মশক নিধন কার্যক্রম কতদূর?
ফাইল ছবি
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২:৩১
অ্যাডিস মশার কারণে কয়েক মাস আগে প্রায় মহামারি আকার নিয়েছিল ডেঙ্গুজ্বরে। সারাদেশে এই জ্বরে প্রাণ গেছে কয়েকশ' মানুষের, আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে হাজার হাজার জনকে। বছরখানেক আগে একই অবস্থা হয়েছিল চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে।
এবার ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাবের সময় তুমুল সমালোচনা ও চাপের মুখে কিছুটা গতি পেয়েছিল সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম। ডেঙ্গুর সেই প্রাদুর্ভাব এখনও নির্মূল না হলেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মনে করছে, আপাতত মশা আর কোনো সমস্যা নয়। এ কারণে তাদের মশক নিধন কার্যক্রমেও ভাটা পড়েছে।
অথচ প্রতিদিনই মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হচ্ছেন নগরবাসী। গত কয়েক দিনে মশার অত্যাচার অনেক বেড়েছে। পরিবারের ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে শঙ্কায় দিনরাত পার করছেন বাসিন্দারা।
রাজধানীর মগবাজারের ৬৩৮ পেয়ারাবাগের গৃহবধূ নিশাত সাবেরা জানান, পাঁচতলার ওপর থেকেও মশার যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। অ্যাডিশ মশার কারণে পরিবার নিয়ে বিশেষ করে স্কুলপড়ূয়া মেয়েকে নিয়ে খুব ভয়ে আছেন।
মগবাজারের ৩৭৩ দিলু রোডের বাসিন্দা তালেয়া বেগম বলেন, মগবাজার এলাকায় কয়েকজন কিছুদিন আগেও অ্যাডিশ মশার কামড় খেয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এ জন্য তারাও ভয়ে আছেন। প্রতিদিন বিকেল হতেই বাসায় মশার কয়েল জ্বালিয়ে রাখছেন।
পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা স্মরণিকা জানান, অন্য বছর এই সময়ে মশা কম থাকে। এবার কমছে না। ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় কিছু দিন ওষুধ ছিটাতে দেখেছিলেন। এখন আর সেটা নেই।
কেবল মগবাজার, শেওড়াপাড়া এলাকাই নয়, রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, তেজগাঁও, রামপুরা, ধানমন্ডি, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, পুরান ঢাকাসহ নগরীর প্রতিটি এলাকার বাসিন্দা মশার আতঙ্কে ভুগছেন। ভিআইপি এলাকার বাসিন্দাদের ভয় আরও বেশি। কারণ অ্যাডিশ মশার বিস্তার বনেদি এলাকাতেই বেশি ঘটে। এসব এলাকার বাসিন্দারা জানান, বেশ কিছু দিন ধরে সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম তাদের চোখে পড়ছে না।
রাজধানীতে মশার উপদ্রব সহনীয় রাখতে ও অ্যাডিশ মশার বংশবিস্তার রোধে বদ্ধ জলাশয় ও নর্দমা পরিস্কার, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সচেতনতামূলক কর্মসূচিসহ যেসব কার্যক্রম চলমান রাখা প্রয়োজন, বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশনই তা থেকে অনেকটা বিরত রয়েছে। ফলে রাজধানীতে দেখা দিয়েছে মশার দৌরাত্ম্য। রয়েছে অ্যাডিশ মশার উপস্থিতিও। বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসাধীন থাকার খবরও পাওয়া যাচ্ছে মাঝে মধ্যেই।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অ্যাডিস মশার প্রাদুর্ভাবকালে কিছু পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি গ্রহণ করলেও তা পর্যাপ্ত ছিল না। ওই সময় মশার ওষুধ ছিটাতে দেখা গেলেও এখন আর ফগারম্যানদের দেখা মিলছে না।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশ্বাস, শীতের তীব্রতা বাড়লে মশার দৌরাত্ম্য এমনিতেই কমে যাবে। মশারও মৃত্যু ঘটবে। এ জন্য ওষুধ ছিটানোর ব্যাপারে তারা অনেকটাই নিস্পৃহ। এমনকি গত ২০ আগস্ট মশক নিধন দিবসেও দুই সিটি করপোরেশনের কোনো কর্মসূচি ছিল না। নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের উদ্যোগে কেবল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকন একটি পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। আর কোনো সংস্থার কোনো কর্মসূচি ছিল না। মূলত এসব উদাসীনতার সুযোগে রাজধানীতে আবারও বেড়েছে মশার যন্ত্রণা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা কিছু করছেন না, এটা ঠিক নয়। নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। এছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডকে কয়েক ভাগে ভাগ করে মশকবিরোধী অভিযান চলছে। পাশাপাশি নতুন ওয়ার্ডগুলোতে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়েছে। মশাও নিয়ন্ত্রণে আছে।
ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা জানান, সকাল বেলায় যে অ্যাডাল্টিসাইড ওষুধ স্প্রে করার কথা, সেটা করা হচ্ছে। সন্ধ্যায় উড়ন্ত মশা মারার জন্য লার্ভিসাইডও স্প্রে করা হচ্ছে। তবে একটু কম। এই মুহূর্তে ওষুধেরও কোনো সংকট নেই।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা বলেন, তারা নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। কাজেই মশার দৌরাত্ম্য আছে বলা যাবে না। ওষুধেরও ঘাটতি নেই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, এই সময়ে কিউলেক্স মশা বেড়ে যায়। খাল-জলাশয়-নালা ও ড্রেনগুলো মশার উৎকৃষ্ট প্রজননস্থলে পরিণত হয়। বৃষ্টি না থাকায় এসব জায়গায় পানিপ্রবাহ থাকে না। তখন মশার বংশবিস্তার সহজ হয়। এ জন্য ওইসব স্থানে বেশি করে মশার ওষুধ ছিটানো প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। মনে হয় এদিকে একটু ঘাটতি আছে।
- বিষয় :
- মশা নিধন
