ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

করোনাকালের অর্থনীতি ভাবনা

করোনাকালের অর্থনীতি ভাবনা
×

সাব্বির আহমেদ

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২০ | ০৮:৩১ | আপডেট: ০৬ মে ২০২০ | ০৪:৩৬

চীনের উহানে ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হবার পর তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। যে সকল দেশে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ যত বেশি সে সকল দেশে আগে ছড়িয়েছে, বেশি ছড়িয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই করোনাভাইরাসের নাম দিয়েছে কভিড-১৯। পৃথিবীর ২১০টি দেশ ও অঞ্চলে বীরদর্পে এখন বিরাজ করছে করোনাভাইরাস। এ পর্যন্ত আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে। করোনাভাইরাসে প্রাণ গেছে ২ লাখ ১৮ হাজারের বেশি। এখন পর্যন্ত এর নিরাময়ে কোনো ওষুধ বাজারে আসেনি; পাওয়া যায়নি কোন প্রতিষেধক। গত দশদিনে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৮ হাজার আক্রান্ত মানুষ শনাক্ত হয়েছে; মৃত হয়েছে প্রায় ৫.৭ হাজার। শনাক্ত হয়নি এমন মানুষ রয়েছে আরও অনেক।

করোনা প্রতিরোধে একটাই উপায় ঘরে থাকা। সারা জাহানের অর্ধেক মানুষ বিভিন্ন দেশের শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নীতির ফলে এখন ঘরে বন্দি।বড় বড় সব শহরের রাজপথ এখন ফাঁকা। বন্ধ হয়ে আছে বেশির ভাগ ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস, আদালত,কারখানার চাকা। কৃষি চলছে বটে। উৎপাদননেই শিল্পে, সেবায়।

দেশে দেশে নেমে আসছে বেকারত্ব। আইএলও বলেছে, ১৬০কোটি মানুষ কর্মহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে কাজ হারিয়ে দরিদ্র হয়েছে অনেক মানুষ;নির্ভর করে আছে সাহায্যের উপর। বেকারত্বের হার আমেরিকায় ৩০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজ। ত্রিশের দশকের মহামন্দার সময়ে সেখানে সর্বোচ্চ বেকারত্ব রেকর্ড করা হয়েছিল ১০শতাংশ। আমেরিকার দেশজ উৎপাদন তিন ভাগের এক ভাগ কম হবে।

আইএমএফ বছরের শুরুতে ২০২০ সালের বিশ্ব উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করেছিল ৩.৩%। করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে এ প্রাক্কলন পুনঃপরীক্ষা করে বলেছে যে এ প্রবৃদ্ধি হবে ঋণাত্বক৩%। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় করোনার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি সংকুচিত হবে ৬.৩% বা ৫.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সর্বশেষ প্রাক্কলন বলছে, ২০২০ সালে বিশ্ব বাণিজ্য ১৩ - ৩২ শতাংশ কমে যাবে। ২০০৯ সালে আর্থিক সংকটের কারণে কমেছিল ২ শতাংশ।

করোনাভাইরাস  সমগ্র পৃথিবীর উপর এমন ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং অর্থনীতির পর্যবেক্ষকেরা ধারণা করছেন, এরপর পৃথিবী স্থায়ীভাবে বদলে যাবে। বদলে যাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভারসাম্য, অর্থনৈতিক শক্তি সমূহের ভরকেন্দ্র। এই পরিবর্তন এতটাই ব্যাপক হবে যে বর্তমান পৃথিবীর ৭৬০ কোটি মানুষের জীবন আর কখনো আগের মত হবে না। বিগত ১০০ বছরের মধ্যে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা পৃথিবীর রাজনীতি ও অর্থনীতির গতিপথ কয়েকবার বদলে দিয়েছে।

তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, দুটি বিশ্বযুদ্ধ, সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন, ত্রিশের দশকের মহামন্দা, বার্লিন দেয়ালের পতন, টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলা, ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক সঙ্কট।

অর্থকারবারীদের মাত্রাতিরিক্ত লোভের ফলে ভেঙে পড়ে উন্নত বিশ্বের ব্যাংকিং ব্যাবস্থা। ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় সব ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালে থেমে যায় আন্তর্জাতিক লেনদেন, শুরু হয় ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক সঙ্কট। এর ফলে ওসব দেশের লাখ লাখ মানুষ বসবাসের ঘরবাড়ি,আয়ের পথ হারায়। লাখ লাখ মানুষের রাত কাটে খোলা আকাশের নিচে। পথে পথে লাখ লাখ অনাহারী, অর্ধাহারী মানুষের বিক্ষোভে কেঁপে ওঠে ইউরোপ, আমেরিকার সরকারগুলো।

