বই উৎসব
স্বপ্ন রঙিন দিন
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:১৫
সূর্য সবে উঁকি দিতে শুরু করেছে পুব আকাশে। কুয়াশা ফুঁড়ে জেগে উঠছে সকাল।
পৌষের হিম হিম পরশ। ফুরফুরে হাওয়ায় স্কুলড্রেস আর সোয়েটার গায়ে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে এসে জড়ো হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
পড়ূয়া সোনামণিরা। ভোর ৬টা থেকে ৮টা, পূর্ণ হয়ে গেল সুবিশাল মাঠ। ততক্ষণে
সারি সারি চেয়ারে আসন নিয়েছে শিশুরা। সঙ্গে শিক্ষক ও অভিভাবকরাও। মাঠের এক
কোণে বড় মঞ্চ। শিশু-কলরবে মুখর পুরো অনুষ্ঠান। চোখ-মুখজুড়ে আনন্দঘন
উত্তেজনা। তা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে হাতে পাওয়া চাররঙা নতুন পাঠ্যবই। বই
উৎসবে রঙিন বই রাঙিয়ে তুলেছে শিশু মনকেও।
নতুন বছরের প্রথম দিনে গতকাল বুধবার উপহার হিসেবে দেশের সাড়ে চার কোটি
শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হলো ৩৫ কোটি ঝকঝকে নতুন পাঠ্যবই। বই হাতে পেয়েই
প্রবল আগ্রহের সঙ্গে পাতা উল্টাতে লাগল তারা। এক বই রেখে আরেক বই।
প্রাণখোলা পরিস্ম্ফুটিত হাসি, সহপাঠীর সঙ্গে খুনসুটি।
কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ নয়, এ দৃশ্য ছিল গতকাল সকালে দেশের
প্রতিটি বিদ্যালয়ে। দেশের অনাগত ভবিষ্যৎকে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করার
লক্ষ্যে সরকার প্রতি বছরের মতো এবারও শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই নতুন
ক্লাসের নতুন বই তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। এ নিয়ে টানা ১১ বছর দেশজুড়ে
অনুষ্ঠিত হলো এ বই উৎসব। নতুন বইয়ের সোঁদা গন্ধে হয় তারা আলোড়িত,
উজ্জীবিত। উচ্ছ্বাসে মুক্তবিহঙ্গের মতো এদিক-ওদিক করছিল তারা। তাদের ওই
উল্লাস দেখে অভিভাবক আর শিক্ষকদের মুখেও ফুটে উঠেছিল তৃপ্তির হাসি।
২০২০ শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে গতকাল সারাদেশের চার কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার
১৯৮ ছাত্রছাত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয় ৩৫ কোটি ৩১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৩৮টি
পাঠ্যবই। নতুন ক্লাসে উঠে শিশুরা খালি হাতে স্কুলে গিয়ে নতুন বই নিয়ে
আনন্দচিত্তে ফিরেছে বাড়িতে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বুধবার সকাল ১০টায়
সাভার উপজেলার অধরচন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কেন্দ্রীয়ভাবে
পাঠ্যপুস্তক উৎসব উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। অন্যদিকে,
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সকাল ১০টায় পাঠ্যপুস্তক উৎসব
অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে। দুটি অনুষ্ঠানেই
কবুতর ও বেলুন উড়িয়ে উৎসব উদ্বোধন করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ- সুবিশাল মাঠজুড়ে সারি সারি চেয়ারে
বসে থাকা শিশু ও শিক্ষকদের হাততালিতে মুখর ছিল উৎসবের আঙিনা। কচিকাঁচাদের
হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার রঙিন আয়োজনে বাড়তি আকর্ষণ ছিলেন খ্যাতনামা
ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসান। শিশুদের সঙ্গে তিনি গল্প জমিয়েছেন, হেসে
হয়েছেন কুটি কুটি।
সকাল ১০টায় রাজধানীর ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ পাঁচ হাজার
শিক্ষার্থীকে নিয়ে আয়োজন করা হয় এ বই উৎসবের। পুরো অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়
শিশু শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে। উৎসবের শুরুতে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করে
শিশুরা। সংগীত সকালটি মুখর হয়ে ওঠে লালন সাঁইয়ের 'মানুষ ভজলে সোনার মানুষ
হবি' গানে। এরপর নৃত্য, গম্ভীরাসহ বিভিন্ন সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শেষ হয়
সাংস্কৃতিক পর্ব। এরপর প্রধান অতিথিদের অংশগ্রহণে আলোচনা অনুষ্ঠান চলে বই
উৎসব নিয়ে।
শিশুদের আনুষ্ঠানিকভাবে বই তুলে দেওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় শেষ পর্ব। দীর্ঘ
সময় মঞ্চে বসে থাকা সাকিব আল হাসান উঠে দাঁড়ান অতিথিদের সঙ্গে।
আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুদের প্রস্তুত করা হয় অতিথিদের হাত থেকে বই নেওয়ার জন্য।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ২৪১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় পাঁচ
হাজার শিক্ষার্থী ও ছয় শতাধিক শিক্ষক এ উৎসবে শামিল হন। প্রাথমিক ও
গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন বেলুন ও কবুতর উড়িয়ে বই বিতরণ উৎসব
