কাঁদলেন কাঁদালেন গাওজিয়ানের স্ত্রী
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:৩৬ | আপডেট: ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২:০৫
ততক্ষণে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন শেষ হয়েছে। কীভাবে, কেন এবং কারা বনানীতে
চীনা নাগরিক গাওজিয়ান হুইকে হত্যা করেছে, তা বিশদভাবে তুলে ধরলেন ঢাকা
মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন। এরপর স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছিল লাশ মাটিচাপা দেওয়ার স্থানের ভিডিওচিত্র। এমন নৃশংস দৃশ্যপট
দেখে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন এক বিদেশি মধ্যবয়সী
নারী। পাশ থেকে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন আরও কয়েকজন চীনা
নাগরিক। পরে জানা গেল, যে নারী বুক ফাটিয়ে চিৎকার করছিলেন তার নাম লিন জি
ট্যাং, গাওজিয়ানের স্ত্রী। স্বামীকে কারা হত্যা করেছে তা জানতে দুই
সন্তানসহ লিন গতকাল বুধবার সকালে হাজির হন ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে। সংবাদ
সম্মেলন শেষে যখন খুনিদের নৃশংসতার চিত্র স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছিল, তখন আর
নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারেননি তিনি। দুই সন্তান বারবার টিস্যু দিয়ে
মায়ের চোখের কোনায় গড়িয়ে পড়া জল মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তবে দুঃখের
সাগরে কে কাকে প্রবোধ দেবে! স্বজনের কান্না দেখে খুনিদের নৃশংসতার দৃশ্যপট স্ক্রিনে দেখানো বন্ধ করে দেওয়া হয়।
গাওজিয়ানের হত্যার খবর জানতে পেরে তার আরও কিছু স্বজন চীন থেকে ঢাকায় আসেন।
তারাও গতকাল উপস্থিত ছিলেন সংবাদ সম্মেলনে। স্বজনের মৃত্যুতে শোকে কাতর
গাওজিয়ানের পরিবারের চোখের পানি দেখে উপস্থিত সংবাদকর্মী ও পুলিশ সদস্যরা
আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ঢাকায় চীনা দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ইয়ান
জিংপিংসহ অন্যান্য কর্মকর্তা হাজির হন ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে। দ্রুত
সময়ের মধ্যে আসামি শনাক্ত হওয়ায় তারা পুলিশকে ধন্যবাদ জানান। এরপর
শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানায় পুলিশ। ধর্মীয় রীতি
অনুযায়ী গাওজিয়ানের মরদেহ বাংলাদেশে সৎকার করা হবে বলে পুলিশকে জানিয়েছে
গাওজিয়ানের পরিবার।
যে কারণে হত্যা :বিত্তবানদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার সমান্তরালে নিজেদের
দৈন্যদশা দেখে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল দুই নিরাপত্তাকর্মী আবদুর রউফ ও
ইনামুল। তারা দায়িত্ব পালন করত বনানীর ২৩ নম্বর সড়কের ৮২ নম্বর বাসায়। ওই
বাসার ছাদেই তারা থাকত। একই বাসায় থাকতেন গাওজিয়ান হুই। তিনি অনেক সময়
ফ্ল্যাটে একা থাকতেন। অনেক টাকাও ছিল তার বাসায়। তাই তাকে হত্যার পর টাকা
লুট করে 'নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের' পরিকল্পনা করে দু'জন। দুই দফা চেষ্টায়
শেপর্যন্ত তাকে হত্যা করে তারা। এ সময় টাকা লুটের উদ্দেশ্যে বাসায় থাকা
ভল্ট ভাঙারও চেষ্টা করে তারা। তবে ভাঙতে না পেরে ব্যাগে থাকা প্রায় সাড়ে
তিন লাখ টাকা নিয়ে চলে যায়।
বনানীতে চীনা নাগরিক খুনে জড়িত দুই নিরাপত্তাকর্মীকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে
জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ
(ডিবি)। গতকাল বুধবার রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এ
সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে বনানী এলাকা থেকে হত্যায় জড়িত রউফ ও ইনামুলকে ডিবি
গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের তথ্যে একটি ভাঙা মোবাইল ফোন, হত্যায় ব্যবহূত
গামছা, বালতি ও লাশ মাটিচাপা দেওয়ার জন্য গর্ত খোঁড়ায় ব্যবহূত কাঠের টুকরো
ও ১ লাখ ২১ হাজার ৫০০ টাকা জব্দ করা হয়। পরে তাদের আদালতে হাজির করে
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। আদালতে তাদের পক্ষে কোনো
আইনজীবী ছিলেন না। এ সময় ঢাকা মহানগর হাকিম তোফাজ্জল হোসেনের প্রশ্নের
জবাবে তারা টাকা লুটের উদ্দেশ্যে হত্যার কথা স্বীকার করে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন জানান, একসঙ্গে
চাকরির সুবাদে দুই নিরাপত্তাকর্মীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে
উঠেছিল। নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতার একপর্যায়ে রউফ চীনা নাগরিককে হত্যার