তবুও জনগণের স্বার্থে নয়, সরকারগুলো আর্থিক প্রণোদনা দেয় বিগ বিজনেসের অনুকূলে। রাষ্ট্রগুলো জনগণের ট্যাক্সের পয়সা দিয়ে রক্ষা করে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। ভেঙ্গে পড়ে অথাকথিত গ্লোবালাইজেশনের প্রতি সচেতন মানুষের আস্থা। আন্তর্জাতিক লেনদেনের নিয়মগুলো বদলেযায় অনেকটা। ধনী রাষ্ট্রগুলো ঘরের দিকে নজর ফিরিয়ে আনে। উত্থান হয় লোকরঞ্জনবাদের।

২০০৮-০৯ সালের আন্তর্জাতিক আর্থিক সঙ্কটের পর ইউরোপ এবং আমেরিকার রাজনৈতিক শক্তি বলয়গুলো ভেঙে পড়তে থাকে। দিকে দিকে উগ্র ডানপন্থিরা রাজনৈতিক ভীত পেতে থাকে। এরা বিশ্বায়নের বিরোধী। এরা অভিবাসীদের, সংখ্যালঘু ধর্মের মানুষের প্রতি ঘৃণা ছড়াতে থাকে। তারা মনে করে তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি তাদের কারখানাগুলো সস্তা শ্রমের দেশে নিয়ে গেছে ফলে তারা কাজের সুযোগ হারিয়েছে। তদুপরি অভিবাসীদের উন্নত দেশগুলোতে ঢুকতে দেয়ার ফলে যেটুকু কাজের ক্ষেত্র অবশিষ্ট ছিল তার উপরও অভিবাসীরা ভাগ বসিয়ে মজুরি কমিয়ে ফেলেছে। উগ্র ডানপন্থিদের এ অবস্থান অযৌক্তিক নয়। তবে তাদের যুক্তি প্রদর্শণের উপায় এবং ঘৃণা ছড়ানোর বিষয়গুলো অগ্রহণযোগ্য।এই উগ্রপন্থী, লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতি করেই উরোপ এবং আমেরিকার অনেক রাজনৈতিক দল সামনের কাতারে চলে এসেছে; ভাগ বসিয়েছে ক্ষমতায়। গতানুগতিক দলগুলো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানোর জন্য দলীয় নীতি পরিবর্তন করেছে বেশ স্পষ্টভাবে। ফলে ব্রিটেনে টোরিদের নেতৃত্বে হয়েছে ব্রেক্সিট, আমেরিকার ক্ষমতার শীর্ষে বসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

২০০৮-০৯ সালের আর্থিক মন্দা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি আরবিশ্বায়নের ফাঁক ফোকরগুলো। এডামস্মিথের মুক্তবাজার অর্থনীতির মূল শর্ত হচ্ছে, perfectly competitive market বা পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা। বিভিন্ন লাইসেন্স, পারমিট, শর্ত, কোটা, নেটওয়ার্ক এবং তথ্যের অসামঞ্জস্যের কারণে জগতে কোনকালে, কোনদেশে পূর্ণপ্রতিযোগিতামূলক বাজার পাওয়া যায়নি। ২০০১ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় তিন অর্থনীতিবিদকে, জর্জআকেরলফ, মিশেল স্পেন্স এবং জোসেফ স্টিগলিজকে। এই তিন অর্থনীতিবিদ তাদের বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন শুধু যথার্থ তথ্যের অভাবে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে বদলে যায়; বাজার পূর্ণপ্রতিযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়। এডামস্মিথকে ভুল সময়ে, ভুল বাজারে প্রয়োগ করা হয়েছে পুঁজিবাদীদের মুনাফা বৃদ্ধির ক্ষেত্রটা বড় করার জন্য। বার্লিন দেয়াল ভেঙে দিয়ে ইউরোপের শক্তিশালী সমাজ বাদী অর্থনীতির বিপরীতে রিগ্যান ও থ্যাচার মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রবর্তন করে ধনী দরিদ্রের বৈষম্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। ধনী বিশ্বের সাধারণ শ্রমিকের আয় বিগত শতাব্দীর ৮০’র দশকে যাছিল তা থেকে কমে গিয়েছে।

