ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

ঢাকায় বেকার বেশি, আয়ু কমছে, জনসংখ্যা কেন বাড়ছে

ঢাকায় বেকার বেশি, আয়ু কমছে, জনসংখ্যা কেন বাড়ছে
×

জনসংখ্যার দিক দিয়ে ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। ছবি: সমকাল

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৭:২৯ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ২০:৫৮

ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা কিংবা জাপানের টোকিওর তুলনায় ঢাকায় জীবনমানের ব্যবধান বেশ স্পষ্ট। তবুও জনসংখ্যা বিবেচনায় ঢাকা এখন এই দুই শহরের সঙ্গে একই তালিকায় অবস্থান করছে। উচ্চ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা শহরটিতে বায়ুদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু কমছে। অধিকাংশ মানুষের আয় চলনসই। এরপরও প্রতি বছর মানুষের ভিড় বাড়ছে এই শহরে।

কেন বাড়ছে সে প্রশ্নের উত্তর হয়তো অনেকেরই জানা। এরপরও আগ্রহ থেকে যায়, চক্রটি ঘুরছে কোন প্রক্রিয়ায়। বিষয়টি বুঝতে প্রথম ধাপে একটি তত্ত্বের আশ্রয় নেওয়া যাক। ‘ক্লাস, স্ট্যাটাস, পার্টি’ নামের ধারণাটির প্রবক্তা জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার। যেখানে বলা হচ্ছে, মানুষের স্থানান্তর এই তিনটি বিষয় দ্বারা অনেকটা নির্ধারিত হয়। ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থান (ক্লাস), আধুনিক জীবনধারা (স্ট্যাটাস) ও ক্ষমতা চর্চার সুযোগ (পার্টি) যেখানে থাকবে মানুষ সেদিকেই ধাবিত হবে।

প্রশ্ন হলো- যে আশায় মানুষ ঢাকায় ছুটে আসছে, সেই আশা পূরণের বর্তমান চিত্রটি কেমন? ২০৫০ সাল নাগাদ শহরের জনসংখ্যা ৫ কোটি ২১ লাখ হবে। নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যতে কী হতে পারে? বিকেন্দ্রীকরণের পথ-ই বা কতটা খোলা? এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্য শহরগুলো কী করেছে?

কী কারণে কত মানুষ বাড়ছে
বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মেয়রদের একটি জোট আছে, মেয়রস মাইগ্রেশন কাউন্সিল (এমএমসি)। তারা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে প্রতিদিন ঢাকায় নতুন করে ২ হাজার মানুষ যুক্ত হয়। বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। আর বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটে থাকা এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের ৬৬.২ শতাংশের লক্ষ্য থাকে ভালো বেতনের চাকরি ও তুলনামূলক উন্নত জীবনযাপনের। ঢাকা শহরের ক্ষেত্রেও তাই।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে প্লাবিত খুলনার ঝুলন্ত পাড়া গ্রামের একাংশ। ছবি: এএফপি

গত বছর একটি জরিপের তথ্য প্রকাশ করে পিপলস কারেজ ইন্টারন্যাশনাল এবং দ্য অ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট (এসিডি)। এতে বলা হয়, ৭১ শতাংশ অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর ঘটে কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে। ৬৯ শতাংশ স্বল্প মজুরির কারণে শহরমুখী হতে বাধ্য হন। 

ক্লাইমেট রেসিলেন্স ফর অল নামের একটি সংস্থা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অন্য জেলা থেকে ঢাকায় এসেও মানুষ একই ধরনের সমস্যায় পড়ছে। উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে জীবনযাপন অসহনীয় পর্যায়ে যাচ্ছে। গত জুলাইয়ে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় বলা হয়, ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বেড়েছে ৭ গুণ। আর ভূমির তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। 

ঢাকায় জীবিকার চিত্র
জাতিসংঘ তাদের প্রতিবেদনে শহর হিসেবে ঢাকার আশপাশের এলাকাকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাই জীবিকার বর্তমান অবস্থা বুঝতে গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি জরিপের দিকে নজর দেওয়া যাক। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, দেশে সবচেয়ে বেশি বেকার ঢাকা বিভাগে- ৬ লাখ ৮৭ হাজার। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকার প্রায় ২০ লাখ। যাদের মধ্যে ২৯ শতাংশের মতো স্নাতক ডিগ্রিধারী। 

এসব সংখ্যাগত তথ্যের মূল নির্যাস হলো- উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক লাখ তরুণ-তরুণী এই শহরে পাড়ি জমায়। আবার শিল্প-কারখানা, বহুজাতিক কোম্পানির কারণে পড়াশোনা শেষে অধিকাংশই ঢাকাতেই থেকে যাচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দা ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের কারণে চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতায় অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রায়ই অপেক্ষাকৃত কম বেতনের চাকরিতে ঢুকতে বাধ্য হচ্ছেন। 

ঢাকায় যানজটে নষ্ট হয় কর্মঘণ্টা। ফাইল ছবি: ফোকাস বাংলা

ম্যাক্স ওয়েবারের তত্ত্ব ধরে বলা যায়, ব্যক্তির ক্লাস ও স্ট্যাটাস এর ভাবনা তাঁকে ঢাকায় থাকতে বাধ্য করছে। এক্ষেত্রে গড় আয়ু কমার পরিসংখ্যানও তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের (একিউএলআই) চলতি বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা ও পাশের নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরের মতো সবচেয়ে দূষিত এলাকায় বসবাসকারী মানুষের আয়ু কমছে গড়ে সাড়ে ৬ বছর।

