বেতন পাওয়ার আগেই কিশোর আলিম অঙ্গার
আবদুল আলিম
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাবা নূর ইসলাম অসুস্থ, দুর্ঘটনায় কাজ করার সক্ষমতা হারিয়েছেন। বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন মা তারা বেগম। সংসার চলে না। বাধ্য হয়ে স্কুলপড়ুয়া ১৩ বছর বয়সী আবদুল আলিমকে দিনকুড়ি আগে ছয় হাজার টাকা বেতনে পোশাক কারখানায় কাজে দেন।
প্রথম মাসের বেতন পাওয়ার আগেই পুড়ে অঙ্গার আবদুল আলিম। গত মঙ্গলবার মিরপুরের রূপনগর শিয়ালবাড়ির আরএন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে খোঁজ নেই তার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে লাশ শনাক্ত করেছেন স্বজন। পুড়ে কালো হয়ে গেছে, চেনার উপায় নেই। শরীর ও মুখের গঠন এবং শরীরের আধপোড়া গেঞ্জি দেখে নিশ্চিত করলেও মিলছে
না লাশ। ডিএনএ পরীক্ষার পর লাশ দেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে জটিলতা বাড়িয়েছে একই লাশকে আরেক পরিবার তাদের সন্তান দাবি করায়।
গতকাল বুধবার ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে মাটিতে গড়াগড়ি করে কাঁদছিলেন নূর ইসলাম। স্বজনের কোনো সান্ত্বনা কাজে আসছে না। মা তারা বেগম বারবার মূর্ছা যাওয়ায়, বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
স্বজন জানান, নূর ইসলাম ও তারা বেগম দম্পতির বাড়ি নাটোরের সিংড়ার কৃষ্ণপুর গ্রামে। সহায়-সম্বলহীন পরিবারটি ১৫ বছর আগে ঢাকায় আসে। মিরপুরের এক বস্তিতে আশ্রয় নিয়ে নূর শ্রমিকের কাজ করতেন। এক দুর্ঘটনায় শারীরিকভাবে কাজ করার সক্ষমতা হারান তিনি। একমাত্র মেয়ে রুখসানা সাবালিকা হওয়ার আগেই বিয়ে দেন স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী আলামিন রুবেলের সঙ্গে। নূরের দুই ছেলের মধ্যে আবদুল আলিম বড়; ছোট ছেলে শিহাবের বয়স সাত বছর।
মেয়ের জামাই আলামিন রুবেল বলেন, বাসাবাড়ির কাজে মায়ের (শাশুড়ি) যা আয়, তা দিয়ে সংসার চলে না। মাঝেমধ্যে আমিও সহায়তা করি। কিন্তু এভাবে কতদিন? বাধ্য হয়ে মা গত মাসে আনোয়ার ফ্যাশনসে দেন আলিমকে। কাজ করত ওয়াশিং ইউনিটে। প্রথম মাসের বেতনও পায়নি। মঙ্গলবার আগুন লাগার পরপরই আমরা সেখানে গিয়ে খোঁজ করে আলিমকে পাইনি।
তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার রাতেই আমরা ঢামেক যাই। মর্গে মা-বাবা পোড়া শরীর দেখে আলিমকে শনাক্ত করেন। ওর গায়ের গেঞ্জি পুরো পোড়েনি; বেল্টও প্রায় অক্ষত। পুড়ে গেলেও উুঁচ দাঁত স্পষ্ট। উচ্চতা, শারীরিক অবয়ব সবকিছু দেখেই আলিমের লাশ শনাক্ত করা হয়।
আলিমের বাবা নূর ইসলাম বলেন, আমার ছেলেকে আমি চিনব না! পুড়ে গেলেও আমি চিনতে পেরেছি। ওর মাসহ সবাই আলিমকে চিনেছে। কিন্তু লাশ আমাদের দিচ্ছে না। কখন মিলবে, সে আশায় বসে আছি।
স্বজন জানান, রূপনগর থানার এসআই লস্কর হাসপাতালে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। লাশটা দিলে গ্রামে নিয়ে দাফন করা হবে। স্বজনের কাছ থেকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার টাকাও সংগ্রহ করা হয়েছে। এরই মধ্যে গতকাল বুধবার দুপুরে আরেকটি পরিবার দাবি করে, আলিমের লাশটি তাদের সন্তান। এর পরই বেঁকে বসে কর্তৃপক্ষ।
আলিমের দুলাভাই আলামিন রুবেল বলেন, এখন মা-বাবাকে ডিএনএর নমুনা দিতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে লাশ মিলবে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে মা মুখে খাবার তোলেননি, বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনাও খুব খারাপ। লাশ কখন নিতে পারব, তা নিয়ে সবাই দুশ্চিন্তায়।
- বিষয় :
- আগুনে পুড়ে মৃত্যু