বর্তমান পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের যে সম্পদ রয়েছে তা আছে মাত্র ২৬ জন ধনী ব্যাক্তির হাতে; ধনী১০% মানুষ পৃথিবীর ৮৫% সম্পদের মালিক আর দরিদ্র ৯০% মানুষের হাতে রয়েছে মাত্র ১৫% সম্পদ।

রিগ্যান থ্যাচার প্রবর্তিত মুক্তবাজার অর্থনীতির আরেক প্রধান নীতি হচ্ছে বেসরকারীকরণ। উদ্দেশ্য পুঁজিবাদীদের শক্তিশালী করা। মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবর্তকেরা মনে করেপ্ রশাসকেরা দুর্নীতি করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় করে। বেসরকারী খাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছেড়ে দিলে তা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা হবে, উৎপাদন বাড়বে, মানুষের প্রয়োজন মিটবে। রাষ্ট্রের অধীনে যত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল তা ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হতে থাকে। বার্লিন দেয়াল ধ্বংসের পর এই প্রক্রিয়া শুধু ব্রিটেন আর ইউরোপেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও বিরাষ্ট্রীকরণ নীতি গ্রহণ করতে থাকে। সুপার পাওয়ার আমেরিকা এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে খাদ্য ও অর্থ সাহায্য দেয়ার শর্ত হিসেবেবে সরকারীকরণ নীতি চাপিয়ে দেয়। এক সুপারপাওয়ারের বিশ্বে এই নীতি দেশে দেশে গ্রহণ করার ফলে রাষ্ট্রের মালিকানায় থাকা শিল্প ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পানির দরে বেসরকারি খাতে চলে যায়। রাষ্ট্রের সম্পদের মালিক হয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। এই সম্পদ দিনে দিনে বিপুল হয়ে ওঠে। দেশে দেশে রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে এই হঠাৎ পাওয়া সম্পদের মালিকেরা।

রিগ্যান থ্যাচার প্রবর্তিত মুক্তবাজার অর্থনীতি সাধারণ মানুষের দুর্দশা বাড়িয়েছে; তাদের দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর করেছে। দারিদ্রকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ খাদ্যের মূল্যমানে বিচার করলে (যা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা করে থাকে) দেখা যায় দারিদ্র্যের হার কমেছে। এও সত্য যে মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে দেশে দেশে পুষ্টিহীনতা কমেছে, শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, বেড়েছে স্বাক্ষরতা ইত্যাদি। এই প্রাপ্তি কি ন্যায্য, নাকি আরও বেশি অর্জন পৃথিবীর মানুষ করেছিল যার ভাগ তারা পায়নি? এসব প্রশ্ন করতে হবে। সুষ্ঠু বণ্টন ব্যবস্থা থাকলে ৮৫% সম্পদ মাত্র ১০% মানুষের হাতে জমা হতে পারত না। এই করোনাকালে দেখছি নিম্নআয়ের মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের নিরাপদ কাজ নেই,সঞ্চয়নেই,খাদ্যের মজুদ নেই,স্বাস্থ্যের বীমা নেই। তথাকথিত মুক্ত বাজার অর্থনীতি সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি। বর্ণবৈষম্য, আয়বৈষম্য, সম্পদ বৈষম্য সারা পৃথিবীতে প্রকট হয়ে উঠেছে ঠিক সেই মুহুর্তে যখন মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে ক্ষুদ্রাতি  ক্ষুদ্র করোনাভাইরাস। দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার তিন ডজন দেশ‘ পৌরাণিককালের দুর্ভিক্ষ ’হুমকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা।

যতদিনপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করা না যায় ততদিন পর্যন্ত মুক্তবাজার অর্থনীতি থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাবেনা। পাওয়া যাবে শুধুই অর্থনৈতিক বৈষম্য। তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি আর নিওলিবেরাল রাজনীতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে মূলমন্ত্র হবে সাধারণ মানুষের কল্যাণ, ধনীব্যবসায়ের কল্যাণ নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও  সেবার উৎপাদন ও বণ্টনের নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই রাষ্ট্রের হাতে থাকতে হবে।

