ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

এক পরিবারের মাধ্যমেই আক্রান্ত শাঁখারীবাজার

এক পরিবারের মাধ্যমেই আক্রান্ত শাঁখারীবাজার
×

আতাউর রহমান

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২০ | ১১:৫৭ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০২

পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার এলাকায় মূল গলিতে হাঁটতে গেলে একজনের সঙ্গে অন্যজনের শরীর লেগে যায়। চোরাগলিতে তো ধাক্কাধাক্কি আর চিড়েচ্যাপ্টা হতে হয়। হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত এলাকাটা আয়তনে ছোট হলেও এখানকার পুরোনো দালানগুলোর খুপরি কক্ষে গাদাগাদি করে বহু মানুষের বসবাস। করনোভাইরাসের এই সময়টাতে তাই এলাকাটি নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্থানীয় প্রশাসন।
আইইডিসিআর এবং স্থানীয় থানা পুলিশ বলছে, এরই মধ্যে শাঁখারীবাজারে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এক দম্পতি মারা গেছেন। এরপর গত শুক্রবার পর্যন্ত পরীক্ষা করে ২০ জনের দেহে পাওয়া গেছে করোনাভাইরাস। অন্য বাসিন্দাদের অসচেতনতায় মারা যাওয়া দম্পতির মাধ্যমেই অন্যদের দেহে ভাইরাস ছড়িয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
পুলিশের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ঘিঞ্জি এলাকাটায় আরও অনেক বাসিন্দা তাদের দেহে এই ভাইরাস বহন করছেন। শাঁখারীবাজারসহ আশপাশের অতি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা রক্ষায় এখানকার লোকজনকে বেশি করে করোনা পরীক্ষা করা দরকার।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে মনে হয়েছে, দু'জন মারা যাওয়ার পর তারা অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন। আতঙ্ক ছড়িয়েছে সবার মধ্যে। পুরোনো ভবনগুলোর খুপরি কক্ষগুলোতে রাতদিন কাটাতে হচ্ছে।
অনেকে প্রয়োজনীয় খাবারও কিনতে পারছেন না। আতঙ্কে এখানে কেউ ত্রাণ নিয়েও আসছেন না।
কোতোয়ালি থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, শাঁখারীবাজারে সম্প্রতি করোনার উপসর্গ নিয়ে এক নারী মারা যান। পরে পরীক্ষা করে তার দেহে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব মেলে। এর কয়েক দিনের মধ্যে ওই নারীর স্বামীও মারা যান। এর পরই এলাকাটি লকডাউন করা হয়। এলাকাটিতে এ পর্যন্ত ২০ জনের দেহে এই ভাইরাস পাওয়া গেছে।
ওসি বলেন, শাঁখারীবাজারে একেকটা কক্ষে অনেক মানুষের বসবাস। ওই দম্পতির মৃত্যুর পর অনেকে মরদেহ দেখতে আসেন। নানা ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। এতে গোটা এলাকায় ভাইরাস ছড়ায়।
ওসির বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় হিন্দু সল্ফপ্রদায়ের একজন নেতা অজয় কুমার নন্দীর ভাষ্যেও। স্থানীয় শনিদেব মন্দিরের সভাপতি অজয় কুমার নন্দী বলেন, ওই নারী বাসায় অসুস্থ হলে স্থানীয় একজন ফার্মাসিস্টকে রক্তচাপ মাপতে বাসায় ডেকে আনা হয়। পরীক্ষা করে দেখেন, নারী আগেই মারা গেছেন। এর কয়েকদিন পরই ফার্মাসিস্টসহ তার পরিবারের চারজনের দেহে ভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর দম্পতির শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া কয়েকজনের দেহেও ভাইরাস মেলে।
তিনি বলেন, চিকিৎসার জন্য কয়েকজনকে কুর্মিটোলায় পাঠানো হয়েছিল। করোনা শনাক্তের পরও সেখান থেকে তাদের বাসায় ফেরত পাঠানো হয়। কারণ তাদের সংক্রমণ ছিল মৃদু। কিন্তু শাঁখারীবাজারের অধিকাংশ বাসায় একেকটি কক্ষে পাঁচ থেকে ছয় জন গাদাগাদি করে থাকে। পুরো ভবনে একটি গোসলখানা এবং একটি টয়লেট বহুজনকে ব্যবহার করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে এখানে এই ভাইরাস ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। অজয় কুমার বলেন, শাঁখারীবাজারে মহামারি ঠেকাতে তিনি স্থানীয় এমপি, সাবেক এমপি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দু'জন যুগ্ম সচিব ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বলেছেন, এখানে বেশি বেশি পরীক্ষা করে সবাইকে যাতে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়। কারণ এই এলাকায় হোম কোয়ারেন্টাইন সম্ভব নয়। কিন্তু এক সপ্তাহেও কোনো লাভ হয়নি। এতে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
শাঁখারীবাজারের স্থায়ী বাসিন্দা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের আরও তিনজন নেতা সমকালকে বলেছেন, পুরো শাঁখারীবাজারে পাঁচ শতাধিক পরিবারের অন্তত ২০ হাজার লোকের বাস। চার ভাগের তিন ভাগই অতি দরিদ্র। কিন্তু এলাকায় কেউ ত্রাণ নিয়েও আসেননি। গত কয়েকদিনে স্থানীয় কাউন্সিলরের মাধ্যমে মাত্র ৪০ জন ত্রাণ পেয়েছেন। এমন অবস্থা চলতে থাকলে এখানে লোকজন না খেয়ে মরবেন।
তারা বলেন, এতদিন সড়কের দুই মাথায় ব্যারিকেড দিয়ে পুলিশ পাহারা থাকলেও দু'দিন ধরে পুলিশ নেই। এতে লোকজনও বাসা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। গলিতে ঘুরছেন। তা ছাড়া শাঁখারীবাজারের প্রবেশপথগুলোতে স্বাভাবিক সময়েও পুলিশ পাহারা থাকত, তাও নেই। সঙ্গত কারণেই তারা আতঙ্কিত।
অবশ্য কোতোয়ালি থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, সবকিছু বিবেচনায় পুলিশ ব্যারিকেড একটু দূরে স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া পুরো এলাকায় আগের মতোই নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে।
পুলিশের অন্য এক কর্মকর্তা বলেছেন, গত কয়েকদিন ধরে পুলিশের যেসব সদস্য ওই এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে একজন উপপরিদর্শকসহ কয়েকজনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। এলাকাটিতে টহল দিতে পুলিশ সদস্যরা ভয় পাচ্ছেন।

আরও পড়ুন

×