প্রাণহীন লিটলম্যাগ চত্বর
ছবি: সংগৃহীত
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬ | ০০:০২
এক সময় অমর একুশে বইমেলা মানেই ছিল লিটলম্যাগ চত্বরে কবি, লেখক, প্রকাশকদের জমজমাট আড্ডা। উৎসাহী ক্রেতা-পাঠকরাও কবি-লেখকদের সান্নিধ্য পেতে একবার হলেও ঢুঁ মারতেন সেখানে। কিন্তু সে দৃশ্য এখন অতীত। গত কয়েক বছর ধরে লিটলম্যাগ চত্বর জৌলুস হারাতে হারাতে কার্যত ধুঁকছে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এমনিতেই এক বিশেষ পরিস্থিতিতে বইমেলা দেরিতে শুরু হওয়া, রোজাসহ নানা কারণে এবার মেলায় লোক সমাগম কম। এর মধ্যে লিটলম্যাগ চত্বর যেন পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত প্রাঙ্গণে। যে স্থান তরুণ লেখক, কবি আর মননশীল পাঠকদের আড্ডায় মুখর থাকার কথা, সেখানে এখন বিরাজ করছে একরাশ নির্জনতা।
বৃহস্পতিবার বিকেলে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে চত্বরটি ঘুরে দেখা যায়, ৮৭টি স্টলের মধ্যে প্রায় অর্ধেকেরই ঝাঁপ বন্ধ। যে কয়টি খোলা আছে, সেখানেও নেই প্রাণের স্পন্দন। লাল এবড়োখেবড়ো মাটির ওপর সামিয়ানা দিয়ে ঘেরা এই চত্বরে এখন বইয়ের চেয়ে ধুলো আর মশার দাপটই বেশি। কোনো বসার ব্যবস্থা না থাকায় এবং পোকামাকড়ের উপদ্রবে স্টল প্রতিনিধিরা পর্যন্ত বেশিক্ষণ টিকতে পারছেন না। অনেক স্টলে শুধু বই সাজানো থাকলেও খুঁজে পাওয়া যায়নি কোনো বিক্রয়কর্মীকে। কোথাও আবার ঝুলে আছে প্রতিনিধির ফোন নম্বর সংবলিত চিরকুট। মেলা দেরিতে শুরু হওয়া এবং অবকাঠামোগত অব্যবস্থাপনায় হতাশ সৃজনশীল এই আঙিনার সংশ্লিষ্টরা।
চত্বরে লিটলম্যাগ ‘প্রতিবুদ্ধিজীবী’-এর স্টলের বিক্রয় প্রতিনিধি রনি আহমেদ আকাশ বলেন, প্রথম দিন বিক্রি হয়েছিল। এরপর আর তেমন কিছু বিক্রি হয়নি। তার থেকেও বড় যন্ত্রণা হচ্ছে মশার কামড়। আমরা বলে বলে ক্লান্ত হয়ে গেছি; কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই। বসে থাকাই কষ্টকর হয়ে যায়।
সামনের এবড়োখেবড়ো লাল মাটির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এই মাটির অবস্থা আগে আরও খারাপ ছিল। অনেকবার বলার পর সামান্য ঠিক করা হয়েছে।
‘প্রতিবেশী’ নামে আরেকটি লিটলম্যাগের স্টলে বসা বিনয় কস্তা পাশের তিনটি ফাঁকা স্টল দেখিয়ে বলেন, কেউ না এলে বসে থাকতেও বিরক্ত লাগে। তাই অনেকেই ঘোরাঘুরি করছেন। লিটলম্যাগ চত্বরে তো কেউ বই কিনতে আসে না, আসে আড্ডা দিতে। কিন্তু এবার সেই আড্ডাও নেই। ক্রেতা না থাকায় অনেকেই রাত ৮টার মধ্যেই স্টল বন্ধ করে চলে যাচ্ছেন।
‘জয়ধ্বনি’ স্টলের বিক্রয়কর্মী রাসেল আহমেদ বলেন, এই চত্বরে অন্তত ২৫-৩০টি স্টলের প্রতিদিনের বিক্রি মিলে দুই হাজার টাকা উঠছে না।
বৃহস্পতিবার দুপুরে দেখা যায়, চত্বরের ‘নিসর্গ’, ‘চিরহরিৎ’, ‘জলছবি’, ‘লিরিক’, ‘দুই পাতার আভাস’, ‘ক্ষ্যাপা’সহ বেশ কয়েকটি স্টল প্রায় খালি। আবার ‘মাটি ও বাংলা’, ‘রূপকথা’, ‘প্রত্যাশা’সহ কিছু স্টলে বই সাজানো থাকলেও কোনো বিক্রয় প্রতিনিধি নেই।
লিটলম্যাগের প্রকাশকরা বলছেন, চত্বরকে যেভাবে গোলাকৃতি বেষ্টনীর মধ্যে আলাদা করে রাখা হয়েছে, তাতেও দর্শনার্থীদের প্রবেশ কমে গেছে। মনে হয় যেন বইমেলার বাইরের কোনো অংশে বসে আছি। অথচ এটি তো মেলারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এইভাবে ঘিরে রাখার কারণেও এখানে মানুষ কম আসে।
দর্শনার্থীদের মধ্যেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নাহিয়ান রহমান নামে এক তরুণ বলেন, লিটলম্যাগ চত্বরে আগে একটা অন্যরকম প্রাণ ছিল বলে শুনেছি। লেখক-শিল্পীদের অনেকে আড্ডা দিতেন। কিন্তু আমি যে কয়বছর মেলায় আসছি, তার কোন লেশমাত্র দেখিনি।
তানিয়া সুলতানা নামে মধ্যবয়স্ক একজন বলেন, আমি ছোট পত্রিকা পড়তে ভালোবাসি। কিন্তু এখানে বসার কোনো ব্যবস্থা নেই। মশাও অনেক। তাই বেশিক্ষণ থাকা যায় না।
কাউছার হায়দার নামে আরেকজন বলেন, এখানে আরও আয়োজন দরকার। ছোট পত্রিকার পাঠকদের জন্য আলোচনা বা পাঠচক্র থাকলে মানুষ আসত।
মূলমঞ্চের আয়োজন ও নতুন বই
বৃহস্পতিবার মেলায় নতুন বই জমা পড়ে ৯২টি। বিকেল ৩টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জন্মশতবর্ষ: সুকান্ত ভট্টাচার্য’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুমন সাজ্জাদ। আলোচনায় অংশ নেন আহমেদ মাওলা। সভাপতিত্ব করেন আবদুল হাই শিকদার। লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন ও কবি আসাদ কাজল।
বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন শোভা চৌধুরী। আবৃত্তি পরিবেশন করেন শাকিলা মতিন মৃদুলা ও সালমা সুলতানা। সংগীত পরিবেশন করেন আব্দুল লতিফ শাহ, এলাহী মাসুদ, ডলি মণ্ডল, শামীম সালামসহ অনেকেই।
শুক্রবারের আয়োজন
শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায়। দুপুর ১টা পর্যন্ত চলবে শিশুপ্রহর। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘জন্মশতবর্ষ: কলিম শরাফী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অণিমা রায়। আলোচনায় অংশ নেবেন সাইম রানা। সভাপতিত্ব করবেন সাধন ঘোষ। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
- বিষয় :
- বইমেলা
