ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

কৃষিই হতে পারে মন্দা কাটানোর মূল অস্ত্র

কৃষিই হতে পারে মন্দা কাটানোর মূল অস্ত্র
×

ড. প্রণব কুমার পান্ডে

ড. প্রণব কুমার পান্ডে

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২০ | ১০:২৩ | আপডেট: ০৫ মে ২০২০ | ০০:৪০

চলমান লকডাউনের কারণে দেশের অর্থনীতি চরম হুমকির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে- একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর মূল কারণ আমাদের অর্থনীতির প্রধান একটি স্তম্ভ রেমিট্যান্সের হার লক্ষণীয় মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে।

গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশীয়ার দেশগুলো থেকে কয়েক লাখ স্বল্প প্রশিক্ষিত অভিবাসী দেশে ফেরত এসেছে। তাদের বেশিরভাগ চাকরি হারিয়েছেন, কারণ কোভিড-১৯ মোকাবেলায় লকডাউনের কারণে সে সমস্ত দেশের অনেক শিল্প-কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এই বিপুল সংখ্যাক বিদেশ ফেরত প্রবাসীও সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ প্রথমত তাদের পুনর্বাসনের জন্য পরিকল্পনা করা এবং এই লকডাউনের সময় সহায়তা প্রদান করা- দুটিই কঠিন কাজ।

দেশের অর্থনীতির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ পোশাকশিল্পসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের অচলাবস্থাও অর্থনীতির ওপর একটি বড় প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। কাচাঁমালের অপ্রতুলতা ও ক্রয় আদেশ বাতিল হওয়ার কারণে বেশিরভাগ পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এছাড়া চলমান লকডাউনের কারণেও গার্মেন্টস মালিকরা কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। তাছাড়া, বেশিরভাগ পোশাক কারখানায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে শ্রমিকদের কাজ করানোর মতো পরিবেশ নেই। ফলে, একদিকে মালিকরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন ক্রয় আদেশ বাতিল হওয়ার কারণে, অন্যদিকে প্রায় ৩৫ লাখ শ্রমিককে বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হচ্ছে মানবতার খাতিরে।

ফলে এই সেক্টরটি বিশাল ঝুঁকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে, যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে হুমকির সম্মুখীন করবে। এই শিল্পকে সহায়তা করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছেন, যেটিও অর্থনীতির ওপর একটি বড় চাপ। এই প্যাকেজটি ছাড়াও সরকার কোভিড-১৯ এর অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকার একটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই অর্থের যোগান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তাছাড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সহায়তা প্রদানের জন্যও একটি বড় অংকের ভর্তুকি প্রদান করতে হচ্ছে। ফলে এখান থেকে সাধারণভাবেই অনুমান করা যায় যে, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় অ্যন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি বড় ধরনের চাপের সম্মুখীন হতে চলেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই অবস্থা কতদিন চলবে তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন বিধায় আমাদের দেশের অর্থনীতি কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হবে সেটি এই মুহূর্তে সঠিকভাবে বলা কঠিন।

ফলে, যে প্রশ্নটি বিভিন্ন সূত্রে আলোচিত হচ্ছে তা হলো- বাংলাদেশ কীভাবে এই অর্থনেতিক সংকট মোকাবিলা করবে? আমি মনে করি এই মুহূর্তে কৃষিই হতে পারে এই মন্দা কাটিয়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। কৃষির ওপর অধিক গুরুত্ব না দিলে খাদ্য উৎপাদন যদি ব্যাহত হয়, তাহলে সমস্যা আরো ঘনীভূত হবে। কৃষির ওপর গুরুত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারের জন্য দুটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমটি হলো কৃষকরা যেন সঠিকভাবে বোরো ধান গোলায় তুলতে পারে- এটি নিশ্চিত করা। এটি নিশ্চিত করার জন্য সরকার ইতোমধ্যে হাওড় অঞ্চলের সাতটি জেলায় ধান কাটার মেশিন সরবরাহের জন্য একশ' কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।

এখন প্রশ্ন হলো এই অঞ্চলে মোট বোরো ধানের স্থিরকৃত লক্ষ্যমাত্রা অর্থাৎ ২০.৪৩ মিলিয়ন টনের মধ্যে ২০ শতাংশ উৎপাদন হয়। বাকি ৮০ শতাংশ উৎপাদন হয় দেশের অন্যান্য জেলায়। তাছাড়া, হাওড় অঞ্চলের সকল কৃষকের ধান মেশিনের মাধ্যমে কাটাও কঠিন একটি কাজ। ফলে, ধান কাটার জন্য শ্রমিকের উপর নির্ভরতার কোনো বিকল্প নেই।

