পল্লবীতে ধর্ষণের পর শিশুহত্যা, আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক আজ
আদালতের বাইরে আসামিদের কথা বলতে বারণ
ছবি-সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৭ | আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় এক দিনেই সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। আজ বুধবার আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থন করে সাফাই সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন রাখা হয়েছে।
ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন গতকাল মঙ্গলবার আলোচিত এই মামলার ১৮ সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষ করেন। এর মধ্য দিয়ে এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হলো। নিহতের বাবা-মা আদালতের কাছে দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন।
এর আগে সোমবার মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। গত ১৯ মে পল্লবীর একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে স্কুলপড়ুয়া শিশুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার দিনই পল্লবী থানায় মামলা করেন শিশুটির বাবা। মামলাটি তদন্ত করে গত ২৪ মে পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ
গতকাল সাক্ষ্য গ্রহণের শুরুতেই শিশুটির বাবা ও মামলার বাদী এবং মা, বড় বোন, ফুফু, ফুফা, চাচা, বাসার চতুর্থ তলার এক বাসিন্দা, এক প্রতিবেশী, দ্বিতীয় তলার এক বাসিন্দার জবানবন্দি রেকর্ড করা
হয়। এ ছাড়া কনস্টেবল রোমা আক্তার, শরীফ মিয়া, এসআই ইকবাল হোসেন, ডাক্তার নাসাদ জাবিন, মহানগর হাকিম আমিনুল ইসলাম জুনাইদ, এসআই রাশেদুল ইসলাম ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. অহিদুজ্জামানের জবানবন্দি রেকর্ড করেন আদালত।
আদালতে বসে কাঁদলেন বাবা-মা
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আদালত বসে। দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের উপস্থিতিতে এদিন শিশুটির বাবা এবং পরে মা সাক্ষ্য দেন। বিকেল সোয়া ৩টায় এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ক্রমে শেষ হয়।
এর আগে সকাল ৯টার দিকে কড়া পুলিশ প্রহরায় আসামিদের কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে এনে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। এরপর সকাল ১০টার পর তাদের আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হয়।
এর পর সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন শিশুর বাবা। তিনি তাঁর সাক্ষ্যে ওই দিনের ঘটনার বিশদ বিবরণ দেন। এক পর্যায়ে আইনজীবী শিশুটির খণ্ডিত মাথার ছবি দেখালে কাঠগড়ায় বসে কেঁদে ফেলেন তিনি। পরে শিশুটির বাবা-মাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কলিমুল্লাহ। এর পর ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে শিশুটির বড় বোনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত। পরে অন্যরা সাক্ষ্য দেন।
জবানবন্দিতে শিশুটির মা যা বললেন
আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামি স্বপ্না আক্তারকে দেখিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত শিশুটির মা বলেন, ‘ওরে কতবার বলি বোন দরজাটা খোলো, কিন্তু সে খোলেনি।’ এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ঘটনাটি ছিল ১৯ তারিখের। ওই দিন তিনি বাসায় রান্না করছিলেন এবং রান্না প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল।
তিনি বলেন, তাঁর দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে সেদিন তার এক চাচার বাসায় যেতে চায়। তখন ছোট মেয়েও তার সঙ্গে যেতে চাইলে মা হিসেবে তিনি তাকে বারণ করেন। পরে দেখেন ওরা দুজনেই যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এক পর্যায়ে বড় মেয়ে ছোট মেয়েকে সঙ্গে না নিয়েই চলে যায়।
