অমর একুশে গ্রন্থমেলা
ভিড় বাড়ছে ক্রেতার
জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:৩৬ | আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:৫৪
'বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না'- বিদগ্ধ সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর এই বিখ্যাত উক্তি চোখে পড়ল মেলা প্রাঙ্গণে টানানো প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুনে। আর সত্যিই দেউলিয়া না-হওয়া তেমন একজনের দেখা মিলল গতকাল সোমবার। এত বই কিনেছেন যে, দুই হাতের দশ আঙুলে আঁটছে না কিছুতেই। ১৪টি বই কিনেছেন ৩৫ বছর বয়সী মানুষটি। কিন্তু তার চোখেমুখে তখনও অতৃপ্তি, কী যেন কেনা হয়নি! প্রতিটি স্টলে যাচ্ছেন, থামছেন, বই দেখছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন আরও চার-পাঁচজন। শেষ পর্যন্ত তিনি কিনলেন মোট ১৮টি বই। সঙ্গীদেরও উপহার দিলেন একটি-দুটি করে।
বইপ্রেমী এই মানুষটির নাম রাসেল মাহমুদ। পেশায় ব্যাংক কর্মকর্তা রাসেল জানালেন, গত বছর মেলা থেকে প্রায় ৯০ হাজার টাকার বই কিনেছেন তিনি। প্রতি বছরই বই কেনেন। চাকরির বাইরে তার আর কোনো কাজ নেই। ব্যাচেলর জীবনে বই-ই তার পরম সঙ্গী। মেলা জমে উঠলে আবারও আসবেন, কিনবেন আরও বই।
সময় প্রকাশনীর সামনে নিজের বইয়ের পাশ ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে ছিলেন লেখক আনিসুল হক। এরপর গেলেন মাওলা ব্রাদার্সের প্যাভিলিয়নের দিকে। মেলা কেমন উপভোগ করছেন জানতে চাইলে বললেন, এখনও বোঝা যাচ্ছে না। হয়তো আরও ক'দিন পর জমবে। পালক পাবলিশার্সে বসে ঠুসঠাস বাদাম ভাঙছিলেন আর মুখ নাড়ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জে. (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তিনি বললেন, উদ্যানের চারপাশের একটি রাস্তাও ঠিক নেই। কোনোটি ভাঙা, কোনোটিতে কাজ চলছে। এ অবস্থায় মেলায় ঢুকতে পথের ঝক্কি সামাল দেওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে না অনেকেই। তার পুরোনো কয়েকটি বই পাওয়া যাচ্ছে এ প্রকাশনীতে। তবে বসন্তবরণের দিনে আসছে তার নতুন ভ্রমণবিষয়ক বই, 'ইরান যেমন দেখলাম'।
বইমেলায় গতকাল ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে ভার্চুয়াল গ্রুপ 'পাঁচ-সাতে'র সদস্যদের। পাঁচ-সাত মানে ২০০৫ সালে এসএসসি এবং ২০০৭ সালের এইচএসসি ব্যাচ। ফেসবুকভিত্তিক এ ধরনের অনেক গ্রুপই সক্রিয় এখন। নানা সামাজিক কার্যক্রমও পরিচালনা করছে তারা। গতকাল বইমেলায় তারা একসঙ্গে ঘুরেছেন, বই কিনেছেন, সেলফি তুলেছেন।
গতকাল সন্ধ্যা অবধি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরে বোঝা গেল, বেচাকেনা তত না জমলেও এখন ধীরে ধীরে আসতে শুরু করেছেন বই ক্রেতারা। মেলার এক-তৃতীয়াংশ সময় চলে গেছে। কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হবে সত্যিকারের কেনাবেচা।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাংলা একাডেমিতে ঢুকে পাওয়া গেল সংগীতশিল্পী পার্থ বড়ূয়াকে। কালই প্রথম এলেন এবারের মেলা প্রাঙ্গণে। জানালেন, ভেতরের গোছালো পরিবেশ দেখে তার মন ভরে গেছে। বললেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও ঢুকবেন। কিনবেন পছন্দের বই।
প্রতিদিনের মতো কালও আড্ডা জমে উঠেছিল লেখকদের ঘিরে। 'লেখক বলছি' মঞ্চে গতকাল কথা বলেছেন টোকন ঠাকুর, সৈয়দ তারিক, সাগুফতা শারমীন তানিয়া এবং আখতারুজ্জামান আজাদ।
