পুরান ঢাকার ‘বুড্ডান সাহেব’ আর নেই
সৈয়দ তাকি মোহাম্মদ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১:০৬
পুরান ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত ভাণ্ডার ছিলেন কবি, সমাজসেবক ও সংগঠক সৈয়দ তাকি মোহাম্মদ। ‘বুড্ডান সাহেব’ নামে পরিচিত উর্দু সাহিত্যের এই কবি ও মুঘল অভিজাত পরিবারের উত্তরসূরি মারা গেছেন। গতকাল শুক্রবার রাত ৮টার দিকে পুরান ঢাকার সাত রওজা মহল্লায় নিজের বাসভবনে তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।
শনিবার বাদ জোহর পুরান ঢাকার হোসেনী দালান ইমামবাড়ায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সাত রওজার পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
১৯৫০ সালের ১৪ জানুয়ারি সাত রওজা মহল্লায় মুঘল অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ তাকি মোহাম্মদ। তার বাবা নবাব সৈয়দ আলী মোহাম্মদ (ছোট্টন) ছিলেন ঢাকার বিশিষ্ট জমিদার। পারিবারিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করার পাশাপাশি সৈয়দ তাকি মোহাম্মদ নিজেও সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।
বিভিন্ন সময়ে তিনি হোসেনী দালান ইমামবাড়ার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য এবং জাতীয় ওয়াকফ কমিটির পরিচালনা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি।
পুরান ঢাকায় মুঘল আমলে প্রতিষ্ঠিত মোহাম্মদী বেগ ইমামবাড়া ওয়াকফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লির দায়িত্বও আমৃত্যু পালন করেছেন সৈয়দ তাকি মোহাম্মদ।
ইতিহাসের সাক্ষী সাত রওজার বাড়ি
সাত রওজায় সৈয়দ তাকি মোহাম্মদের পারিবারিক বাসভবনটিও পুরান ঢাকার ইতিহাস ও স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত ছিল। মুঘল আমল থেকে তার বংশধরেরা সেখানে বসবাস করে আসছেন।
বাড়ির বিস্তৃত চত্বরে মুঘল, কোম্পানি ও ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন স্থাপনার নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে মুঘল আমলের একটি ভবনের ভিত্তি ও দেয়ালের কিছু অংশ এখনো টিকে আছে।
প্রত্নতত্ত্ববিদ, স্থপতি ও ইতিহাসবিদদের কাছেও বাড়িটি ছিল আগ্রহের জায়গা। প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, স্থপতি অধ্যাপক আবু সাঈদ এম আহমদসহ বিভিন্ন গবেষক ও পণ্ডিত বিভিন্ন সময়ে তার বাসভবন পরিদর্শন করেছেন।
সৈয়দ তাকি মোহাম্মদের ব্যক্তিগত সংগ্রহেও সংরক্ষিত ছিল ঢাকার অতীতের নানা নিদর্শন। তার সংগ্রহে গত চার শতকের তৈজসপত্র, নথিপত্র, শিল্পকর্মসহ বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন ছিল। রাজধানী ঢাকার ৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি আয়োজিত প্রদর্শনীতে তার সংগ্রহের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নিদর্শন প্রদর্শিত হয়েছিল।
ফারসি থেকে উর্দু
মুঘল আমল থেকে বিশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত সৈয়দ তাকি মোহাম্মাদের পরিবারের ভাষা ছিল ফারসি। পরে ধীরে ধীরে সেই জায়গা নেয় উর্দু। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান আন্দোলন জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার অভিজাত পরিবারগুলোতে উর্দুর ব্যবহার বাড়তে থাকে।
তাদের পরিবারের প্রথম দিকের কয়েকটি প্রজন্ম ফারসি ও উর্দু-দুই ভাষাতেই কথা বলত। তবে পঞ্চাশের দশকে ঢাকার মুঘল অভিজাত পরিবারগুলোতে ফারসির ব্যবহার প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
উর্দু সাহিত্যের কবি হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইমামবাড়া ও ধর্মীয়-সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তার ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা। হোসেনী দালান ইমামবাড়ার ব্যবস্থাপনা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ভক্তদের কাছে তিনি পাক পাঞ্জাতনের নিষ্ঠাবান সেবক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
সৈয়দ তাকি মোহাম্মাদের মৃত্যুতে পুরান ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একটি প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ একজন প্রতিনিধি হারালেন বলে মনে করছেন তার পরিচিতজনেরা।
- বিষয় :
- পুরান ঢাকা
- মারা গেছেন