ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

রাজীব নামেই 'জনতার কাউন্সিলর'

রাজীব নামেই 'জনতার কাউন্সিলর'
×

ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ১৪:৫৬ | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ১৫:০৪

পুরো মোহাম্মদপুর ছিল যেন তার পৈতৃক সম্পত্তি! যেখানে যা খুশি করেছেন। একের পর এক জমি দখল করেছেন, চাঁদা নিয়েছেন, জোর করে ঢুকে পড়েছেন স্থানীয় বিভিন্ন কমিটিতে। এমনকি স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানের ব্যানারে নিজের নাম না থাকায় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতিকে পিটিয়েছেন। পরে তাকে হটিয়ে নিজেই হয়েছেন ওই কমিটির সভাপতি। সেই স্কুলে গাছ লাগানোর নামে লোপাট করেছেন লাখ লাখ টাকা। মসজিদের জায়গা দখল করে অফিস-দোকান ভাড়া দিয়েও কোটি কোটি টাকা আদায় করেছেন তিনি। বাজারের ব্যবসায়ীদের ওপর নির্যাতন করে চাঁদা দিতে বাধ্য করেছেন। ডেভেলপার কোম্পানির কাছ থেকে চাঁদা আদায় আর জমি দখল ছিল তার পক্ষে খুবই সাধারণ ঘটনা। শনিবার রাতে গ্রেপ্তারের পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের অপকর্মের নানা কাহিনী বের হয়ে আসছে। গতকাল রোববার সরেজমিনে মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে জানা যায় এসব ঘটনা। নিজেকে 'জনতার কাউন্সিলর' হিসেবে পরিচয় দেওয়া এই জনপ্রতিনিধি কার্যত সিন্দাবাদের ভূত হয়ে চেপে বসেছিলেন স্থানীয় জনগণের ওপর।

সাধারণ পরিবারের সন্তান রাজীব কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর গত কয়েক বছরে প্রচুর অর্থ-সম্পদের মালিক হয়ে রাজা-বাদশাহর মতো চলাফেরা করতেন। তবে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর মোহাম্মদপুরে তার বাসা ও অফিসে তল্লাশি চালিয়ে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, 'আর্থিক লেনদেন-সংক্রান্ত নথিপত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।'

এদিকে, রাজীবকে গ্রেপ্তারের খবরে গতকাল মোহাম্মদপুরে আনন্দ মিছিল করেছে এলাকাবাসী। পরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ থেকে তারা সদ্য বহিস্কৃত এই কাউন্সিলরের শাস্তির দাবি জানান।

৩৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল ইসলাম পলাশ বলেন, 'ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠনের একজন নেতা ও জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ ওঠা দুঃখজনক। তবে কেউ দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে অপরাধে জড়ালে এর দায় অবশ্যই তার একার। এ ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক পরিচয় টেনে আনা ঠিক হবে না।'

সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, একজন সাবেক এমপির প্রিয়ভাজন হওয়ার সুবাদে তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করেন রাজীব। আর নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তার উত্থান। মোহাম্মদপুরের সবকিছু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান তিনি। তার নানামুখী কৌশল ও দাপটের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন সবাই। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বছিলা উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্রীড়া অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনের সঙ্গে তাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে ব্যানারে তার নাম না থাকা নিয়ে তিনি তুলকালাম কাণ্ড ঘটান। স্কুলটির তখনকার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আনোয়ার হোসেন জানান, অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে তার নাম রাখা হয়েছিল। কিন্তু ব্যানারে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় এবং তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা অতিথি থাকায় নামটি দেওয়া যায়নি। শুধু এই অপরাধে সবার সামনে তাকে মারধর করেন রাজীব ও তার সহযোগীরা। এরপর সাবেক এক এমপি আনোয়ারকে ডেকে পাঠান এবং স্কুল কমিটিতে রাজীবকে অন্তর্ভুক্তির কথা বলেন। তার কথা শুনে আনোয়ার যান বর্তমান এমপির কাছে। তবে তিনিও রাজীব ও সাবেক সেই এমপিকে ঘাঁটানোর সাহস করেননি। ফলে কোনো নির্বাচন ছাড়াই রাজীব হন সেই কমিটির সভাপতি। তারপর স্কুলের পরিবেশ উন্নয়নের নামে গাছ লাগানোর একটি প্রকল্প পাস করেন। সাত লাখ টাকা খরচ দেখিয়ে নামকাওয়াস্তে কয়েকটি গাছ লাগানো হয়, যার কোনোটিরই এখন অস্তিত্ব নেই। এভাবে স্কুলের নানা ফান্ডের টাকা তিনি নিজে বা সহযোগীদের মাধ্যমে লোপাট করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে স্কুলে ভবন নির্মাণের জন্য ছয় কোটি টাকার বাজেট আসে। সেই টাকা লুটপাটের উদ্দেশ্যে ভবন নির্মাণের জায়গা দেখাতে তিনি স্কুলের একটি চারতলা ভবন ভেঙে ফেলেন। স্কুলের সঙ্গে জড়িত এস এম আহমেদ ও শামীম নামের দু'জন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি ৩৭ লাখ টাকা দিয়েছিলেন ওই ভবনের জন্য। আরেক ভবনের জন্য আনোয়ার দেন ১০ লাখ টাকা। স্কুলের কমিটিতে রাজীব নিজের লোকজনকে সদস্য করেছেন, যাদের কেউ কেউ পঞ্চম শ্রেণিও পাস করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, আনোয়ার হোসেন ছিলেন বছিলা সিটি ডেভেলপার কোম্পানির চেয়ারম্যান। কিন্তু রাজীব নিজের প্রভাব বিস্তার করতে তাকে বাদ দিয়ে এম এ সালেক নামের নিজের অনুসারী এক ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান করেন। এই কোম্পানি মাঝেমধ্যেই 'প্রশাসন' খাত দেখিয়ে অদৃশ্য কাউকে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা দেয়, যা রাজীব পান বলে ধারণা সবার। একইভাবে বছিলার বিংকু বেপারী জামে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকেই আনোয়ারকে হটিয়ে দেন রাজীব। আর এর সবই তিনি করেন অনৈতিকভাবে, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে।

মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান, নবীনগর, কাটাসুর, বাঁশবাড়ী, ওয়াসপুর ও মোহাম্মদীয়া হাউজিংসহ বিভিন্ন এলাকায় রাজীবের বিরুদ্ধে জমি দখলের প্রচুর অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির এক নম্বর সড়কে তার অত্যাধুনিক ডুপ্লেক্স বাড়িটিও দখল করা জায়গায় তৈরি। সেটি পানির পাম্পের জন্য নির্ধারিত জায়গা ছিল। মোহাম্মদপুরের তিন রাস্তার মোড় এলাকায় দোতলা ভবনে ইমারত নির্মাণ শ্রমিকদের কার্যালয় রয়েছে। এই জায়গাটির দাবিদার আবু বকর ও রোশনা বেগম নামে দু'জন। মালিকানা নিয়ে বিরোধের সুযোগ নিয়ে এই জায়গা দখল করে রাজীব নিজের অনুসারী লোকদের বসিয়েছেন। নিচ তলায় দোকান ও ওপর তলায় নির্মাণ শ্রমিকদের অফিস করে দিয়েছেন। মালিক দাবিদার দু'পক্ষই বিষয়টি সমকালকে জানিয়েছে। দোকানের ভাড়া নানা হাত ঘুরে রাজীবই পান বলে দাবি একাধিক সূত্রের।

মোহাম্মদপুরের একাধিক মসজিদ কমিটি বিলুপ্ত করে বা জোর করে হটিয়ে নিজের লোকজনকে বসিয়েছেন রাজীব। ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল তিনি দলবল নিয়ে আল্লা করিম জামে মসজিদটি 'দখল' করে নেন বলে জানা যায়। মসজিদ কমিটির সাবেক এক নেতা জানান, তখন বিদ্যমান কমিটির সবাইকে ডেকে হুমকি দেওয়া হয় এবং মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়। ভয়ে সবাই পিছু হটেন। যারা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। এরপর নিজের আত্মীয়-স্বজনকে দিয়ে কমিটি করেন তিনি। মসজিদের জমিতে ১০৩টি দোকান ও বেশ কয়েকটি অফিস ভাড়া দেওয়া হয়েছে। প্রতি দোকান থেকে মাসে আকারভেদে ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ভাড়া আসে। অফিসের ভাড়া আরও বেশি। এই হিসাবে বছরে প্রায় দুই কোটি টাকা ভাড়া আদায় হয়, যার প্রায় পুরোটাই রাজীব পান বলে অভিযোগ রয়েছে।