মানুষের মৌলিক প্রয়োজন – খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই সরকারের তথা রাষ্ট্রের হাতে থাকবে। নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে থাকা মানে এই নয় যে সেখানে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ থাকবে না। সরকারের নিয়ন্ত্রণ মানে হচ্ছে, বেসরকারি খাতের ভূমিকা এত বেশি হবে না যে তারা পণ্য ও সেবার যোগানের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক সঙ্কটের পর ব্রিটেন, আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যসেবা, রেল, ইন্টারনেট, জ্বালানি ইত্যাদি রাষ্ট্রের মালিকানায় নিয়ে আসার দাবি জোরালো হয়েছে। আমাদের দেশে তথ্য প্রযুক্তির উপর সরকারের যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে সাধারণ মানুষ যৌক্তিক দামে ইন্টারনেট এবং টেলিফোন সেবা পাচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন সেবা ও দ্রুতগতিতে ডিজিটালাইজ করা সম্ভব হচ্ছে। আভ্যন্তরীণ এবং রফতানি বস্ত্রের উৎপাদন এবং বণ্টন পুরাটাই বেসরকারি খাতে রয়েছে। তা সত্ত্বেও বাজারে যথেষ্ট প্রতিযোগিতা থাকার কারণে দেশের মানুষ অন্যান্য দেশের তুলনায় কম খরচে কাপড়-চোপড় কিনতে পারছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নির্বিচারে দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করার ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করছে বেসরকারি খাত। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালেরা ষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করার পর দলীয় গঠনতন্ত্রে এবং জাতীয় সংবিধানে সমাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনলেও তার বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে। সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ পুঁজিবাদী দেশ নয়, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দেশ। দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি চলবে এই দুই মূলমন্ত্র অনুসারে। বাস্তবে তা হচ্ছে না। গণতন্ত্র শুধু মুখে, দৈনন্দিন জীবনেনেই। দেশের মানুষ গণতন্ত্র বলতে বোঝে শুধু নির্বাচন। সমাজতন্ত্র মুখেও নেই। এই শব্দটি কেউ উচ্চারণ করেনা; লেখে না। এ নিয়ে সামাজিক আলোচনা ও একেবারে অনুপস্থিত। প্রকৃত পক্ষে দেশে চলছে ধনতন্ত্র।করোনাভাইরাস বদলে দিচ্ছে দেশ-বিদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি। বড় রকমের পরিবর্তন আসবে বিশ্ববাণিজ্যে, বিশ্বায়ণের কার্যক্রমে। বিভিন্ন দেশ অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হবে। “চাচা আপনা প্রাণ বাঁচা” নীতি বেশি বেশি গ্রহণ করবে– এমনই ভাবছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল। করোনা পরবর্তীকালে বাংলাদেশকেও নিজের দিক দেখতে হবে। নির্বিচারে মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করা যাবে না। মুক্ত বাজার সেখানেই গ্রহণ করা যাবে যেখানে বাজারে যথেষ্ট প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা পাওয়া বা তৈরি করা অসম্ভবের কাছাকাছি। বাংলাদেশকে সমাজতন্ত্রের আলোকে বাজার দেখতে হবে; দূর করতে হবে ইতোমধ্যে সৃষ্ট ব্যাপক আয়ও সম্পদ বৈষম্য।

খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষা এবং পরিবহণ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি খাতে রয়েছে। দেশে প্রচলিত আইন কানুনের ফাঁক ফোকর ব্যবহার করে আমলা এবং ব্যবসায়ীরা মিলে এমন সব নিয়ম কানুন তৈরি করেছে যে খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষা এবং পরিবহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনতন্ত্র সাধারণ মানুষকে শোষণ করছে সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘকাল সামরিক শাসন এবং অরাজনৈতিক ও দেশবিরোধীদের দ্বারা দেশের শাসনকার্য পরিচালনা হওয়ার ফলে রাজনৈতিক চর্চার অভাব হয়েছে।

এখনও সে অভাব পূরণ হওয়ার লক্ষণ নেই। সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার অভাবে দেশে বিগত ৪/৫ দশকে যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হয়নি। ফলাফল দেখা যাচ্ছে বর্তমান নেতাদের যোগ্যতার অভাবে আমলা আর ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্র ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে ধনতন্ত্রের।ধনতান্ত্রিকদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে সবার আগে চাই সুস্থ রাজনীতির চর্চা।

