মেলায় নারীর জয়গান
ছবি-সংগৃহীত
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ২২:৪০
অমর একুশে বইমেলা কেবল কাগজের মলাটে মোড়ানো বইয়ের প্রদর্শনী নয়, একে বলা হয় বাঙালির মনন ও চেতনার বিশাল ক্যানভাস। ফলে প্রতিবছরই বিশেষ দিনগুলোতে মেলা হয়ে উঠে নানাভাবে উদযাপনময়। তবে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবার অমর একুশে বইমেলা ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন শুরু হয়নি। এ কারণে পহেলা ফাল্গুন, একুশে ফেব্রুয়ারির মতো বিশেষদিনগুলোতে লেখক, প্রকাশক, পাঠকরা অবিশ্বম্ভাবী মিস করেছেন বইমেলাকে। অবশেষে সব বাধা পেরিয়ে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মেলা রোববার একাদশতম দিনে এসে পেয়েছে ‘বিশ্ব নারী দিবস’ এর মতো বিশেষ উপলক্ষ। স্বাভাবিকভাবেই এ দিন বইমেলা যেন আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আবহে এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল। মেলা প্রাঙ্গণের প্রতিটি স্টল, প্রতিটি গলি আর মানুষের ভিড়ে আজ নারীদের যে সরব উপস্থিতি দেখা গেছে, তা কেবল কাজের প্রয়োজনে নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও আত্মপ্রকাশের এক অনন্য ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণী বিক্রয়কর্মীদের প্রাণবন্ত পদচারণা মেলাকে করে তুলেছে আরও প্রাণোচ্ছল।
ইডেন মহিলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাত আলম এবার প্রথমবারের মতো অনার্য পাবলিকেশনের বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, বইমেলায় কাজ করার সবচেয়ে বড় লাভ হচ্ছে, বিনামূল্যে পুরো মাসজুড়ে বই পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। নতুন নতুন বই সম্পর্কে জানা যায়। পাঠকদের সঙ্গে একটা আন্তরিক সম্পর্কও তৈরি হয়। তাই এই অভিজ্ঞতা আমার জন্য খুব আনন্দের।
অনিন্দ্য প্রকাশের স্টলে কাজ করছেন সাইমুন নেছা সাদিয়া। গত পাঁচ বছর ধরে তিনি নিয়মিত একই প্রকাশনীতে বিক্রয়কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, বইমেলা আমার কাছে খুব স্বাচ্ছন্দ্যের একটি জায়গা হয়ে গেছে। এটাও এক ধরনের ব্যবসা, কিন্তু এই ব্যবসায় জ্ঞানের মিশেল আছে। অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি মানসিকভাবেও অনেক লাভবান হচ্ছি।
আবার ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে মেলায় কাজ করছেন দিল্লির শারদা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিইসি বিভাগের শিক্ষার্থী পুষ্পিতা রায়। তিন মাসের বাৎসরিক ছুটিতে দেশে এসে তিনি কাজ করছেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে। নিজ আগ্রহ থেকেই বইমেলার কাজ বেছে নিয়েছেন বলে জানান তিনি। পুষ্পিতা বলেন, পড়াশোনার চাপ বা ইন্টার্নশিপ না থাকায় ভাবলাম ব্যতিক্রমী কিছু করি। শুরুতে একটু সমস্যায় পড়েছিলাম। অনুবাদের বইগুলোর বাংলা নাম বুঝতে কষ্ট হতো, কারণ আমি ইংরেজি নামের সঙ্গে বেশি পরিচিত। পাঠকদের কাছ থেকে শুনে শুনে পরে শিখে নিয়েছি।
সারাদিন মেলায় কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নারী বিক্রয়কর্মীদের অধিকাংশই বলছেন, দুপুরের কড়া রোদটুকু ছাড়া আর কোনো বিষয়কে বড় সমস্যা মনে করেন না। বরং পাঠকদের সঙ্গে আলাপচারিতা আর বইয়ের ভেতরেই তারা আনন্দ খুঁজে পান।
মেলা সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার পুরো বইমেলায় ৫৪৯টি স্টলে প্রায় হাজারখানেক বিক্রয়কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে নারী বিক্রয়কর্মীর সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। বড় ইউনিটের অনেক স্টলে তিন থেকে চারজন করে নারী বিক্রয়কর্মী ও সহযোগীকে কাজ করতে দেখা যায়।
এদিকে আজ নারী দিবসে বন্ধুদের সঙ্গে অনেক তরুণী ক্রেতা পাঠককেও মেলায় আসতে দেখা যায়। বিভিন্ন বয়সী নারী দলবদ্ধভাবে শাড়ি পরে মেলায় ঘুরে বেড়ান। অনেকেই বই কেনার পাশাপাশি ছবি তুলে ও আড্ডা দিয়ে সময় পার করেন। মেলায় আসা পুরুষ দর্শনার্থীরাও নারীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ফয়জুন রহমান নামে একজন বলেন, এমন উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশে নারীদের খুবই ইতিবাচক। বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার জায়গাও।
মূল মঞ্চের আয়োজন ও নতুন বই
আজ মেলার নতুন বই এসেছে ৭৫টি। বিকেল ৩টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘আসাদ চৌধুরী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কুদরত-ই-হুদা। আলোচনায় অংশ নেন সৈকত হাবিব। সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ আজিজুল হক। লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি, গবেষক, সাংবাদিক মাহবুব হাসান। বিকেলে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আগামীকাল বিকেল ৩টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘শহীদুল্লা কায়সার’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন শিবলী আজাদ। আলোচনায় অংশ নেবেন প্রশান্ত মৃধা। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিকেল ৪ টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
