ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধে সন্তানহারা মা এবার বাড়িও হারাচ্ছেন

মুক্তিযুদ্ধে সন্তানহারা মা এবার বাড়িও হারাচ্ছেন
×

বৃদ্ধ রাশিদা বেগম

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৫:২১

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কন্যাসন্তান হারিয়েছেন রাশিদা বেগম। ১১ বছরের ইশরাত জাহান আরা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মিরপুরের এক নম্বর সেকশনের বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আর ফেরেনি। সেই থেকে কিশোরী মেয়েটি নিখোঁজ। গত ৫০ বছরেও তার খোঁজ পাওয়া যায়নি।

একমাত্র সন্তান হারানোর পর ২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর বার্ধক্যজনিত রোগে মারা যান রাশিদা বেগমের স্বামী মো. ইয়াকুব (৯০)। সন্তান ও স্বামী হারিয়ে রাশিদা এখন বড়ই অসহায় ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তার মিরপুরের বসতবাড়িটিও এখন বেদখল হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বাড়িটি জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে এক ভূমিদস্যু।

৭৮ বছর বয়সী রাশিদা বেগমের কেউ না থাকায় নিজ ভবনে অন্য এক পরিবারের সঙ্গে থাকছেন তিনি। স্থানীয় একটি স্কুলের ইংরেজির সাবেক শিক্ষক রাশিদা বার্ধক্যের কারণে এখন চলাফেরাও করতে পারছেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাশিদা বেগমের স্বামী মো. ইয়াকুব ছিলেন বিজি প্রেসে কর্মরত। রাজধানীর মিরপুর এক নম্বরের সি-ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ৬ নম্বর বাড়ির পৌনে দুই কাঠার প্লটটি চাকরি জীবনে ক্রয় করেছিলেন ইয়াকুব। ১৯৬১ সালে কেনা জমিটি দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৮ সালে মিরপুর হাউজিং থেকে তাকে বিবেচনাপত্র লিজ দলিল দেওয়া হয়। যার নম্বর-৬৪৩৮।

২০১৬ সালে ব্রীজ ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তি করে পৌনে দুই কাঠা জমির ওপর ছয়তলা ভবন নির্মাণ করা হয়। ইয়াকুবের মৃত্যুর পর ২০১৭ সালে মো. মামুন ইসলাম নামে এক ব্যক্তি তার পরিবার নিয়ে ওই বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে ওঠেন। ভবনের পুরো ছয়তলাসহ ৫টি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন মামুন। বর্তমানে ষষ্ঠ তলায় একাই পরিবার নিয়ে দখল করে আছেন মামুন। সেখানে গভীর রাতে চলে জঙ্গিবাদের প্রশিক্ষণের কার্যক্রম, মদ, জুয়া, ইয়াবা এবং বহিরাগত নারী ও পুরুষের যাতায়াত। ফ্ল্যাট ছাড়তে বললে জীবননাশের হুমকি দিয়ে রাশিদা বেগমকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেন মামুন। এ নিয়ে থানায় জিডিও করেছেন রাশিদা।

জানা যায়, মামুনের স্ত্রী নাজমার বোন আছমা ইয়াকুবের বাসায় এক সময় কাজ করতেন। নাজমা বেগমের অপর দুই বোন আছমা এবং সানু এখন এই বাড়িতেই পরিবার নিয়ে বিভিন্ন তলায় থাকছেন। ইয়াকুবের মৃত্যুর পর নাজমা বেগম ইয়াকুবের পালিত কন্যা দাবি করে এবং ভুয়া অছিয়তনামার মাধ্যমে জাল দলিল ও বানোয়াট কাগজপত্র তৈরি করেন।

ইয়াকুবের মৃত্যুর পর ২০১৭ সালে শারীরিক অসুস্থতা ও আর্থিক সংকটের কারণে ভবনের দ্বিতীয় তলায় সামনের দিকের ফ্ল্যাটটি জনৈক মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে বিক্রি করেন রাশিদা। কিন্তু মামুনের বাধার কারণে সেখানে পরিবার নিয়ে উঠতে পারেননি মোয়াজ্জেম। এরপর পুরো বাড়ি দেখভালের জন্য ২০১৮ সালে মোয়াজ্জেম হোসেনকে আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) দেন রাশিদা। এরপর শুরু হয় মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা ও নির্যাতন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিনিয়ত মামুন ও তার সহযোগীরা মোয়াজ্জেমের পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকিসহ নানা ধরনের মানসিক নির্যাতন চালাচ্ছে। এরপর মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে একে একে সাতটি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। সব মামলার বাদী মামুনের স্ত্রী নাজমা বেগম। ঢাকার আদালতে ইতোমধ্যে ৫টি মামলা খারিজ হয়ে গেছে।

