ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

রাজধানীতে দুর্ভোগ

কখনও জলাবদ্ধ হয়নি এমন এলাকায় থইথই পানি

পানি সরে যাওয়ার পর রাজপথে বেরিয়ে আসছে বড় বড় গর্ত

কখনও জলাবদ্ধ হয়নি এমন এলাকায় থইথই পানি
×

বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে গতকাল সোমবারও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সকাল থেকে ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে। বনানীতে মূল সড়কের দুই পাশে হাঁটুপানি জমে যায় -মামুনুর রশিদ

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৭ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীতে অতিভারী বর্ষণেও অতীতে জলাবদ্ধতা হয়নি, এমন কিছু এলাকায় এবার নৌকা চলার মতো অবস্থা দেখা গেছে। গত শনি ও রোববারের বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া কিছু এলাকায় গতকাল সোমবারও ছিল থইথই পানি। নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এসব স্থানের লোকজনকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

বিমানবন্দর সড়কে বনানীর যে স্থানে এক্সপ্রেসওয়ের র‍্যাম্প নেমেছে, সেখানে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সেনা সহায়তায় গতকাল পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়। শুধু এই স্থান নয়; বেশ কয়েকটি এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক তলিয়ে যায়। গুলশান-বাড্ডা লিংক রোডের বিভাজক ভেসে যায় পানির তোড়ে। বুয়েট ক্যাম্পাসে আগে কখনও পানি উঠতে দেখা না গেলেও এবার ছিল ব্যতিক্রম। এ ছাড়া নামাপাড়া, কারওয়ান বাজারের প্রধান সড়কও এবার পানিতে তলিয়ে যায়। 

গত শনি-রোববারের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল ২০০৯ সালের ৭ জুলাই। ওই দিন ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৩৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে আবহাওয়া অফিস। গত শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৭৪ মিলিমিটার। 

এবার কম বৃষ্টিতেও নতুন নতুন স্থান তলিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুসলেহ উদ্দিন হাসান সমকালকে বলেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়াই কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। পাশাপাশি লেক-জলাধার ও নিচু জমি ভরাট করা হয়েছে। পানি লেক বা খাল দিয়ে নদীতে চলে যাওয়ার পথগুলো রুদ্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টি যেখানে পড়ছে, সেখান থেকে পানি সরতে পারছে না। ফলে ভারী বৃষ্টিপাত হলেই তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা এবং নতুন নতুন জলাবদ্ধতার স্থান। 

রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থার লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত বিমানবন্দর সড়ক। এই সড়কে অতি বৃষ্টি হলে আগেও কিছু পানি জমেছে। কিন্তু এবার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এক্সপ্রেসওয়ে থেকে বনানীর র‍্যাম্পে গাড়িগুলো নামার পরই অনেকাংশ তলিয়ে গেছে। কিছু গাড়ি পানি ঠেলে চলে গেলেও ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যাওয়ায় অনেক প্রাইভেটকার বিকল হয়ে পড়ে। পরে ঠেলে সেগুলোকে সরাতে হয়। এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ওই পয়েন্টে গাড়িগুলো নামার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বিমানবন্দর সড়কে এমন ‘লেক’ তৈরির কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহসভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান সমকালকে বলেন, ওই এলাকার পানি আগে বনানী লেকে চলে যেত। 

এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির পর ওখানে রাস্তা অনেক প্রশস্ত হয়েছে। কিন্তু ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়নি। ওই স্থানের পশ্চিম পাশে উঁচু রেললাইন। পূর্ব পাড়ে উঁচু ফুটপাত। মাঝখানের স্থানটি নিচু। এ ছাড়া র‍্যাম্প দিয়ে এক্সপ্রেসওয়ের পানি ঢলের মতো এসে ওখানে পড়েছে। ওই স্থানটা আশপাশের চেয়ে নিচু হওয়ায় পানি কোথাও সরতে পারেনি। এ কারণে অবস্থা ভয়াবহ। বৃষ্টিপাতও হয়েছে অনেক বেশি।

এদিকে গুলশান লেকের পাড়েই গড়ে ওঠা কড়াইল বস্তি আগে এত বেশি জলাবদ্ধ হয়নি। ওই এলাকায় বৃষ্টি হলে দ্রুতই পানি লেকে চলে যেত। এবার লেক এতটাই টইটম্বুর হয়ে পড়ে; বস্তির ভেতরে জমা পানির সঙ্গে লেকের ময়লাযুক্ত পানি মিশে যায়। পুরো বস্তি যেন এবার পানির ওপর ভেসেছে।  