কাদেরাবাদ হাউজিং এলাকার ফুটপাতে দোকান বসাতে গেলে সজীবের সহযোগীদের চাঁদা দিতে হয়। দোকান বসানোর সময় দিতে হয় তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। আর প্রতিদিন দিতে হয় ব্যবসা বুঝে ৫০, ১০০ ও ১৫০ টাকা করে। সেখান থেকে সজীব নামে একজন চাঁদা তোলেন আল-আমিনের নির্দেশে। ছাত্রলীগ নেতা পরিচয় দেওয়া আল-আমিন হলেন সজীবের ঘনিষ্ঠজন। ঈদুল আজহার সময় মোহাম্মদপুরের তিন রাস্তার মোড় থেকে বছিলা পর্যন্ত সড়কে বসানো হয় কোরবানির পশুর হাট। এই হাট থেকে প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি টাকা পান রাজীব।

মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি কাঁচাবাজারের সভাপতি আবুল হোসেন জানান, রাজীবের বাবা তোতা মিয়া ছিলেন রাজমিস্ত্রি। ২০০৬ সালের দিকে রাজীব যুবলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিশতে শুরু করেন। ২০১০ সালে সক্রিয় হন সংগঠনের সঙ্গে। এরপর ২০১৫ সালে তিনি কাউন্সিলর পদে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আধিপত্য বিস্তার করতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চান। মূলত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলাই ছিল তার উদ্দেশ্য। তাকে এক কোটি টাকা দিতেও চাওয়া হয়। তবে তিনি এতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। ফলে আবুল হোসেনকে সরিয়ে বেআইনিভাবে মহিউদ্দিন আহম্মেদ খোকাকে সভাপতি করেন তিনি। তিনি কর অঞ্চল-১০-এর প্রধান সহকারী হিসেবে কর্মরত। এরপর তার মাধ্যমে চার বছরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছেন রাজীব। এ ক্ষেত্রে তিনি ব্যবসায়ীদের নির্যাতন ছাড়াও নানা কৌশল ব্যবহার করেছেন।

শাহাবুদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ী জানান, নির্মাণ কাজের নামে কারও দোকানের সামনে বালুর বস্তা ফেলে রাখা হতো। অথবা কিছু দোকানের সামনে রশি টেনে বলা হতো সিটি করপোরেশনের কাজ হবে। আবার কারও দোকান ভেঙে দেওয়া হতো। ফলে ব্যবসা চালিয়ে যেতে চাঁদা দেওয়া ছাড়া গতি ছিল না।

রাজীবের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের নেতা এক মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ রয়েছে। তখন তাকে যুবলীগ থেকে বহিস্কার করা হলেও পরে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে পুনর্বহাল হন। এরপর তার দাপট আরও বেড়ে যায়। তিনি দলবল নিয়ে রাজকীয়ভাবে চলাফেরা করতেন। তার অন্তত সাতটি বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে।

রাজীবের বিরুদ্ধে দুই মামলা, ১৪ দিনের রিমান্ডে :সন্ত্রাসী কর্মকা, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগে গ্রেপ্তার তারেকুজ্জামান রাজীবকে গতকাল সন্ধ্যায় ভাটারা থানায় হস্তান্তর করেছে র‌্যাব। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে র‌্যাবের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। পরে রাতে তাকে আদালতে হাজির করে দুই মামলায় ১০ দিন করে মোট ২০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। শুনানি শেষে আদালত প্রত্যেক মামলায় ৭ দিন করে মোট ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানান, তার বাড়িতে আর্থিক লেনদেন-সংক্রান্ত যেসব নথিপত্র ছিল, তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে তারই এক সহযোগীর আত্মীয়ের বাড়ি থেকে একটি চেকবই জব্দ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্র্যাক ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে একদিনে পাঁচ কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি কোথায় কত টাকা জমা দিয়েছেন, কেন দিয়েছেন তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তিনি জানান, কাউন্সিলর হওয়ার আগে রাজীবের দৃশ্যমান কোনো পেশা বা ব্যবসা ছিল না। বর্তমানে তিনি সিটি করপোরেশন থেকে যে সম্মানী পান সেটা তার একমাত্র আয়। এর বাইরে তার অবৈধ সম্পদ বা আয়ের যেসব তথ্য রয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তার রাজকীয় বাড়িটির দাম প্রায় ১০ কোটি টাকা। বাড়ির আসবাব থেকে শুরু করে প্রতিটি জিনিস বিদেশ থেকে আমদানি করা।

আরও পড়ুন

×