মোয়াজ্জেম হোসেন সমকালকে জানান, ভবনের দ্বিতীয় তলার সামনের দিকের ফ্ল্যাট ২০১৭ সালে ক্রয় করি। কিন্তু মামুনের অত্যাচারে সেখানে উঠতে পারিনি। বর্তমানে তৃতীয় তলায় ডেভেলপারের অংশে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকছি। ২০১৭ সাল থেকে তার পরিবারে বসবাস করছেন রাশিদা। তার খাওয়া-দাওয়া, চিকিৎসাসহ যাবতীয় দেখভালের দায়িত্ব পালন করে আসছেন মোয়াজ্জেমের স্ত্রী বিউটি বেগম।

বিউটি বেগম সমকালকে জানান, বাড়িটি দখলের নানা ষড়যন্ত্র হচ্ছে। মামুন ইতোমধ্যে ব্যাক ডেট দিয়ে ২০১২ ও ২০১৪ সালে দু'বার মিথ্যা ও জাল অসিয়তনামা তৈরি করে।

জানা যায়, মামুন বেসরকারি টেলিভিশন এনটিভির কর্মী। এ বিষয়ে এনটিভি কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ জানানো হয়েছে। বিউটি বলেন, নিজের কেনা ফ্ল্যাটে উঠতে পারছি না। উপরন্তু প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা ভাড়া দিচ্ছি। আমি এখন নিরুপায়। স্বামী ও ছেলেমেয়ে নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। তিনি জানান, মামুন তাকে বিল্ডিং থেকে উচ্ছেদের সব চেষ্টা চালাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে তার পরিবারের ওপর নির্যাতনের বিচার দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি অসহায় বাড়ির মালিককে তার অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে সংশ্নিষ্ট প্রশাসনের কাছে দাবি জানান বিউটি বেগম।

গত সপ্তাহে মিরপুরে ঘটনাস্থলে গেলে বৃদ্ধ রাশিদা বেগম সমকালকে বলেন, 'বাবা আমার কেউ বেঁচে নেই। আমার বাড়িটি তোমরা রক্ষা করো। ভূমিদস্যুর হাত থেকে বাড়িটি উদ্ধারের জন্য আমি সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাই। ওই বাড়ির একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, মামুন এই বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে ওঠার পর নানা ষড়যন্ত্র করছেন বাড়িটি দখলের জন্য। স্ত্রী নাজমা বেগমকে মৃত ইয়াকুবের পালিত কন্যা বানিয়ে তৈরি করেন একাধিক জাল অছিয়তনামা। বৈধতা নিতে মিরপুর হাউজিংয়েও যান তিনি। কিন্তু তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে হাউজিং কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জাল প্রমাণিত হওয়ায় আবেদনটি খারিজ হয়ে যায়। বাড়ির মালিক মো. ইয়াকুবের কোনো সন্তান না থাকায় ২০১৭ সালে জমিটি ওয়ারিশসূত্রে স্ত্রী রাশিদার নামে নামজারি (মিউটেশন) হয়। এরপর থেকে বাড়ির নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে আসছেন রাশিদা বেগম।

জানা গেছে, বরিশালের কাউয়ারচর এলাকায় জন্মগ্রহণকারী মামুন ইসলাম এনটিভিতে চাকরি করছেন মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার (এসি) হিসেবে। কিন্তু বাইরে পরিচয় দেন সাংবাদিক। আবার কোথাও কোথাও এনটিভির মালিক মোসাদ্দেক আলী ফালুর পিএস হিসেবেও পরিচয় দিয়ে থাকেন।

এ বিষয়ে মামুন ইসলাম সমকালকে বলেন, তিনি কারও বাড়ি দখল করেননি। তার চাচাশ্বশুর ইয়াকুব তার স্ত্রী নাজমা বেগমের নামে ২০১২ সালে ৬ তলা অছিয়তনামায় দলিল করে দিয়ে গেছেন। সেই বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। মোয়াজ্জেম ও তার স্ত্রী বিউটি বেগমকে ভূমিদস্যু উল্লেখ করে মামুন বলেন, তারা ভুয়া আমমোক্তারনামা তৈরি করে রাশিদা বেগমকে জিম্মি করে রেখেছে। তার কাছ থেকে জোর করে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। মামুন আরও বলেন, চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করি। আমার স্ত্রীকে যেটুকু দেওয়া হয়েছে, সেখানে আছি। তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইঞ্জিনিয়ার আবুল কাশেম সমকালকে বলেন, বাড়ির মালিক ছিলেন ইয়াকুব। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী হবেন ওই বাড়ির মালিক। এখন কারা দখল করে আছে, এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমাকে দিয়ে কোনো অন্যায় কাজ করানো যাবে না।

সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী টিপু সুলতান সমকালকে বলেন, বাড়ির মালিক মো. ইয়াকুব মৃত্যুর পর তার স্ত্রী রাশিদা পাবেন ওই সম্পত্তি। এটাই নিয়ম। এখানে কোনো কাজের লোক জমি পাবে না। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে কোনো বাড়ি দখলে যাওয়া যায় না। আদালতে এ নিয়ে মামলাও চলছে। তিনি বলেন, অবৈধ দখলদারদের কারণে রাশিদা বেগম এখন তার বাড়িতে থাকতে পারছেন না। এটা খুবই অমানবিক।

আরও পড়ুন

×