একজন মা
এই বাড়ির চতুর্থ তলায় পড়ে ছিল বৃদ্ধার গলিত মরদেহ -সমকাল
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৮:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাইরে থেকে ছিমছাম, পরিপাটি ভবনটির চারতলার ফ্ল্যাটের ভেতরের চিত্র একেবারেই আলাদা। প্রতিটি ঘর আবর্জনায় পরিপূর্ণ, যেন এক ভাগাড়। এর মধ্যেই একটি খাটে পড়ে ছিল ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মরদেহ। কয়েক দিন আগে মৃত্যু হওয়ায় পচে পোকা কিলবিল করছিল বিছানায়। গত রোববার রাতে খবর পেয়ে রাজধানীর মিরপুরের ওই ফ্ল্যাট থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ ও প্রতিবেশীরা বলছেন, নূরজাহান বেগমের চার ছেলেমেয়েই উচ্চশিক্ষিত। তিন ছেলের একজন বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের যুগ্ম সচিব, একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, অপরজন কানাডাপ্রবাসী। একমাত্র মেয়ে মিরপুরের একটি স্কুলের শিক্ষক। এমন প্রতিষ্ঠিত সন্তানরা থাকতে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে ছিলেন তাদের গর্ভধারিণী মা। এমনকি তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি বুঝতেও তাদের কয়েক দিন সময় লেগেছে। মেয়ের দাবি, তিনি মায়ের সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। তাহলে একই ফ্ল্যাটে থেকেও কেন নিয়মিত মায়ের খবর নেননি, বুঝতে পারেননি মমতাময়ী মা আর নেই– এমন প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিবেশীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
এদিকে, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকে বলছেন, সন্তানরা কীভাবে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন হতে পারেন! নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ছেলেমেয়ে থাকতে বৃদ্ধার এমন নিঃসঙ্গ মৃত্যু সত্যিই বিস্ময়কর।
মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের সি-ব্লকে ১৩ নম্বর সড়কের ৮ নম্বর বাসার চতুর্থ তলায় নিজের ফ্ল্যাটে থাকেন নূরজাহানের একমাত্র মেয়ে। গতকাল মঙ্গলবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচতলা ভবনের মূল ফটক তালাবদ্ধ। ডাকাডাকি করেও সাড়া মেলেনি কারও। পরে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবন মালিকের তিন ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি মারা গেছেন। তাঁর স্ত্রী (নূরজাহান বেগমের মেয়ে) একা থাকতেন চতুর্থ তলায়। তাঁর মাকে দেখাশোনা করার কেউ ছিলেন না। তাই বছরখানেক আগে তিনি মাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে আসেন। এখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
পাশের ১০ নম্বর ভবনের বাসিন্দা সেলিনা ইসলাম সমকালকে বলেন, অনেক বছর এই বাসায় আছি। কিন্তু কখনোই তাঁর (মৃতের মেয়ের) সঙ্গে কথা হয়নি। তিনি কারও সঙ্গে সেভাবে মিশতেন না। বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হওয়ার মতো ঘটনা। একই ফ্ল্যাটে থেকেও তিনি মায়ের যত্ন নেননি, মৃত্যুর কথাও জেনেছেন অনেক দেরিতে। এটা খুবই দুঃখজনক। এমন মৃত্যু যেন কারও না হয়।
আরেক প্রতিবেশী ৭ নম্বর ভবনের ভাড়াটে তৌফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, বৃদ্ধার মেয়ের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। তবে লোকজনের সঙ্গে তাঁর আচরণ দেখে স্বাভাবিক মনে হয়নি। সে যাই হোক, নিজের মাকে কেউ এমন অবস্থায় ফেলে রাখতে পারে– ভেবে শিউরে উঠছি। আগে তো বিস্তারিত জানতাম না, পরে জানলাম বৃদ্ধার চার ছেলেমেয়েই প্রতিষ্ঠিত। সেই মায়ের যদি এমন পরিণতি হয়, তাহলে তো দুনিয়ায় মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের আর কোনো মূল্য থাকল না। যে মা সন্তানকে বড় করে তুলতে নিজেকে নিঃশেষ করে দেন, এই তার প্রতিদান!
যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা সাংবাদিক মারুফ হায়দার বলেন, পাশেই ডি-ব্লকে আমার বাসা। আমার প্রতিবেশী ভাবি শিরিন আক্তার প্রথমে আমাকে ঘটনার বিষয়ে জানান। তিনি মৃতদেহের গোসল করানোর কাজ করেন। গত রোববার রাতে তাঁকে ডেকে নিয়েছিলেন নূরজাহান বেগমের মেয়ে। আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারি, মায়ের অসুস্থতার কথা বলে একজন নার্স নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে যান তিনি। তবে নার্স পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন, কয়েক দিন আগেই বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। মরদেহ ততক্ষণে পচতে শুরু করেছে। নার্স বাসা থেকে বেরিয়ে বিষয়টি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল করে জানান। পুলিশ আসার আগেই মরদেহ দাফনের উদ্যোগ নেন মেয়ে। তখন মৃতের গোসল করানোর জন্য শিরিন ভাবিকে ডাকা হয়। তিনিও গিয়ে গলিত মরদেহ দেখে ভড়কে যান। তারা যখন মরদেহ খাট থেকে নামাচ্ছিলেন, তখন মাংস খসে পড়ছিল। আর কিলবিল করছিল এক ধরনের পোকা।
মারুফ বলেন, আমি কয়েকজনকে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখি, সেখানে মানুষ বসবাসের মতো কোনো পরিবেশ নেই। প্রতিটি ঘরের মেঝে, এমনকি খাটেও আবর্জনার স্তূপ। বৃদ্ধার মেয়ে ওই বাসায় থাকেন বলে দাবি করেছেন, কিন্তু তেমন কোনো আলামত আমার চোখে পড়েনি। লোকজনের কাছ থেকে জেনেছি, তিনি পাশেই কোথাও থাকেন। মাঝেমধ্যে গিয়ে মাকে দেখে আসতেন। রোববারও তেমনি গিয়ে মায়ের মরদেহ দেখে অসুস্থ ভেবেছিলেন। কিন্তু নার্স মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মারুফ হায়দার অভিযোগ করেন, মরদেহের ময়নাতদন্তসহ আইনি ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করায় নূরজাহানের মেয়ে ও বুয়েটের শিক্ষক ছেলে রেগে যান। তারা প্রথমে অনুরোধ জানান এ নিয়ে কোনো ‘ঝামেলা’ না করতে। পরে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে চুপ থাকতে বলেন। তাতেও কাজ না হওয়ায় শিক্ষক ছেলে ও তাঁর দুই সন্তান সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। এ ঘটনায় তারা পল্লবী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
ব্যাখ্যা মেলেনি স্বজনের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঘটনাস্থল বাড়িটিতে গিয়ে নূরজাহানের সন্তানদের কাউকে পাওয়া যায়নি। মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন তাঁর মেয়ে। সেখানে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনার পরপরই সাংবাদিকরা এ বিষয়ে তাঁকে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন। সেই সময়ের ভিডিওতে দেখা যায়, কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছেন তিনি। বৃদ্ধার বড় ছেলের (মোংলা বন্দরের যুগ্ম সচিব) মোবাইল ফোন নম্বরে বারবার কল করা হলেও রিসিভ করেননি। আর বুয়েট শিক্ষক ছেলে ও প্রবাসী ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ যা বলছে
পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির বলেন, নূরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত হয়েছে মরদেহের। পরে স্বজনরা মরদেহ গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মতলবে নিয়ে দাফন করেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। তাঁর মৃত্যুতে কারও দায় থাকলে অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক প্রশ্নের উত্তরে ওসি বলেন, মৃতের সন্তানদের সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশ। দেশে থাকা দুই ছেলে দাবি করেছেন, তারা মায়ের খোঁজ রাখতেন। তাদের পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি ছিল না। আর মেয়ের ভাষ্য, তিনি ওই ফ্ল্যাটেই থাকতেন, মায়ের দেখাশোনাও করতেন। কিন্তু নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখলে মরদেহের ওই অবস্থা হওয়ার কথা নয়। ফ্ল্যাটের ভেতরে যে নোংরা পরিবেশ, তাতে মেয়ের মানসিক সুস্থতা নিয়েও সংশয় রয়েছে। তবে তদন্ত ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