সেই সঙ্গে অর্থনীতির স্তম্ভগুলোর (খাদ্য,বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি) উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ। অর্থনীতির মূল স্তম্ভগুলো কি উপায়ে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এনে দূর করা যায় ধনতান্ত্রিক শোষণ ব্যবস্থা; গঠন করা যায় সুস্থ সমাজ সে বিষয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পুর্ণতো বটেই এমনকি বাড়তি খাবার রফতানী হয় প্রায়ই। তবুও অনেক মানুষ তিন বেলা যথেষ্ট খাবার পায়না; কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পায় না। কৃষক যে দামে বিক্রি করে তার ৫/১০ গুন বেশি দামে ভোক্তাকে তাবা জার থেকে কিনতে হয়। এর কারণ একটাই – দুর্বল বণ্টন ব্যবস্থা। আমলা এবং মধ্যস্বত্তভোগীরা যৌথভাবে এই অবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছে। চাল, দাল, সবজি, মাছ, মাংস ইত্যাদি কেনাবেচার মধ্যে চাল ছাড়া আর কোনক্ষেত্রে সরকারের কোন অংশগ্রহণনেই। পুরো ব্যবস্থাটাই বেসরকারি খাতে। বেসরকারি খাতে প্রায় পুরোটা থাকার ফলে ব্যবসায়ীরা লুটেরা হয়ে উঠতে পেরেছে। ধান ও চাল দেশে যা উৎপাদন হয় তার দশ ভাগের এক ভাগের ও কম পরিমাণ কিনে থাকে সরকার। এই কেনার মধ্যে ও রয়েছে আমলাতন্ত্র, মধ্যস্বত্তভোগীদের ভূমিকা। আমলারা এমন সব নিয়মকানুন বানায় যা সরকারকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কিনতে বাঁধার সৃষ্টি করে। ফলে বিভিন্ন সময়ে দেখা যায় কৃষক ন্যায্য দাম পায় না এমনকি উৎপাদন খরচের চেয়েও কমদামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হয়। বণ্টন ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোর জন্য বর্তমান সরকার কৃষকের জন্য অনেক রকমের ভর্তুকি ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করলে ও কৃষকের অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছেনা। মধ্যেস্বত্তভোগীদের দৌরাত্ব কমাতে হলে কৃষি পণ্য ক্রয় এবং বিতরণ কার্যক্রমে সরকারের অংশগ্রহণ অনেক বেশি বাড়াতে হবে।অনেক বাড়াতে হবে গুদাম, বিতরণের জন্য ট্রাক, লড়ি ইত্যাদি। কৃষিপণ্য বণ্টন প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি খাতে থাকলে কৃষক এবং ভোক্তা শোষণ চলতেই থাকবে।

করোনাভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়লে সর্দি, জ্বর, কাশি– এসব উপসর্গ নিয়ে যারা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন তাদের চিকিৎসা দেয়নি বেসরকারি হাসপাতালগুলো। অনেক ডাক্তার নিজেদের চেম্বার বন্ধ করে দিয়েছেন।

সরকারি হাসপাতালেও ডাক্তারগণ অনুপস্থিত থেকেছেন বিভিন্ন অজুহাতে। অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেছে অনেক মানুষ। চিকিৎসা পায়নি। চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু হয়েছে অনেকের। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল করোনার ভয়ে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা দেয়া বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার দুই তৃতীয়াংশ বেসরকারি খাতে। সরকারি খাত দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করে স্বাস্থ্য প্রশাসকরা। বেসরকারি খাত মুনাফা লুটে অহেতুক অস্ত্রপচার, অপ্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা,বেশি বেশি ওষুধ দেয়া এবং অহেতুক হয়রানির মাধ্যমে যার প্রতিটিই মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। মানুষ চিকিৎসা পায়না। স্বাস্থ্যখাতে অরাজকতার অন্যতম প্রধান কারণ সরকারি ডাক্তাররা নামমাত্র সময়সরকারি দফতরে কাজ করে। তারা প্রধানত কাজ করেন বেসরকারি হাসপাতালে এবংনিজেদের চেম্বারে।তারা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না দিয়ে রোগীদের যেতে বলেন নিজের চেম্বারে বা যে বেসরকারি হাসপাতালে তিনি নিজে কাজ করেন সেখানে।সরকারি হাসপাতালকে তারা মুরগী ধরার কেন্দ্রে পরিণত করেছেন।