অতীতে কারওয়ান বাজার এলাকায় পানি জমলে ড্রেন দিয়ে পাশের হাতিরঝিলে চলে যেত। কিন্তু বছরখানেক আগে কারওয়ান বাজারের ওয়াসা ভবনের সামনে সড়ক বিভাজক তুলে দিয়ে ওয়াসা ভবনের পাশের সড়কটি প্রশস্ত করা হয়। তখন সার্ভিস রোডকে মূল সড়কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সার্ভিস রোড ও প্রধান সড়কের মাঝে থাকা ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর করে ফেলা হয়। এখন সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই ওই এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।   

কেন এবার অবস্থার এত অবনতি হলো– জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম শহীদ উদ্দিন সমকালকে বলেন, রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার একটা দুর্বলতা তো রয়েছেই। এ ছাড়া বিদ্যমান যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, তা সত্তর-আশির দশকে তৈরি। কিছু জায়গায় নতুন ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি হলেও একটির সঙ্গে আরেকটির সংযোগ থাকায় সেটা খুব কাজে আসেনি। পুরো রাজধানীকে একটি আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার মধ্যে আনা সম্ভব হলে এ রকম অবস্থা হতো না। 

সড়ক ভেঙে যাওয়ায় দুর্ভোগ
সাম্প্রতিক সময়ে অতিভারী বর্ষণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কের ক্ষতি হয়েছে। অনেক স্থানে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। ধোলাইখালে একটি সড়কের পুরোটাই ভেঙে গেছে। গুলশান-বাড্ডা লিংক রোডেও ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া পানি সরে যাওয়ার পর যত্রতত্র দেখা যাচ্ছে বড় বড় গর্ত। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। অলিগলির অবস্থা খুবই খারাপ। রাস্তার গর্তগুলো আপাতত ইট-সুরকি দিয়ে যান চলাচলের উপযোগী রাখার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। সরেজমিন দেখা যায়, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সড়কের মিন্টো রোড-সংলগ্ন এলাকায় কিছু দিন আগে করা সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে।

কাকরাইল মসজিদ থেকে ফকিরাপুল-আরামবাগ হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত সড়ক খানাখন্দে ভরা। একই অবস্থা স্বামীবাগ ও দয়াগঞ্জ এলাকায়। যাত্রাবাড়ী থেকে খিলগাঁও ফ্লাইওভার পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়কে একই অবস্থা। এসব সড়কে চলাচল করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে যানবাহনগুলোকে। ইতোমধ্যে ধোলাইখাল সড়ককে চলাচল উপযোগী করার জন্য ডিএসসিসির মেরামত কাজ শুরু করেছে। কিন্তু অন্যগুলোতে কার্যক্রম শুরুই হয়নি। এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এক প্রকৌশলী সমকালকে বলেন, আপাতত সেগুলোকে বালু-সুরকি দিয়ে সমান করে দেওয়া হবে। কারণ বৃষ্টির কারণে কার্পেটিং করা সম্ভব নয়। এগুলো আঞ্চলিক অফিস থেকে মেরামত করে দেবে রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে। বর্ষা মৌসুম শেষে কাজ শুরু হবে। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজ সমকালকে বলেন, আমাদের বাজেটের কিছু স্বল্পতা আছে। এ জন্য দ্রুতই ভালো কিছু করা সম্ভব হবে না। কিন্তু ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত ধারণক্ষমতা। যেখানে ২০ জন মানুষ বসবাস করা স্বাভাবিক, সেখানে বাস করছে ২০০ জন। আমাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থারও দুর্বলতা আছে। এ রকম হলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একসময় শনির আখড়া-ডেমরা এলাকায় অনেক নিচু জলাশয় ছিল। সেগুলো ভরাট করে ঘরবাড়ি উঠছে। পানি নামার জায়গা নেই। এতে রাস্তায় পানি জমছে। রাস্তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

অনেক এলাকা গতকালও ছিল জলাবদ্ধ
গতকালও রাজধানীর অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। কিছু এলাকার প্রধান সড়ক থেকে পানি সরে গেলেও অলিগলিতে পানি রয়েছে। গতকাল দিনের প্রথম ভাগে কিছু সময় ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। মিরপুরের কালশী এলাকায় ছিল হাঁটুপানি। আরামবাগ এলাকার পানিও পুরোটা নামেনি। কাজীপাড়া-সেনপাড়ার প্রধান সড়ক থেকে পানি সরে গেলেও গলিতে পানি রয়ে গেছে। পলাশীর এসএম হলের সামনের পানি গতকালও সরেনি। নিউমার্কেট এলাকায় কিছু পানি রয়েছে। এ ছাড়া নন্দীপাড়া ও রাজধানীর পূর্বাঞ্চল, নামাপাড়া ও ভাটারা-বাড্ডা, গ্রিন রোডে পানি জমেছিল।

জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে সড়ক অবরোধ
রাজধানীর পল্লবীর বিহারি কলোনিতে জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন স্থানীয়রা। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কয়েকশ মানুষ জড়ো হয়ে কালশী মোড় অবরোধ করেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।


 

আরও পড়ুন

×