করোনা মোকাবিলায় দরকার সম্মিলিত প্রয়াস
শরীফা উম্মে শিরিনা
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২০ | ০৫:১৫ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
ছোটবেলা থেকেই পড়ে এসেছি যে, মানুষ সামাজিক জীব। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাস প্রমাণ করল, ভালো থাকা ও রাখার জন্য অসামাজিকও হতে হয়। করোনাভাইরাসে পুরো বিশ্ব বিপর্যস্ত। সূচনালগ্ন থেকেই পৃথিবীতে এমন কোনো মহামারি দেখা দেয়নি যা সমগ্র পৃথিবীকে একসঙ্গে আক্রান্ত করেছে।
গত ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের উহান প্রদেশে করোনাভাইরাস যার নাম কভিড-১৯ শনাক্ত হয়। টানা তিন মাসে কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন উহান প্রদেশে কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। গ্লোবালাইজেশন ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এ যুগে মাত্র দুই মাসেই বিশ্বের ১৯৭টি দেশেই কভিড-১৯-এর দ্রুত সংক্রমণ দেখা দেয়। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত বিশ্বে মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ এবং মৃতের সংখ্যা ৭০ হাজারের বেশি।
ইউরোপীয় দেশ বিশেষ করে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইরান এবং বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ হিসেবে বিবেচিত যুক্তরাষ্ট্রে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইতালিতে প্রতিদিন গড়ে ৭শ'র বেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফ্রান্স ও ইরানে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সেই সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর সারি। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও প্রায় জ্যামিতিক হারে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
গত দু'দিনে বাংলাদেশেও জ্যামিতিক হারে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। তবুও বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকসহ মানুষের টনক নড়ছে না। করোনার ঝুঁকি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে না। আমাদের দেশে এ পর্যন্ত মোট ১২৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ১৩ জন। এ দেশের মানুষ এখনও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণে সরকারিভাবে ঘোষিত সাধারণ ছুটিকে ঈদের ছুটির মতো উদযাপনে ব্যস্ত। তবে এজন্য অপরিকল্পিতভাবে ছুটি ঘোষণাও অনেকটা দায়ী। কারণ হুজুগে বাঙালিকে আগে বোঝানোর দরকার ছিল যে, এই সাধারণ ছুটি বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য নয়; বরং যে যেখানে আছে তাকে সেখানেই অবস্থান করার জন্য ছুটি। এটাকেই বলে হোম কোয়ারেন্টাইন। কারণ, কভিড-১৯ মোকাবিলায় এর থেকে ভালো উপায় আর নেই।
কভিড-১৯ মোকাবিলার জন্য দীর্ঘ সময় পেলেও এখন পর্যন্ত সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ প্রমাণ করে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব আছে। যদিও সরকারের মন্ত্রীরা বারবার দাবি করেছেন, তারা কভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রস্তুত! কারণ চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পর জানুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত বহু লোক দেশের বাইরে থেকে এসেছে তাদের কোনো তালিকা নেই এবং তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা তথা কোয়ারেন্টাইনে রাখার কোনো ব্যবস্থা করেনি শুধু চীন থেকে আগতদের ছাড়া।
ফেব্রুয়ারির শেষে ও মার্চের শুরুতে ইতালি থেকে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশে আসেন, যাদের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বাধ্য করা সম্ভব হয়নি। তারা গ্রামে ফিরে অবাধে মেলামেশা করে যার কারণে করোনাভাইরাস স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরে অবশ্য সরকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে বিদেশফেরত প্রবাসীদের খুঁজে বের করে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেয়। জনগণকে করোনাভাইরাস কী, কী কী কারণে সংক্রমণ হয়, হোম কোয়ারেন্টাইন কী ও কীভাবে থাকতে হয় এসব বিষয়ে সচেতন না করেই দু'দিন হাতে রেখেই ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এই সাধারণ ছুটি শব্দের পরিবর্তে সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা বললে ভালো হতো। সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর তারা যেভাবে বাড়ি ফিরেছে, তাতে যে উদ্দেশ্যে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে তা ষোলো আনাই বৃথা। বরং, দরকার ছিল ছুটি ঘোষণার কিছুদিন আগে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা সহকারে রাস্তায় আর্মি বা সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত যানবাহন নামানো; অফিসের কাজ শিথিল করে দেওয়া যাতে যার যখন যেভাবে (বাসায় বসে করা সম্ভব হলে) সুবিধা সেভাবে কাজ করতে পারে। এর অর্থ এই যে, হয় যথাযথ নিয়ম মেনে কাজ করো নয়তো বাসায় বসে থাকো; কোনোভাবেই বাইরে যাওয়া যাবে না। এভাবে কিছুদিন চলার পর সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলেও জনগণ এই হারে বাড়িতে আসতে পারত না। কারণ করোনাভাইরাস যে ভয়াবহ- এ মেসেজ ততদিনে মানুষের কাছে পৌঁছে যেত। এতে অর্থনীতির চাকা কিছুটা সচল থাকার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যেত।