বেসরকারি হাসপাতালগুলো সরকারের সঙ্গে সঙ্গে করোনা মোকাবেলায় কাজ করলে দেশে চিকিৎসা সঙ্কট তৈরি হত না। করোনাভাইরাস আমাদের চিকিৎসাসেবার দুর্বল হাল চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। আর নয়, এই অবস্থা থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের ভূমিকা বাড়াতে হবে। দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। দেশের সবগুলো হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা অনেক অনেক গুণ বৃদ্ধি করতে হবে। যথেষ্ট পরিমাণে রোগনির্ণয়ে এবং সেবাদানের যন্ত্রপাতি সরকারি হাসপাতালগুলোতে সুলভ করতে হবে। সরকারি ডাক্তারদের বেসরকারি হাসপাতালে এবং ব্যাক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা দেয়া বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসা গবেষণা, ওষুধ, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা সেবায় ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্যাদি উৎপাদনের জন্য সরকারকে অনেক অনেক বিনিয়োগ করতে হবে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে নিতে হবে যেন কোন নাগরিককে চিকিৎসারজন্য বিদেশে যেতে না হয়।শুধু চিকিৎসাখাতের দুর্নীতিরোধ করে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে এ কাজ আগামী ২/৫ বছরের মধ্যে সম্ভব। বাড়তি পয়সারও প্রয়োজন পড়বেনা। চাই শুধু যোগ্য নেতৃত্ব।

শহরের একটা বাসস্থান এখন মধ্যবিত্তের স্বপ্নের বাইরে। প্রবাসীদের মধ্যে যারা উচ্চ বেতনে কাজ করেন, যারা বড় কর্পোরেট হাউসের ম্যানেজার, মোটামোটি সাইজের ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা আর যারা দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত তারাই শুধু শহরে একটা বাসস্থানের কথা ভাবতে পারেন, কিনতে বা তৈরি করতে পারেন। এমনতো কথা ছিলনা। বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সময় একটা ঠিকানা পাবার স্বপ্ন দেখেছিল। ১৩ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ বলে ছিল গ্রামে গ্রামে বহুতল দালান করে এবং তার সংলগ্ন খেলার মাঠ,স্কুল,কমিউনিটি সেন্টার করে গ্রামে পৌঁছে দেয়া হবে শহরের সুবিধা, বাড়ানো যাবে কৃষির জন্য জমি। সরকার পরবর্তীতে একটা প্রকল্পও শুরু করেছিল। সে প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা কেউ জানেনা। বেড়ে চলছে গৃহহীন মানুষের মিছিল। সরকারের হিসেব মতে, দেশে এখন ৫০ লাখ মানুষ গৃহহীন; ৭৪% থাকে কাঁচা ঘরে।

বিগত কয়েক বছরে ২/৩ লাখ গৃহহীন মানুষের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে সরকার যা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। শহরগুলো থেকে কারখানা বের করে নদীর আর সমুদ্রের ধারে নিয়ে যেতে পারলে কমবে শহরের উপরে জনসংখ্যার চাপ। তাতে একদিকে শহরে, নগরে ট্রাফিকজ্যাম, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ এবং জমির দাম কমবে; নগরের প্রকৃতি স্বাভাবিক হবে, গ্রামীণ জনপদে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানুষ বসবাস করতে পারবে; গ্রামীণ জমির দাম বেড়ে সারাদেশে কিছুটা ভারসাম্য তৈরি হবে। গ্রামে গ্রামে বহুতল দালান তৈরি করে দেয়ার প্রকল্পটা ফার্স্ট ট্রাকে নিয়ে আসতে হবে। করোনা পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে হলে অবকাঠামো নির্মাণে প্রচুর ব্যয় করতে হবে। নিম্নআয়ের নাগরিকদের জন্য, দুঃস্থদের জন্য ঘর-দুয়ার বানিয়ে দিলে একই সঙ্গে মানুষের দুঃখ-দুর্দশার লাঘব করা যাবে অন্যদিকে অবকাঠামো নির্মাণ করে অর্থনীতির চাকায় দ্রুত গতি দেওয়া যাবে। 