শিশুটির মা বলেন, এর কিছুক্ষণ পর তিনি পাশের ফ্ল্যাট থেকে একটি বাচ্চার চিৎকারের শব্দ পান। তবে পাশের বাসায় কারা থাকে তা তিনি জানতেন না। এর ৩-৪ মিনিট পর বড় মেয়ে বাসায় একা ফিরে আসে। মেয়েকে একা দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি একা কেন? ছোটটা কোথায়?’ বড় মেয়ে জবাবে বলে, ‘সে তো চাচার বাসায় যায়নি।’ এর পর তারা তাকে খুঁজতে থাকেন। এরপর দোতলার ব্যাচেলর বাসায় খোঁজ নেন, সেখানেও পাননি। তিনতলার ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দিলে ভেতর থেকে কেউ দরজা খুলছিল না। ঠিক তখনই তিনি দরজার বাইরে একটি জুতা দেখতে পান। আশপাশে অনেক চিৎকার শুনে তাঁর সন্দেহ হয় যে, তাঁর সন্তানকে হয়তো এখানেই আটকে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এরপর দরজায় অনেক ধাক্কাধাক্কি করলেও ভেতর থেকে দরজা না খোলায় তারা তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। ভেতরে ঢোকামাত্র পেছন থেকে একজন চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘হায় রে, কী রক্ত!’ তখন তিনি (শিশুটির মা) বলেন, ‘আমার মেয়ে আর নেই!’ তখন রাজু নামে একজন পুরো ঘটনার ভিডিও করছিল। ভেতরে গিয়ে তারা দেখেন, বাচ্চাটার কাটা মাথা এক জায়গায় এবং দেহ আরেক জায়গায় খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তারা ফ্ল্যাটের ভেতরে তখন স্বপ্নাকে হাঁটাহাঁটি করতে দেখেন।
আদালতকে শিশুটির মা বলেন, ‘তারে বলি বোন দরজাটা খোলো, কিন্তু খোলেনি। পরে তিনি শুনতে পারেন যে, একজন গ্রিল কেটে পালিয়ে গেছে। এরপর পুলিশ এসে শিশুটির জামাকাপড়সহ যাবতীয় আলামত জব্দ করে। এ পর্যায়ে তিনি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন।
এর আগে প্রথমে মামলার বাদী ও শিশুটির বাবার সাক্ষ্য নেওয়া হয়।
আদালতের বাইরে আসামিদের কথা বলতে বারণ
এদিন প্রথমে বক্তব্য শুরু করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তিনি শুরুতে আসামি সোহেলের গণমাধ্যমে এলোমেলো কথা বলার বিষয় তুলে ধরেন। তিনি আদালতের কাছে আবেদন জানান, আসামিরা যাতে যাতায়াতের সময় গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ না পান। রাষ্ট্রপক্ষের এই কৌঁসুলি আদালতকে বলেন, আইন অনুযায়ী বিচারকের সামনে ছাড়া পুলিশ হেফাজতে থাকাবস্থায় কথা বলার এখতিয়ার আসামির নেই। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। পুলিশি হেফাজতে থাকা বা দণ্ডিত আসামিদের বক্তব্য মিডিয়ায় প্রচার করা দেশের সর্বোচ্চ আদালত ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিয়মানুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বক্তব্যে শুনে আদালতের বাইরে পুলিশ হেফাজতে থাকাবস্থায় আসামির কথা বলা ও তা প্রচার না করতে নির্দেশনা দেন বিচারক। পাশাপাশি পুলিশের সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
‘ধর্ষণ এবং হত্যা– সবকিছুই প্রমাণিত’
সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে এ মামলার রাষ্ট্র নিযুক্ত বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ‘আসামির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ সাক্ষীদের মাধ্যমে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ শাস্তির জন্যই যুক্তিতর্ক করব।’ তিনি বলেন, যিনি পোস্টমর্টেম করেছেন, তিনি আজ (গতকাল) উন্মুক্ত ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যে বলেছেন, এটা জোরপূর্বক ধর্ষণ ছিল। এখান থেকে বোঝা যায়, শিশুটিকে আগে ধর্ষণ এবং পরে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং ধর্ষণ এবং হত্যা সবকিছুই প্রমাণিত হয়েছে। আইনজীবী দুলু আরও বলেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের পরেই যুক্তিতর্ক শুনানি হবে। এর পর মামলার রায় ঘোষণা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, এক দিনে একটি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্ত হওয়ায় এটি একটি নজির সৃষ্টি হলো। রোমহর্ষক ও বীভৎস এই ঘটনার দ্রুত বিচার হওয়ার নজিরও স্থাপিত হবে।