২০২০ উদ্বোধন করেন। অতিথিদের বক্তব্যের পর খুদে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই
তুলে দেন তিনি।
প্রধান অতিথি মো. জাকির হোসেন বলেন, 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ৫৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ
করেছেন। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে আমাদের প্রাথমিক
বিদ্যালয় দেখলে মনে হয় সেসব প্রকৃতই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমরা সব
প্রতিষ্ঠানকে শিশুদের জন্য আনন্দপূর্ণ করে তুলছি।'
সভাপতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম আল হোসেন বলেন, 'বছরের
প্রথম দিনে সারাদেশের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই তুলে
দেওয়া হয়। আজ তোমরা যারা নতুন বই নিচ্ছ, তোমরাই আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন
করবে।'
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয়
স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার রহমান বলেন, 'বর্তমানে
শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে বই, মিড-ডে মিল পাচ্ছে ও মায়ের হাতে নগদ টাকা
যাচ্ছে। এগুলো আগে দেওয়া হতো না।'
বই উৎসবে বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী
কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু, শিরীন আখতার, ফেরদৌসি ইসলাম, প্রাথমিক
শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. এ এফ এম মঞ্জুর কাদির, অতিরিক্ত
মহাপরিচালক সোহেল আহমেদ।
অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ :সাভার থেকে স্টাফ রিপোর্টার গোবিন্দ আচার্য্য
জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত পাঠ্যপুস্তক উৎসবে যোগ দিয়ে প্রধান
অতিথির বক্তৃতায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, 'একজন পরিপূর্ণ মানুষ
হওয়ার জন্য শুধু জিপিএ ৫-এর পেছনে না ঘুরে শিক্ষার্থীদের শরীর চর্চা ও
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দিকেও মনোযোগী হতে হবে। এ জন্য মানবিকতা, শ্রদ্ধা,
পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, সহমর্মিতা ও দেশপ্রেমকে সবাইকে আত্মস্থ করতে হবে।'
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মানসম্মত শিক্ষার জন্য বহুমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করে
মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন করছি যাতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার চাপ কমানো এবং
শিক্ষাকে আনন্দময় করে তোলা যায়।
এর আগে মন্ত্রী বেলুন উড়িয়ে পাঠ্যপুস্তক উৎবের উদ্বোধন করেন এবং
শিক্ষার্থীদের মাঝে বই বিতরণ করেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ
প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে, শিক্ষাক্ষেত্রে
বেশি অগ্রগতি হয়েছে।'
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন,
'জীবনে মানুষ হতে হলে অঙ্গীকার থাকতে হবে। জিপিএ ৫-এর চিন্তা মাথা থেকে
ঝেড়ে ফেলতে হবে এবং বইয়ের কনসেপ্ট বুঝে পড়তে হবে।'
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রীর হাত থেকে বই পাওয়া সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ
বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ খান তামজিদ জানায়, তার অনেক ভালো
লাগছে যে, বছরের প্রথম দিনই শিক্ষামন্ত্রীর হাত থেকে বই পেয়েছে। মন্ত্রীর
হাত থেকে বই পাওয়া দ্য সলভেশন আর্মি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী
শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সোলায়মান জানায়, বছরের প্রথম দিনে মন্ত্রীর কাছ থেকে
বই হাতে পেয়ে সে খুব খুশি। ছোটবেলা থেকেই এক চোখে সামান্য দেখতে পাওয়া
সোলায়মান আরও জানায়, সে আরও অনেক বেশি পড়ালেখা করে চিকিৎসক হতে চায়।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেনের সভাপতিত্বে বই উৎসব
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মুনশী
শাহাবুদ্দীন আহমেদ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বিদায়ী সিনিয়র সচিব মো.
সোহরাব হোসাইন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ জয়নুল বারী,
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মুরাদ হোসেন মোল্লা, ঢাকা জেলা
প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান, ঢাকার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন
সরদার, সাভার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব, সাভার পৌর
মেয়র হাজি আব্দুল গনি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজুর রহমান।
- বিষয় :
- বই উৎসব