এখনও করোনা মোকাবিলার জন্য দেশের ডাক্তার, বুদ্ধিজীবী, যোগাযোগবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও অন্য স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে একটি স্পেশাল টিম গঠন করা হয়নি। যদিও এ ধরনের টিম গঠন করা দরকার ছিল অনেক আগেই, যখন চীনের উহানে ভয়াবহ পরিস্থিতি হয় তখন। এটা পূর্ব প্রস্তুতির একটা অংশ হতে পারত। আর এই স্পেশাল টিম আগেই গঠিত হলে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর জনগণের বাড়ি যাওয়া হিড়িক আটকানোর উত্তম পন্থা বের হতে পারত। তাছাড়া করোনার মতো দুর্যোগ-পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কীভাবে করা হবে সে ব্যাপারেও নীতিনির্ধারকদের কোনো পদক্ষেপ এখনও পর্যন্ত চোখে পড়েনি। অথচ করোনা-পরবর্তী দেশ ও বিশ্বের অর্থনীতির ভয়াবহ রূপ আঁচ করে তা সহ্য করতে না পেরে জার্মানির স্টেট অর্থমন্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন।
কভিড-১৯ নির্ণয়ের একমাত্র কেন্দ্রস্থল ঢাকায় অবস্থিত আইইডিসিআর (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট) ২৪ ঘণ্টায় মাত্র গড়ে ১০০-এর মতো নমুনা পরীক্ষা করে। করোনাভাইরাস মোকাবিলাই সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলোই আরেকটু সুচিন্তিতভাবে নিলে বর্তমানের চেয়ে ৩০-৪০ গুণ বেশি কার্যকর হতো। জাতিসংঘের মতে, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশে দুই মিলিয়ন অর্থাৎ, ২০ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে কমিউনিটি পর্যায়ে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ শুরু হয়েছে। তবে এখনও কার্যকর পদক্ষেপ নিলে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে বেশকিছু পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। প্রত্যেক জেলায় সম্ভব হলে উপজেলাগুলোতে করোনা নির্ণয়ের পরীক্ষাসহ রোগীর চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকাকেন্দ্রিকতা কোনোভাবেই রাখা যাবে না। প্রত্যেক জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তারদের (বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবক ডাক্তারসহ) সমন্বয়ে ছোট ছোট টিম গঠন করতে হবে যারা ওই নির্দিষ্ট জেলা বা উপজেলার সব রোগীর চিকিৎসাসহ পরীক্ষা করবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় ডাক্তারদের ট্রেনিং দেওয়া ও দেখভাল করার জন্য ঢাকা থেকে একজন করে ডাক্তার প্রত্যেক জেলায় (সম্ভব হলে উপজেলাতেও) পাঠিয়ে দিতে হবে। প্রশ্ন আসতে পারে, এত ডাক্তার পাবো কোথায়? একমাত্র সমাধান সরকারি ডাক্তারের পাশাপাশি ঢাকার সব বেসরকারি ডাক্তারদের (স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বা প্রণোদনার মাধ্যমে) তাদের ট্রেনিং দিয়ে জেলাগুলোতে পাঠানো যেতে পারে। তবে ডাক্তারদের শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) ওপর নির্ভর না করে প্রত্যেক ইউনিয়নের ওয়ার্ডভিত্তিক এলাকার সচেতন ব্যক্তি, ইউনিয়ন পরিষদের একজন সদস্য ও একজন করে পুলিশ/আর্মি/বিজিবির (ডিফেন্সের লোক না থাকলে গ্রামের মানুষ নির্দেশনা মানতে চায় না) সমন্বয়ে সর্বোচ্চ চার সদস্যের একটি ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা যাদের কাজ হবে যার যার ওয়ার্ডের প্রতিটি বাড়ি পরিদর্শন করে রোগী শনাক্তসহ হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা ও নাগরিকদের জরুরি প্রয়োজন জেনে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা। কারণ, ইউএনও বা পুলিশ রাউন্ড দিয়ে চলে যাওয়ার সঙ্গে সবাই আগের মতোই স্বাভাবিক থাকে। যদিও যানবাহন ও সন্ধ্যার পর দোকানপাট বন্ধ থাকার কারণে চলাচল ও আড্ডা কিছুটা কমলেও আসলে হোম কোয়ারেন্টাইন বা সঙ্গনিরোধ বলতে যা বোঝায় তা কিন্তু চর্চা হচ্ছে না।
সামনের ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে আইন ও নিয়ম না মানাদের নিয়ম মানতে বাধ্য করতে উপরোক্ত পদক্ষেপগুলোর কোনো বিকল্প নেই। বৈশ্বিক এ মহামারি ঠেকাতে শুধু সরকারি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়, সর্বস্তরের জনগণ এগিয়ে আসতে হবে, সহযোগিতা করতে হবে, সচেতন হতে হবে ও করতে হবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]
