ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বৈষম্যের মূল উৎসে কেউ হাত দিচ্ছে না

বিআইডিএসের অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদরা

বৈষম্যের মূল উৎসে কেউ হাত দিচ্ছে না
×

‘অ্যাপোসলস অব ডেভেলপমেন্ট: সিক্স ইকোনমিস্টস অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড দে মেইড’ শীর্ষক বই নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস আয়োজিত সেমিনারে অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদসহ অতিথিরা -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও অর্থনীতি গুটিকয়েক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে বন্দি। নীতি প্রণয়নে সবাই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বা কল্যাণ রাষ্ট্রের কথা বলছে বটে, তবে কেউই কাঠামোগত বৈষম্যের মূল উৎসে হাত দিচ্ছে না। আবার স্বাধীনতার পর এখনও দেশ টেকসই শাসনব্যবস্থা ঠিক করতে পারেনি। রাজনৈতিক চরিত্র কি ডানপন্থি, না বামপন্থি, নাকি মধ্যপন্থি– এটিও ঠিক হয়নি। ফলে অর্থনীতি কোন ‘মডেল’ অনুসরণ করে চলবে, সেই মৌলিক সিদ্ধান্ত ঠিক করা যায়নি। উন্নয়নের বিপরীতে বৈষম্য ভীষণ ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত এক আলোচনায় অর্থনীতিবিদরা এসব কথা বলেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএসের সম্মেলন কক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডেভিড সি. এঙ্গারম্যানের লেখা ‘অ্যাপোসলস অব ডেভেলপমেন্ট: সিক্স ইকোনমিস্টস অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড দে মেইড’ শীর্ষক বই নিয়ে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

বইটিতে অধ্যাপক রেহমান সোবহানসহ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া উপমহাদেশের ছয় খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অধ্যাপক রেহমান সোবহানও আলোচনায় অংশ নেন। আরও বক্তব্য দেন বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক বিনায়ক সেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম এম আকাশ। উপস্থিত ছিলেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও মোস্তাফিজুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক।

যে বইটি নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান, তাতে রেহমান সোবহান ছাড়াও পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল হক, শ্রীলঙ্কার লাল জয়াবর্ধনে, ভারতের অমর্ত্য সেন, জগদীশ ভাগবতী ও মনমোহন সিংকে নিয়ে আলোচনা ও তাদের অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে বলা হয়েছে। তারা ছয়জনই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং পরে নিজ দেশে ফিরে উন্নয়নশীল বিশ্বের উন্নয়নতত্ত্বে বিশেষ অবদান রেখেছেন। 
আলোচনায় পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশ হওয়ার পর ডান-বাম নিয়ে অনেক কথা বললেও এখনও আমরা টেকসই শাসন ব্যবস্থা ঠিক করতে পারিনি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং সত্যিকার অর্থে প্রতিনিধিত্বশীল ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ করতে চাই, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকবে। বিচার বিভাগসহ অন্যান্য জাতীয় প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করবে, যাতে মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার সমুন্নত থাকে। পাশাপাশি এ ব্যবস্থা এমন হবে, যেখানে ক্ষমতা ও আয়বৈষম্য কমবে এবং ন্যায্য সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।’

তিনি আরও বলেন, সফলভাবে গণতন্ত্রে উত্তরণ করতে পারলেও যে প্রশ্নটি এখন ভুলে আছি– আমরা কি দক্ষিণ বা মধ্য দক্ষিণ, মধ্য দক্ষিণ, না মধ্য বাম, নাকি বামপন্থি– তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হবে। সম্ভবত বাম বা ডান বা মধ্য নতুন মাত্রা পাবে। যেখানে কে কোন পন্থি, তার শ্রেণিবিভাজন করা কঠিন হবে।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য কোনো বাজারচালিত নয়, বরং রাষ্ট্রচালিত প্রক্রিয়া ছিল। শক্তিশালী রাষ্ট্রই সেখানে বৈষম্য তৈরি করেছিল। স্বাধীনতার পরের বাস্তবতায় সোবহান বলেন, ‘আমরা মনে করেছিলাম, জাতীয়করণই বৈষম্য দূর করবে। কিন্তু আমরা ভুল করেছিলাম। কারণ সমাজতন্ত্রকে কেবল রাষ্ট্রীয় মালিকানার সঙ্গে একীভূত করা ভুল ধারণা।’
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, সমাজতন্ত্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্রের ওপর। রাষ্ট্রের ভেতর যদি বৈষম্যমূলক কাঠামো বজায় থাকে, তবে জাতীয়করণ শুধু ক্ষমতার স্থানান্তর ঘটায়, বৈষম্য দূর করে না।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান আক্ষেপ করে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো উন্নতি করেছে, দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু সমাজগুলো আরও অসম হয়ে উঠেছে। এখন রাষ্ট্রের ক্ষমতা গুটিকয়েক আর্থিক গোষ্ঠীর হাতে বন্দি। 

বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, নীতি প্রণয়নে সবাই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বা কল্যাণ রাষ্ট্রের কথা বলে। কিন্তু কেউই কাঠামোগত বৈষম্যের মূল উৎসে হাত দিচ্ছে না। গঠনমূলক পরিবর্তন ছাড়া কোনো সামাজিক ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। 

আরও পড়ুন

×