ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

সরেজমিন খিলগাঁও-গোড়ান-সিপাহীবাগ

ঘরভর্তি পানি, ৫ দিন ধরে চৌকিতে কাটছে জীবন

রান্নাঘর ও শৌচাগারে ঢুকেছে পানি

ঘরভর্তি পানি, ৫ দিন ধরে চৌকিতে কাটছে জীবন
×

খিলগাঁওয়ের উত্তর গোড়ানের ঝিলপাড় এলাকায় পাঁচ দিন পানিবন্দি হোসাইনের পরিবার সমকাল

বকুল আহমেদ

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

টিনশেড ঘরজুড়ে থইথই পানি। এর মধ্যে মশার কামড় এড়াতে গতকাল সোমবার মধ্যদুপুরে সেই ঘরে চৌকির ওপর বসেছিল ছোট্ট শিশু মো. হোসাইন। পাঁচ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় কাটছে ওর। হোসাইনের মতো পানিবন্দি রয়েছে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের উত্তর গোড়ানের নবীনবাগের মাদানী ঝিলপাড়ের আরও অন্তত ৫০ ঘরের বাসিন্দা। ঝিলপাড়ে বাস করা নিম্ন আয়ের কারও কারও রান্নাঘর ভেসে গেছে পানিতে। বৃষ্টিতে কারও চুলা জ্বলছে না পাঁচ দিন ধরে। জানা গেল, টিনশেড ও একতলা বাড়ির শৌচাগারেও পানি ঢুকেছে। 

উত্তর গোড়ানের নবীনবাগে মাদানী ঝিলপাড়ে ৪০৩/১/এ হোল্ডিংয়ের হোসাইনদের টিনশেড বাড়ির চিত্র এমনই দেখা গেল গতকাল সোমবার। চার সদস্যের পরিবারে বাবা মো. রুবেল রিকশাচালক। তার মা ঊর্মি বেগম অন্যের বাসায় কাজ করেন। ঊর্মির দুই সন্তানের একজন হোসাইন, আরেকজন চার বছরের আয়ান। গতকাল দুপুরে হোসাইনের পাশের ঘরে দাদির সঙ্গে ছিল আয়ান। সেই ঘরও পানিতে সয়লাব।  
সরেজমিন দেখা গেল, টানা ও ভারী বর্ষণে খিলগাঁওয়ের উত্তর গোড়ান, লালমার্কেট এলাকা, নবীনবাগ, পূর্ব গোড়ানের ৮ ও ৯ নম্বর সড়ক, নবাবী মোড়, নুরবাগ পানিরপাম্প, দক্ষিণ গোড়ান, সিপাহীবাগ এবং পূর্ব রামপুরার তিতাস রোডসহ আশপাশের নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা।

এলাকাবাসী জানায়, পাঁচ-ছয় দিন ধরেই সড়ক থেকে শুরু করে মহল্লার অলিগলি পানির নিচে। দোকান ও ভবনের গ্যারেজে পানি ঢুকে পড়েছে। পানি কোথাও কোমর ছুঁয়েছে। তাতে দৈনন্দিন চলাচল, কর্মস্থলে যাতায়াত এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। রাস্তা পানির নিচে চলে যাওয়ায় ড্রেন উপচে ময়লার পানি সড়কে ছড়িয়ে গেছে। পানির নিচে ম্যানহোল ঢাকা পড়ায় আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে পথচারী ও রিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকদের।
এদিন দুপুর দেড়টায় হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে গৃহবধূ ঊর্মি বেগম জানালেন, ময়লা পানিতেই বাস করতে হচ্ছে তাদের। ঘরের চৌকিও পানির নিচে চলে গিয়েছিল। পরে নিচে ইট দিয়ে চৌকি উঁচু করা হয়েছে। তাতে দুই শিশু সন্তান, স্বামী ও তিনি থাকেন। 

তিনি বলেন, ‘চৌকি নড়াচড়া করে। ঘুমাতে যাওয়ার সময় খুব ভয় লাগে। একদিকে দুর্গন্ধ পানি, আরেকদিকে মশার উপদ্রব। সারাদিনই মশারি টানিয়ে দুই ছেলেকে ভেতরে বসিয়ে রাখি। বাসায় রান্না করার অবস্থা নেই। আমার স্বামী রিকশা চালাতে বের হয় সকালে। রাতে খাবার কিনে নিয়ে বাসায় ফেরে।’ ঊর্মি নিজের পায়ের পাতা দেখিয়ে বলেন, ‘সারাদিন পানিতে থাকতে হয়। এই কদিনে পায়ে ঘাঁ হয়ে গেছে।’ বৃদ্ধা আলো বেগম জানালেন, তাঁর পায়েও ঘা হয়েছে পানির কারণে। পানিবন্দি ঘরে থাকতে থাকতে ঠান্ডা-জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। 
দুপুর ২টার দিকে মাদানী ঝিলপাড়ের একটি টিনশেডের বাইরে এক বৃদ্ধকে পানিতে দাঁড়িয়ে ভেজা পোশাক মেলতে দেখা গেল। ৭০ বছর বয়সী আব্দুল জলিল একসময় রংমিস্ত্রির কাজ করতেন। এখন অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারেন না। তিন হাজার টাকা ঘরভাড়ায় পরিবার নিয়ে থাকেন জানিয়ে তিনি বলেন,  ‘পাঁচ-ছয় দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে আছি। পানিতে ময়লা ভাসছে। ময়লা পানি দিয়েই গোসল করলাম। কাপড় ময়লা পানি দিয়ে ধুয়ে শুকাতে দিচ্ছি।’

পূর্ব রামপুরা মোল্লা বাড়ির তিতাস রোডে কোথাও হাঁটুর নিচে, কোথাও হাঁটুর ওপরে পানি। পাশের শান্তিগলিতে বহুতল ভবনের পাশাপাশি আছে টিনশেড বস্তিও। দুপুর পৌনে ১টায় সেখানে গিয়ে জানা গেল, চার দিন আগে ঘরে পানি ঢুকেছে। রোজিনা আক্তার বললেন, টিউবওয়েল প্রায় ডুবে গেছে। এ কারণে মসজিদ থেকে খাবার পানি নিয়ে আসি।’ আরেক বাসিন্দা শেফালী বেগম বলেন,  ‘খুব কষ্ট করে থাকতে হচ্ছে।’ 
সিপাহীবাগে সরেজমিন দেখা গেল– সড়কের কোথাও মোটরসাইকেলের বেশির ভাগ অংশ পানির নিচে চলে যায়, আবার কোথাও চাকা ডুবছে। দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে ওই সড়কে এক ব্যক্তিকে মোটরসাইকেল ঠেলে আনতে দেখা গেল। তিনি জানালেন, ‘পানিতে মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে। আশপাশে মেরামত করার মতো গ্যারেজও নেই। বাধ্য হয়েই ঠেলতে হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

×