হাজার ছাড়িয়েছে নতুন বই : নবম দিনে হাজার ছাড়িয়ে গেছে নতুন বইয়ের সংখ্যা। গতকাল পর্যন্ত নতুন বইয়ের সংখ্যা বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রের হিসাবে এক হাজার ১৩৬টি। তবে সব বই জমা পড়ছে না। কোনো কোনো প্রকাশক জমা দিচ্ছেন দেরিতে। তথ্যকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল মেলায় এসেছে ১৭৯টি নতুন বই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- হাসান আজিজুল হকের 'আমার রবীন্দ্র যাপন' (ইত্যাদি), আবদুল মান্নান সৈয়দের 'করতলে মহাদেশ' (অবসর), আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ও মোনায়েম সরকারের 'বঙ্গবন্ধু শতবর্ষে শত প্রবন্ধ' (আগামী), আবুল আহসান চৌধুরীর 'বঙ্গবন্ধু :অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্মৃতি অনুধ্যান' (শোভা প্রকাশ), সম্পদ বড়ূয়ার অনুবাদে 'কাজুও ইশিওরোর গল্প' (অন্যপ্রকাশ), আনিসুল হকের 'এখানে থেমো না' (প্রথমা), ইমদাদুল হক মিলনের 'বাবান ও টুনটুনি পাখি' (অনন্যা), আহসান হাবীবের 'সেরা ভূত' (অনুপম), আমীরুল ইসলামের 'ছড়া হাসে অনুবাদে' (প্রতিভা প্রকাশ), রাজীব সরকারের 'উগ্রবাদ ফ্যাসিবাদ' ও রবীন্দ্রনাথ (কথাপ্রকাশ), সনৎকুমার সাহার 'বঙ্গবন্ধু-বাংলাদেশ' (কথাপ্রকাশ), জুলফিকার মতিনের 'অমরত্বের জ্বালা' (বাংলাপ্রকাশ), দিব্যদ্যুতি সরকারের 'বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন' (বাংলা একাডেমি), সেলিনা হোসেনের 'কাঁটাতারে প্রজাপতি' (অন্যধারা), মহাদেব সাহার 'তোমার পায়ের শব্দ' (অনন্যা), মঙ্গল কুমার চাকমার 'বাংলাদেশের আদিবাসী :অধিকার ও প্রান্তিকতা' (বটেশ্বর), ফয়জুল ইসলামের 'বখতিয়ার খানের ঘোড়া' (সমগ্র), সুশান্ত হালদারের 'লাশকাটা ঘর' (নন্দিতা), দীপু মাহমুদের 'আধিয়ার' (পার্ল), নওশাদ জামিলের 'প্রার্থনার মতো একা' (অন্যপ্রকাশ) ইত্যাদি।
মেলামঞ্চের আলোচনা : বিকেল ৪টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় দিব্যদ্যুতি সরকার রচিত 'বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন' শীর্ষক বইয়ের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রাশিদ আসকারী। লেখক দিব্যদ্যুতি সরকার ছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন অ্যাডভোকেট সাহিদা বেগম ও ড. আশফাক হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আবুল মোমেন।
কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি ওবায়েদ আকাশ, মতিন বৈরাগী, আলতাফ শাহ্নেওয়াজ এবং স্নিগ্ধা বাউল। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মাহিদুল ইসলাম, সুপ্রভা সেবতী ও জি এম মোর্শেদ। নৃত্য পরিবেশন করেন লায়লা হাসানের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন 'নটরাজের' নৃত্যশিল্পীরা। সেলিম রেজার পরিচালনায় ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন 'সংস্কৃতি মঞ্চের' পরিবেশনা। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন জয় সিংহ রায় (তবলা)।
কিস্তিতে বই কেনার সুযোগ: অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বইপ্রেমীদের জন্য বিনা সুদে ঋণ সুবিধা নিয়ে 'সুবোধ' কার্যক্রম চালু করেছে বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেড। গতকাল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের ১২৭ নম্বর স্টলে এই কার্যক্রম শুরু হয়। এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ছিলেন আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও মমিনুল ইসলাম, গায়ক পার্থ বড়ূয়া, রবি টেন মিনিট স্কুলের চিফ ইভানজেলিস্ট আরিফ হোসেন প্রমুখ। মমিনুল বলেন, বর্তমান প্রজন্মের কাছে বইপড়ার আগ্রহ ফিরিয়ে আনাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
আইপিডিসি স্টলে দায়িত্বশীলরা জানান, মূলত তিন শ্রেণির পাঠকের জন্য এই সুবিধা। শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ দেড় হাজার, ব্যবসায়ীরা দুই হাজার এবং চাকরিজীবীরা তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বিনা সুদে ঋণ পাবেন।
আজকের আয়োজন : আজ গ্রন্থমেলার দশম দিন। মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে হবে মোহাম্মদ আলী খান রচিত 'ডাকটিকিট ও মুদ্রায় বঙ্গবন্ধু' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আতাউর রহমান। আলোচনায় অংশ নেবেন শ্যামসুন্দর সিকদার ও ইকরাম আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ফজলে কবির। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