প্রস্তাব দেয়। ইনামুল তাতে রাজি হয়। এর মধ্যে তারা নিশ্চিত হয়, হার্ডডিস্ক
না থাকায় ওই ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরায় ভিডিও রেকর্ড হয় না। এরপর ৬ ডিসেম্বর
তারা প্রথমবার হত্যার চেষ্টায় চালায়। সেদিন সন্ধ্যায় তারা গাওজিয়ানের ৬/ই ও
৫/ই নম্বর ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের কলিং বেল চাপলে কেউ দরজা খোলেনি। ১০
ডিসেম্বর তারা আবারও যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইনামুল তার ব্যবহূত গামছা
সঙ্গে নেয়। মাগরিবের আজানের পরপরই তারা গাওজিয়ানের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে
কলিং বেলে চাপ দেয়। গাওজিয়ান দরজা খুলে ওদের দেখে অবাক হন। তিনি বাংলা বা
ইংরেজি ভাষা জানতেন না। তাই ইশারায় জিজ্ঞেস করেন, কী বিষয়? তখন ইনামুল
'ওয়াটার ওয়াটার' বলে বোঝাতে চায় যে তারা পানি খাবে। পরমুহূর্তে তারা জোর
করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকে পড়ে। ইনামুল গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরে এবং রউফ
কোমরের দিকে জাপটে ধরে। অল্প সময়ের মধ্যেই গাওজিয়ানের নাক-মুখ দিয়ে রক্ত
বেরিয়ে আসে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে রউফের বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে কামড় দেন
গাওজিয়ান। দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। ড্রয়িং রুমের টেবিলের ওপর
তার ল্যাপটপ খোলা ছিল। পাশে ছিল তার সবসময়ের অনুষঙ্গ একটি ছোট ব্যাগ। রউফ
ব্যাগটি খুলে তিনটি এক হাজার টাকার বান্ডিল, কিছু খুচরা টাকা ও মোবাইল ফোন
নেয়। এরপর মৃতদেহ ড্রয়িং রুমে নিয়ে গামছা দিয়ে রক্ত মুছে বের হয়ে ছাদে চলে
যায়। সেখানে গামছা ধুয়ে ও নিজেরা গোসল করে একসঙ্গে বের হয়। পরে তারা
টাকাগুলো ভাগ করে নেয়। রউফ নেয় ১ লাখ ৭৬ হাজার এবং ইনামুলকে দেয় ১ লাখ ৭৩
হাজার টাকা। রউফ বনানী সুপার মার্কেটের আশপাশে থাকা তিনজন মোবাইল ব্যাংকিং
এজেন্টের মাধ্যমে তার গ্রামের বাড়িতে বন্ধু হাসানের কাছে ১ লাখ ৫৫ হাজার
টাকা পাঠিয়ে দেয়। ইনামুল চার এজেন্টের দোকান থেকে নিজের মোবাইল ব্যাংকিং
অ্যাকাউন্টে ৫০ হাজার, এলাকার বড় ভাই করিমের (মিরপুরের একটি বাড়ির
ম্যানেজার) কাছে ৫০ হাজার, বন্ধু শাহীনের কাছে ৪০ হাজার ও তার মেজো ভাবির
কাছে ৩০ হাজার টাকাসহ মোট ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেয়।
এক প্রশ্নের জবাবে আবদুল বাতেন বলেন, গুলশান-বনানীর মতো জায়গায় উচ্চবিত্তরা
বসবাস করেন। সেখানে বিদেশিরাও থাকেন। ওই এলাকায় বাসাবাড়িতে নিরাপত্তারক্ষী
নিয়োগের আগে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও যাচাই-বাছাই করা উচিত। এমনকি সব
বাসায় সিসিটিভি সচল রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ডিবি কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে রউফ নিরাপত্তাকর্মী
হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। রাত আনুমানিক ১১টায় সে ভবনের পেছনের নরম মাটিতে
কাঠের টুকরো দিয়ে গর্ত করে ওপরে ওঠে। আরেক নিরাপত্তাকর্মীর সহায়তায় লিফট
ব্যবহার করে একাই গাওজিয়ানের লাশ নিচে নামিয়ে মাটিচাপা দেয়। পরদিন সকালে
নিহতের গাড়িচালক ও গৃহকর্মী তাকে বাসায় না পেয়ে এবং তার ব্যবহূত স্যান্ডেলে
রক্তের দাগ দেখে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে গাড়িচালক সুলতান ভবনের
পেছনে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় গাওজিয়ানের পায়ের গোড়ালি দেখতে পান। পরে
বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।
ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, নিরাপত্তাকর্মী রউফ গত এক মাস ও ইনামুল ১৫ দিন
ধরে ওই বাসায় কাজ করে আসছিল। হত্যার পর ইনামুল বনানী এলাকার এক সড়ক
বিভাজকের কংক্রিট সরিয়ে লুকিয়ে কিছু টাকা রাখে।
ডিবির উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, 'গাওজিয়ানের সঙ্গে তার স্ত্রী,
সন্তান ও ভাইবোনদের যে আবেগঘন সম্পর্ক ছিল, বিদেশিদের ক্ষেত্রে এটা খুব কম
দেখা যায়। এছাড়া গাওজিয়ান যেসব বাংলাদেশির সঙ্গে মিশতেন তাদের আপন করে
নিয়েছিলেন। সত্যিকার অর্থে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভালো মানুষ।'
গাওজিয়ান ২০১৫ সাল থেকে এ দেশে ব্যবসা করে আসছিলেন। শেষ এক বছর তিনি বনানীর
ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন। তিনি চীন থেকে পাথর ও নির্মাণসামগ্রী আমদানি করে
পদ্মা সেতু ও পায়রা বন্দরে সরবরাহ করতেন।
- বিষয় :
- চীনা নাগরিক খুন
