পুরোনো কায়দায় চলছে হকার উচ্ছেদ
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ | ০৯:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক হিসেবে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার এক দিন পরই মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় হকার উচ্ছেদের নির্দেশ দেন শফিকুল ইসলাম খান। এর পর ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে আগারগাঁও থেকে মিরপুর ১২ এবং কচুক্ষেত থেকে মিরপুর ১ নম্বর পর্যন্ত এলাকায় রাস্তা-ফুটপাত হকারমুক্ত করা হয়। কিন্তু এক মাসের মধ্যে সেসব এলাকায় ফিরে আসে পুরোনো চিত্র।
একই রকম ঘটনা ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায়ও। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম ডিএসসিসির প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পরই গুলিস্তান, পল্টন, যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, লালবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা-ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করা হয়। সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ যৌথভাবে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাস্তা-ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার সপ্তাহ পেরোনোর আগেই হকাররা আবার বসতে শুরু করেন। ওইসব এলাকায়ও পুরোনো চেহারা ফিরে এসেছে।
উচ্ছেদের নামে ‘পুলিশ-হকার খেলা’ নতুন নয়। ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকনের আমলে কেবল গুলিস্তানেই ২৮৫ দিন হকার উচ্ছেদ অভিযান চালানোর নজির আছে। এক পর্যায়ে ২০১৮ সালে হকাররা জোট বেঁধে নগর ভবনে আক্রমণ করে। এর পর সাঈদ খোকন আর হকারদের বিষয়ে বড় কোনো পদক্ষেপ নেননি। মেয়র থাকা অবস্থায় ব্যারিস্টার শেখ ফজলের নূর তাপস সবুজ, হলুদ, লাল রং দিয়ে ফুটপাত সড়ক মার্কিং করে দিয়েও হকারদের তাঁর মতো করে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি।
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকান্দার হায়াৎ সমকালকে বলেন, আগে এক দলের নেতাকর্মী ও পুলিশ হকারদের কাছ থেকে চাঁদা তুলত। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এলোমেলোভাবে ভাগবাটোয়ারা হয়েছে। এবার উচ্ছেদের পর নতুন বন্দোবস্ত চালুর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, হকারদের জন্য তারা ১০ দফা দাবি সরকারের কাছে দিয়েছেন। এর মধ্যে আছে হকারদের জন্য আইন করা, তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া এবং ফুটপাতের তিন ভাগের এক ভাগে হকারদের বসতে দেওয়া। যতদিন পর্যন্ত হকারদের জন্য আইন না হবে, ততদিন সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক হকার নেতা সমকালকে বলেন, কেবল সরকার পরিবর্তন হলেই যে বন্দোবস্তের পরিবর্তন হয়, এমন নয়। মেয়র-প্রশাসকের পরিবর্তন হলেও বন্দোবস্তে পরিবর্তন আসে। এ ছাড়া পুলিশের বড় কোনো কর্মকর্তার পদে রদবদল এলেও বন্দোবস্তের পরিবর্তন হয়। বছরের পর বছর এভাবেই চলছে।

বর্তমানে রাজধানীতে অন্তত পাঁচ লাখ হকার আছেন। ২০১৬ সালের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) গবেষণায় জানা গেছে, দুই সিটি করপোরেশনের ৪৩০ কিলোমিটার রাস্তায় তিন লাখেরও বেশি মানুষ ব্যবসা করেন। বছরে চাঁদাবাজি হয় প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকার। এসব হকার প্রতিদিন ৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে বাধ্য হন। ২০২০ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রত্যেক হকারকে প্রতিদিন গড়ে ১৯২ টাকা চাঁদা গুনতে হয়। রাজনৈতিক নেতাকর্মী, পুলিশ ও প্রভাবশালীদের মধ্যে এই চাঁদা ভাগবাটোয়ারা হয়।
পুরোনো চেহারা
গত সোমবার সরেজমিন দেখা যায়, মিরপুর ১০ নম্বর থেকে কচুক্ষেত যেতে সড়কের দুই পাশের ফুটপাতজুড়ে হকারের সারি। হোপ স্কুলের আশপাশসহ কিছু এলাকায় আগের মতো রাস্তা দখল করে পসরা সাজিয়ে বসেছেন তারা। বৃষ্টি থেকে রক্ষায় কিছু হকারের জিনিসপত্র পলিথিন দিয়ে ফুটপাতের ওপর বেঁধে রাখার দৃশ্যও চোখে পড়ে। হোপ স্কুলের পাশে রাস্তায় গোলাকার ঘূর্ণয়মান আলনা বসিয়ে পোশাক সাজিয়ে বসা বিল্লাল হোসেন বলেন, এখানে যানজট হয় না। রাস্তা অনেক চওড়া। কাজেই রাস্তার একপাশে বসলে সমস্যা হয় না।
মিরপুর ১০ নম্বরে শাহ আলী মার্কেটের সামনের ফুটপাতে মোবাইল অ্যাক্সেসরিজ, ঘড়ি, চশমা নিয়ে বসা দোকানি মাসুদ হোসেন বলেন, যখন অভিযান চালানো হয় তখন তাদের বলা হয়েছিল রাস্তায় যেন কেউ না বসে। এ জন্য তারা রাস্তার ভেতরে যাচ্ছেন না। ফুটপাতে বসছেন।
গুলিস্তান সিনেমা হলের পাশে হকার আব্দুর রশিদ বলেন, না বসে উপায় নেই। সংসার তো চালাতে হবে। আবু আবদুল্লাহ নামের আরেকজন হকার বলেন, তাদের একটি ভালো জায়গা ঠিক করে দিলে এই উচ্ছেদের যন্ত্রণা সহ্য করতে হতো না।
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম সমকালকে বলেন, ‘এভাবে হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। আমি চিন্তা করেছি, হকারসহ সব স্টেকহোল্ডার নিয়ে বড় পরিসরে বৈঠক করব। বিশেষজ্ঞসহ সবার পরামর্শ নিয়ে এর সমাধান বের করব।’
ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘ছয়টি মাঠে হকারদের বসার ব্যবস্থা করার বিষয়ে ভাবছি। সেখানে তারা সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন সময় বসতে পারবে। এ ছাড়া প্রয়োজনে তারা রাত ৮টায় ফুটপাতে বসবে। এ জন্য তাদের রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। তারা নামমাত্র কিছু অর্থ সিটি করপোরেশনকে দেবে।’
- বিষয় :
- হকার