আমরা সকলেই জানি যে, ধান কাটার মৌসুমে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক ভিন্ন ভিন্ন জেলায় যায়। ফলে, এই মুহূর্তে সকল গণপরিবহন বন্ধ থাকার কারণে দেশের এক অঞ্চল থেকে শ্রমিকরা অন্য অঞ্চলে যেতে পারছে না। এমনকি যদি যেতেও পারে তবে তারা কতটা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করতে পারবে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর ফলে তারা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে- যদি কেউ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ধান কাটার জন্য যেতে চায়, তাদের স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যেতে হবে।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই সমস্ত শ্রমিকদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করা। শুধু পৌঁছে দিলেই হবে না, তারা যেন সামাজিক দূরত্ব মেনে কাজ করেন স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে এই বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া, এই সমস্ত শ্রমিকরা যদি করোনায় আক্রান্ত হয়, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা আরো কঠিন হয়ে যাবে।

কৃষি ক্ষেত্রে সরকারের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো- কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা। বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে যে, মৌসুমী পণ্য ও শাকসবজি উৎপাদনকারী কৃষকরা তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারছে না। যারা বিক্রি করছে তারা নামমাত্র মূল্যে পণ্য বিক্রি করছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত কৃষককে মিডিয়ার সামনে কাঁদতে দেখেছি। তারা বিভিন্ন সবজি নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ তারা তাদের পণ্য নিয়ে বড় বড় বাজারে বা শহরে যেতে পারছে না।

উদাহরণস্বরূপ, একজন কৃষক বলছিলেন- তিনি এক কেজি টমেটো বিক্রি করছেন ৩ টাকা, শসা ২ টাকা কেজি এবং একটা গোটা মিষ্টিকুমড়া বিক্রি করছেন ১৫ টাকায়। ফলে এই সমস্ত কৃষক যদি তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পায় তাহলে তাদের জন্য অন্ধকার ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে। কৃষকরা না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না। অন্যদিকে, এই লকডাউনের সময় কৃষকরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেলেও ভোক্তাদের ঠিকই অধিক মূল্য দিয়ে এই সমস্ত পণ্য ক্রয় করতে হচ্ছে। এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী কৃষকদের পণ্যের প্রকৃত মূল্য না দিয়ে ভোক্তাদের কাছে অধিক মূল্যে বিক্রি করে নিজেরা মুনাফা করছে। ফলে এই মুহূর্তে সরকারের উচিত স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এই সমস্ত পণ্যের সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ করা। তারা কৃষকদের কাছ থেকে উৎপাদিত পণ্য প্রকৃত মূল্যে ক্রয় করে বিভিন্ন বিতরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে ভোক্তাদের কাছে প্রকৃত মূল্যে বিক্রয় করবেন। এটা করা গেলে একদিকে যেমন কৃষক বাঁচবে, অন্যদিকে দরিদ্র জনগণ স্বল্পমূল্যে নিত্য প্রয়োজনীয় শাক-শবজি ক্রয় করতে পারবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোভিড-১৯ এর লকডাউনের মধ্যে কৃষকরা যেন কৃষি পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখে সেটি নিশ্চিত করা। এই মুহূর্তে বলা খুব কঠিন যে, কোভিড-১৯ মোকাবেলায় এই অচলাবস্থা কতদিন চলবে? এই বিষয়ে ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী জনগণকে আহ্বান করেছেন কৃষি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার। সকল নাগরিকদের নিজেদের বাড়ির আঙিনায় সবজি এবং ফলমূল চাষ করার অনুরোধ জানিয়েছেন। শুধু শাক-সবজি চাষ করলেই হবে না। বোরে ধান কাটা শেষ হলে আউষ ও আমন ধান রোপনের সময় শুরু হবে। ফলে সরকারের এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত যতটা সম্ভব কৃষকদের প্রণোদনা দিয়ে এই উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখা। কারণ, উৎপাদন কম হলে আমাদের খাদ্য ঘাটতি দেখা দিলে সেটি হবে অর্থনীতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত।

কৃষির সাথে সাথে এসময় দেশে যারা দুধ উৎপাদনের সাথে এবং হাঁস-মুরগির খামারের ব্যবসার সাথে জড়িত তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে, কৃষির পাশিাপাশি এই ক্ষুদ্র চাষীদের প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। তবে, এ সম্পর্কিত যে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব ও চাষীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি গুরত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায় যে, কোভিড-১৯ এর অর্থনেতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা গেলে দেশের অর্থনীতির পুনর্নিমান করা সরকারের জন্য সহজ হবে। এই মুহূর্তে আমাদের সকলের উচিত সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি মাথায় রেখে কৃষির উৎপাদনশীলতা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা। আর এটা করা গেলে কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা কিছুটা হলেও সহজ হবে।


লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর।

আরও পড়ুন

×