পল্লবীর সেই বস্তাবন্দি ব্যক্তি নিজেই সাজিয়েছিলেন অপহরণের নাটক: পুলিশ
সংবাদ সম্মেলনে মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার।
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:৪০ | আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:৪০
রাজধানীর পল্লবীতে সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় একজনকে টেনে নেওয়ার একটি সিসিটিভি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। ভিডিওটি দেখে অপহরণের ঘটনা বলে ধারণা করা হলেও তদন্তে এর সত্যতা পায়নি পুলিশ। পুলিশের দাবি, পারিবারিক ও আর্থিক সংকট থেকে দূরে থাকতে ওই ব্যক্তি নিজেই আত্মগোপনের পরিকল্পনা করেন এবং সহযোগীর সহায়তায় অপহরণের নাটক সাজান।
নিরাপত্তাকর্মী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম (৫০) ও তার সহযোগী হাসান তারেক ওরফে রিপনকে (২৬) ঘিরে তদন্ত করে পুলিশ এসব তথ্য জানতে পারে। সোমবার চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী থেকে নজরুলকে উদ্ধার করা হয়। একই দিন ঢাকায় গ্রেপ্তার করা হয় রিপনকে। সন্ধ্যায় নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার।
পুলিশ জানায়, নজরুল টাঙ্গাইলের মধুপুর থানার বেকার কোনা গ্রামের শুকুর আলীর ছেলে। তিনি পল্লবীর এভিনিউ-২, ব্লক-এ এলাকায় ‘দ্যা স্যালভেশন আর্মির’ যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ ক্লিনিকে প্রায় ১৬–১৭ বছর ধরে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তার মাসিক বেতন প্রায় ১৭ হাজার টাকা। এর পাশাপাশি মেসে থাকা লোকজনের রান্নার কাজও করতেন তিনি।
বস্তায় ঢুকে অটোরিকশায়, এরপর চট্টগ্রাম
পুলিশ জানায়, গত ১০ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে নজরুল নাইট গার্ডের দায়িত্বে যোগ দেন। পরদিন তাকে কর্মস্থলে না পাওয়ায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে। পরে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়, ১১ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪৭ মিনিটের দিকে এক ব্যক্তি সাদা বস্তায় করে নজরুলকে মেইন গেটের সামনে নিয়ে আসছেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর, ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটের দিকে নজরুল নিজেই বস্তা থেকে বের হয়ে গেটের সামনে বসেন। পরে ওই ব্যক্তির সঙ্গে রিকশায় করে সেখান থেকে চলে যান। ভিডিওতে কোনো জোরজবরদস্তির দৃশ্য দেখা যায়নি।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সময় নজরুলকে ‘আর্মি হাসপাতালের প্রকল্প ব্যবস্থাপক’ বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তদন্তে নামে পুলিশ।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, নজরুলের দুই স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। দুই পরিবারই টাঙ্গাইলে থাকে। ১৭ হাজার টাকা বেতন থেকে তিনি দুই পরিবারকে মাসে প্রায় ৩ হাজার টাকা করে মোট ৬ হাজার টাকা দিতেন। বাকি টাকা থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেন।
পুলিশের ভাষ্য, বিভিন্ন ঋণ ও সুদের টাকা মিলিয়ে নজরুলের প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা দেনা রয়েছে। ছেলের বিয়ে এবং বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে তিনি এসব ঋণ নিয়েছিলেন। দুই পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের বিয়ে এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ তার আর্থিক সংকট আরও বাড়িয়ে দেয়।
আত্মহত্যার চিন্তা থেকে আত্মগোপনের পরিকল্পনা
পুলিশ জানায়, সম্প্রতি পারিবারিক বিষয় নিয়ে প্রথম স্ত্রী রোকেয়া বেগমের সঙ্গে নজরুলের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তিনি আত্মহত্যার কথা বলেছিলেন বলে পুলিশকে জানান তার স্ত্রী।
পরে আত্মহত্যার চিন্তা বাদ দিয়ে পরিবার ও আর্থিক সংকট থেকে দূরে থাকতে আত্মগোপনের সিদ্ধান্ত নেন নজরুল। এ কাজে চাচাতো ভাইয়ের ছেলে রিপনের সহযোগিতা নেন তিনি।
ঘটনার দিন ভোরে রিপন বস্তায় করে নজরুলের কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে গার্ড রুমে ঢোকেন। পরে নজরুল নিজেই ওই বস্তায় ঢোকেন। এরপর অটোরিকশায় করে গাবতলী যান। সেখান থেকে বাসে চট্টগ্রামে গিয়ে পরিচিত রাসেলের বাসায় ওঠেন। পরে ‘সি হার্ট-২’ নামের একটি মাছ ধরার জাহাজে বাবুর্চির কাজ নেন।
সোমবার চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী থেকে তাকে উদ্ধার করে পুলিশ।
‘প্রকৃত অপহরণ নয়’
ডিসি মোস্তাক সরকার বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নজরুলের ঘটনাটি প্রকৃত অপহরণ নয় বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। এটি পূর্বপরিকল্পিত আত্মগোপন ও কথিত অপহরণ নাটক। নজরুল ইসলাম নিজেই সাজিয়েছিলেন অপহরণের নাটক।
তবে এর সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো চলছে। এ ধরনের নিখোঁজ বা কথিত অপহরণের ঘটনা ঘটলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পাশাপাশি যাচাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য প্রচার না করতে সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে।