বুড়িগঙ্গাপাড়ে জমজমাট পৌষ মেলা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৫:৩৪ | আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৫:৩৪
দেরিতে এলেও শীতের দাপট এবার ভালোই। দেশজুড়ে শৈত্যপ্রবাহ। হিম বাতাসে অবর্ণনীয় কষ্টে ছিন্নমূলের মানুষ। যদিও ঢাকায় ঝকঝকে রোদ ছড়াচ্ছে উষ্ণতা। এ উষ্ণতার মধ্যে নগর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আবহমান বাংলার পিঠাপুলিতে পৌষ হয়ে ওঠে অনন্য।
বাংলার অপরূপ এ ঋতু উদযাপনে আজ বৃহস্পতিবার বুড়িগঙ্গাপাড়ে পুরান ঢাকার ওয়াইজ ঘাটের বুলবুল ললিতকলা একাডেমির মাঠে শুরু হয়েছে তিন দিনের জমজমাট পৌষমেলা। শীতের রুক্ষতা, শুষ্কতা ও মলিনতার মধ্যে এ মেলা নগরীর যান্ত্রিক জীবনে দিচ্ছে বাড়তি আবেশ। এবার মেলায় ৮০টি সংগঠনের ২ হাজার শিল্পী অংশ নিচ্ছেন। রকমারি পিঠাপুলির স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি দর্শনার্থীরা প্রত্যেক দিন উপভোগ করবেন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
লোকায়ত জীবননির্ভর সংযাত্রা, যাত্রাপালা এবং নৃত্য-গীত ও কবিতার পরিবেশনায় সাজানো হয়েছে এ মেলা। পৌষমেলা উদযাপন পরিষদের এ আয়োজন উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। পৌষমেলা উদযাপন পরিষদ ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছের সভাপতিত্বে মেলা উদ্বোধন করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম।
মেলায় বহ্নিশিখার যন্ত্রসংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন। পরে দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন সাংস্কৃতিক সংগঠন ক্রান্তি, বহ্নিশিখা, মহিরুহ ও বাফা। এরপর বাফা, কত্থক নৃত্য সম্প্রদায়, নান্দনিক নৃত্য সংগঠন জিনিয়া নৃত্যকলা একাডেমি দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে। দলীয় আবৃত্তি করে কথা আবৃত্তি চর্চাকেন্দ্র এবং একক আবৃত্তিতে ছিলেন রফিকুল ইসলাম, ড. শাহাদাৎ হোসেন নিপু, আজহারুল হক আজাদ ও অনন্যা লাবনী পুতুল।
মেলায় একক গান পরিবেশন করেন ড. তাপসী ঘোষ, সমর বডুয়া, খাইরুজ্জামান কাইয়ূম, দিলবাহার খান, শান্তা সরকার। মঞ্চ মাতিয়ে তোলে সমীর বাউল, শাহানাজ বাউল, বাউল মমতা দাসীর ভরাট কণ্ঠ। সর্বশেষ মানিকগঞ্জের মহুয়া পালার নৃত্যনাট্যে পার হয় প্রথম দিন।
দর্শনার্থীরা ললিতকলা একাডেমির মাঠে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নানা পিঠাপুলির স্বাদ নিতে থাকেন। তাঁদের জিহ্বার আনন্দকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে মঞ্চের এসব পরিবেশনা। বুড়িগঙ্গার পাড় হয়ে ওঠে যেন একখণ্ড গ্রাম।
মেলায় দেখা মেলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পাটিসাপটা, তালবড়া, বিবিখানা, মুন্ডা, মোরা, ঝিনুক, দুধচিতই, জামাই পিঠা, বউ পিঠা, ভাপা পিঠা, পাকন, খেজুর পিঠা, মালপোয়াসহ নানা স্বাদের পিঠা। আগামী শনিবার পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে পৌষমেলা। আজ শীতের জড়তা কাটিয়ে যাঁরা সাতসকালে হাজির হয়েছিলেন, ললিতকলা একাডেমি চত্বরে আনন্দের উষ্ণতায় সময় কাটিয়েছেন তাঁরা। শিল্পীদের গানে, কবিতার উচ্চারণে, পিঠাপুলির মন মাতাল করা ঘ্রাণ কিছু সময়ের জন্য হলেও মনে করিয়ে দিয়েছিল গ্রামের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, 'পৌষমেলা ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাঙালির একটি অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন উৎসব। এর মাধ্যমে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সেতুবন্ধন রচিত হয়। পৌষমেলার উৎপত্তি ভারতের শান্তি নিকেতনে হলেও শত শত বছর আমাদের গ্রামবাংলা এ উৎসব আপন করে নিয়েছে।' তিনি বলেন, 'আমি ভালো পিঠাপুলি তৈরি করতে পারি। বিশেষ করে মায়ের বকুনি থেকে বাঁচতে তাঁর পিঠা তৈরিতে সাহায্য করতাম। আমি ঢেঁকি ভানতেও জানি। যদিও এখন আগের মতো ঢেঁকি নেই। মেশিনে ধান মাড়াই, চাল ও চালের গুঁড়া তৈরি হচ্ছে।'
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহসভাপতি ঝুনা চৌধুরী, বুলবুল ললিতকলা একাডেমির (বাফা) সভাপতি হাসানুর রহমান বাচ্চু, পৌষমেলা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. বিশ্বজিৎ রায় প্রমুখ।