ঢাকায় জনস্রোতের সবশেষ চিত্র
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ‘বৈশ্বিক নগরায়ণ ধারণা-২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ। বিশ্বে এখন ঢাকার ওপরে আছে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা- ৪ কোটি ১৯ লাখ। তৃতীয় স্থানে থাকা জাপানের টোকিওর বাসিন্দা ৩ কোটি ৩৪ লাখ। 

ঢাকার চেয়ে জাকার্তার আয়তন প্রায় দ্বিগুণ- ৬৬২.৩ বর্গ কিলোমিটার। আর টোকিওর আয়তন প্রায় ২ হাজার ১৮৭.৬৬ বর্গ কিলোমিটার। জাতিসংঘ বলছে, ঢাকার তুলনায় এ দুটি শহরের জনসংখ্যাই ২০৫০ সাল নাগাদ নিয়ন্ত্রিত হারে বাড়বে। তখন ৩৬০ বর্গ কিলোমিটারের ঢাকা হবে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর।

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার। ২০০০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ। অর্থ্যাৎ, ২৫ বছরে বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে শীর্ষে উঠবে।

ঢাকাসহ জনবহুল নগরীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চিত্র। গ্রাফিকস: সমকাল

জাতিসংঘ ঢাকার কতটুকু আয়তন ধরে জনসংখ্যার হিসাব করেছে সে ধারণা পাওয়া যায় তাদের দেওয়া শহরের সংজ্ঞা থেকে। প্রতিবেদন বলেছে, শহর বলতে সেই সব ভৌগোলিক অঞ্চলকে বোঝানো হয়েছে যেগুলোর জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে কমপক্ষে ১,৫০০ জন এবং মোট জনসংখ্যা কমপক্ষে ৫০ হাজার। তারা এই সজ্ঞায়ন নিয়েছে বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত ‘ডিগ্রি অব আরবানাইজেশন’ ব্যবস্থা থেকে। যেখানে শহর বলতে নগর সমষ্টিকে বোঝানো হয়েছে। সে অনুযায়ী, ঢাকার আশপাশের এলাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধিও ঢাকা শহরের হিসেবে গণ্য হবে। 

ভবিষ্যত কেমন হবে
স্বয়ংক্রিয়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে ভবিষ্যতের শ্রমবাজার আরও দ্রুত পরিবর্তনশীল হবে। ঢাকায় যদি কেবল একই ধরনের সেবামূলক খাত বা ঐতিহ্যবাহী শিল্প গড়ে উঠতে থাকে, তাহলে চাকরির বাজার সংকীর্ণ হয়ে পড়বে। 

বড় প্রভাব পড়তে পারে জীবনমানের ক্ষেত্রে। অর্থনীতির চাহিদা-যোগানের সূত্র ধরে বলা যায়, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ যেমন কঠিন হবে, তেমনি আবাসন খাতে বাড়বে ভাড়া। গণপরিবহন খাতও আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আর এই চক্রের প্রভাব ঘুরে ফিরে সেই জাতীয় উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। অনেকটা যানজটের মতো। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকা পরিবহন কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) এক সেমিনারে জানানো হয়, ঢাকায় যানজটে দিনে নষ্ট হয় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলছেন, ঢাকা যদি পরিকল্পনাহীনভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি আজকের দ্বিগুণ হবে। ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড, বন্যা, গৃহহীনতা, কর্মসংস্থানের সংকট- সবই বেড়ে যাবে।

জাকার্তা-টোকিও যা করছে
বিশ্বব্যাংক তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় রাজধানী সিউলে মোট কর্মসংস্থানের এক-তৃতীয়াংশেরও কম কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক জোনে অবস্থিত। ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সৃষ্ট নতুন কর্মসংস্থানের অর্ধেকেরও বেশি ছিল শহরতলিতে। ফ্রান্সের প্যারিস ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে দৈনিক যাতায়াতের প্রায় ৩০ শতাংশ শহরের কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে হয়। অর্থ্যাৎ, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোর বেশিরভাগই শহরতলিতে। 

জাকার্তা থেকে দূরে নতুন রাজধানী তৈরি করছে ইন্দোনেশিয়া। ছবি: এএফপি

ইন্দোনেশিয়ার সরকার জনসংখ্যা বিস্ফোরণের কারণে জাকার্তা থেকে রাজধানী সরিয়ে নিচ্ছে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দূরের বোর্নিও দ্বীপে। ২০১৯ সাল থেকে নুসানতারা নামে নতুন রাজধানী নির্মাণ শুরু হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্টের দপ্তর, সরকারি প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়গুলোর কেন্দ্র হবে শহরটি। আর ২০১৫ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে একটি কর্মসূচি চালু করেন। যেটির আওতায় টোকিও থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে জনসংখ্যা স্থানান্তর শুরু হয়েছে।

আদিল মুহাম্মদ খান বলছেন, বাংলাদেশেও সব সময় বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টোটা হচ্ছে। 

এই নগর পরিকল্পনাবিদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক দ্রুত ছড়াচ্ছে। চট্টগ্রাম, যশোর, কুমিল্লা, সিলেট, রংপুর, বরিশাল- প্রতিটি জায়গায় সম্ভাবনা আছে। যদি এখনই বিকেন্দ্রীকরণ, পরিকল্পিত নগরায়ণ, নিরাপদ আবাসন এবং কর্মসংস্থানের সমান্তরাল নীতি নেওয়া যায়, তাহলে আগামী ২০-২৫ বছরে ঢাকাকে চাপমুক্ত করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

×