, মির্জা আবদুল লতিফের মেয়ে সেলিনা মির্জা মুক্তি ও রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুস সালামের মেয়ে জুলফিয়া বেগম বুলু প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে শাহরিয়ার কবির বলেন, 'রাজাকার বা স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায় অজ্ঞানতাবশত কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীনতাবিরোধীর নাম বাদ পড়তে পারে; কিন্তু রাজাকারের তালিকায় কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের কারও নাম যুক্ত হওয়া শুধু ভুল নয়, গুরুতর অপরাধ বলে আমরা মনে করি। এটা শুধু নির্দিষ্ট মুক্তিযোদ্ধার অপমান নয়, '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক গোটা জাতির অপমান, যা বিজয়ের মাসেই ঘটেছে। এ ধরনের অপরাধের জন্য কারা দায়ী তা তদন্ত করার জন্য আমরা বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের দাবি জানাচ্ছি।'

'স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর রাজাকারের তালিকার প্রয়োজন কি?' বিএনপি মহাসচিবের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে শাহরিয়ার কবির বলেন, 'বিএনপির প্রতিষ্ঠতা জেনারেল জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর আমলে বিচারাধীন ও সাজাপ্রাপ্ত প্রায় ১১ হাজার ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সাজা থেকে মুক্ত করার জন্য দালাল আইন বাতিল করেছিলেন, জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছেন, দালালদের মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন। ঘাতক দালালদের পুনর্বাসনের রাজনীতি বিএনপি এখনও নিষ্ঠার সঙ্গে অনুসরণে করছে। এ কারণে বিএনপির সমালোচনা আমরা প্রত্যাখ্যান করছি।'

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, 'রাজনীতিবিদরা ক্ষমতার বাইরে থাকলে সিভিল সোসাইটিকে কাছে টানেন আর ক্ষমতায় গেলে আমলানির্ভর হয়ে পড়েন। এই আমলানির্ভরতার কারণেই রাজাকার তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তির ঘটনা ঘটেছে।' স্বাধীনতার পর থেকে রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত কয়েকটি বই তুলে ধরে মুনতাসীর মামুন বলেন, 'বিভিন্ন গ্রন্থে কয়েক হাজার রাজাকারের নাম রয়েছে। তার পরও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ত্রুটিপূর্ণ একটি রাজাকার তালিকা কীভাবে প্রকাশ করল, সেটা রহস্যজনক। এ অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচার না হলে এ রকম ঘটনার পূনরাবৃত্তি হবে।'

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমালোচনা করে মুনতাসীর মামুন বলেন, 'এই মন্ত্রণালয়েই এর আগে সোনার ক্রেস্ট কেলেঙ্কারি, সনদ জালিয়াতিসহ নানা ধরনের অপকর্ম হয়েছে। তার একটিরও বিচার হয়নি। আর এবারের কেলেঙ্কারি তো সব ছাড়িয়ে গেছে। আগামীতে ১০ হাজার রাজাকারের তালিকা প্রকাশ না করে, প্রয়োজনে ধাপে ধাপে গেজেটভুক্ত রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যদের তালিকা প্রকাশ করেন। পরে খোজ-খবর নিয়ে সবার সঙ্গে আলাপ করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা করুন। এতে কারও আপত্তি থাকবে না।'

শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, 'প্রশাসনের রল্প্রেব্দ রল্প্রেব্দ স্বাধীনতাবিরোধী, জামায়াত-শিবির চক্র সক্রিয়। এদের চিহ্নিত করতে হবে।' মুক্তিযোদ্ধাদের রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তাদের মন ভেঙে দেওয়া হয়েছে অভিযোগ করে তিনি সংশ্নিষ্টদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন।

গোলাম আরিফ টিপুর মেয়ে ডানা নাজলী বলেন, 'রাজাকারের তালিকার মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের ব্যাপক অবহেলা ও সমন্বয়হীনতা ছিল। সরকারের ভেতরের অপশক্তি সক্রিয় ছিল এবং আছে। এ অপশক্তিকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।'

আওয়ামী লীগ নেতা লতিফ মির্জার মেয়ে সেলিনা মির্জা মুক্তি বলেন, 'আমার বাবা ছিলেন ওই এলাকার মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক। আওয়ামী লীগের জেলা শীর্ষ নেতা। দু'বারের সংসদ সদস্য। তার নেতৃত্বে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন। যুব শিবিরের অধিনায়ক ছিলেন। এ ধরনের একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম কী করে রাজাকারের তালিকায় যায়? যারা এ ধরনের 'পাপ কাজ' করেছে, আমরা তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।'

মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আব্দুস সালামের মেয়ে জুলফিয়া বেগম বুলু বলেন, 'রাজাকারের তালিকা প্রকাশের পর বাবার নাম ওই তালিকায় দেখে আমরা কেউ ঘুমাতে পারছি না। মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। বঙ্গবন্ধু আমাদের বাড়ি যেতেন। আমার বাবাকে মন্ত্রীসহ বড় বড় পদে বসানোর প্রস্তাব দিলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। এ রকম একজন নির্লোভ মানুষকে রাজাকারের তালিকায় যারা নাম লিখেছে, আমরা তার বিচার চাই।


আরও পড়ুন

×