সরকার দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে; অবস্থা সম্পন্ন মানুষদের জন্য কাজ করবে বেসরকারি খাত। এতে বাজারের ভারসাম্যবজায় থাকবে; লুটপাটের সুযোগ কমে যাবে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের আরেকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতে। রেললাইন সরকারের হাতে থাকলেও এরযে হাল তাতে মধ্যবিত্ত রেলেভ্রমণ বাদ দিয়েছে বহু আগে। তাছাড়া সব এলাকায় রেললাইন নেই।

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার পর রেলের উন্নতি নিয়ে অনেক কথা বলেছে। এর অনেক উন্নতি হবে এমন ধারণা করেছিল অনেকেই। বাস্তবে বিগত ১১ বছরে যৎসামান্য উন্নতি হলেও এখনো রেল ব্যবস্থার উপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরেনি। রেল কম খরচে, কম সময়ে, নিরাপদে অনেক বেশি মানুষ একসঙ্গে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে। উন্নত দুনিয়া রেলের উপর নির্ভর করে। এখানেও নতুন করে হাজার হাজার কিলোমিটার রেললাইন এবং অনেক রেল গাড়ি দরকার। দরকার তাদের সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা। রেলের টিকেট কালোবাজারীর আখড়া। এসব থেকে রেলকে মুক্ত করা গেলে মানুষের জীবনে স্বস্তি আসবে।

বাস বর্তমানে গণমানুষের প্রধান বাহন। এই বাহনটি মালিক-শ্রমিকের গাজোয়ারী এবং মাত্রাতিরিক্ত সড়ক দুর্ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে এক আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। বাসে ভ্রমণ না করেও উপায় থাকেনা। আর ভ্রমণ করলে শ্রমিকদের দুর্ব্যবহার, অত্যধিক ভাড়া গুণতে হয়। দেশে এক সময়ে পর্যাপ্ত সরকারের মালিকানাধীন বিআরটিসি বাস ছিল। মহাসড়কে এবং নগরে দুই ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত পরিমাণ বিআরটিসি বাস থাকায় বেসরকারি বাসগুলো সাধারণ মানুষের উপর চড়ে বসতে পারেনি। ২০০১ সালে গঠিত জামায়াত-বিএনপি সরকারের সময় যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন নাজমুল হুদা। তিনি বিআরটিসিবাসগুলো বিভিন্ন অজুহাত তুলে পানির দরে বেসরকারি ব্যাক্তিদের কাছে বিক্রি করে দেন।

কয়েকদিন পর লোক মুখে খবর রটে গেল যে সেই বিক্রিত বাসগুলোর বেশির ভাগের মালিক হয়েছেন তিনি নিজে এবং তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী মির্জা আব্বাস। বিআরটিসি বাস আর জনসেবায় পাওয়া গেল না। বর্তমান সরকার কয়েকবার উদ্যোগ নিলেও স্বার্থান্বেসী মহলের স্বার্থ রক্ষাকরে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিআরটিসি বাস রাস্তায় দেখা গেল না। পর্যাপ্ত পরিমাণে বিআরটিসি থাকলে সড়ক পরিবহণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে; বন্ধ হবে যাত্রীদের প্রতি দুর্ব্যবহার, অত্যাচার, অতিরিক্ত ভাড়া; নিরাপদ হবে সড়ক পথে ভ্রমণ।

দেশে সবচেয়ে অবহেলিত হচ্ছে নৌপথ। অথচ নৌপথে যাত্রী এবং পণ্য পরিবহণের খরচ কয়েক গুণ কম। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদ-নদী,খাল-বিল, জালের মত ছড়িয়ে আছে। দেশের যেকোন জায়গায় নৌপথে যাওয়া যায়। জাপানিরা কয়েক দশক ধরে এদেশে নদীতে বাঁধ দিয়ে সড়ক তৈরি করার জন্য ঋণ দিয়েছে নিজেদের বানানো গাড়ি বিক্রির উদ্দেশ্যে। আমরাও দুর্নীতির লোভে বিগত শতাব্দীর ৮০ আর ৯০’র দশকে প্রচুর খাল, নদী হত্যা করেছি সড়ক বানিয়ে তার উপর জাপানি গাড়ি চালিয়ে অনেক উন্নত হয়ে গেছি ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। এখন সময় বিষয়গুলো নতুন করে ভেবে দেখার। যেসব নদী,খাল বাঁধ দিয়ে বন্ধ করা হয়েছিল সেগুলোর বাঁধ কেটে সেতু করে নদী বাঁচানোর উপায় বের করা দরকার। বাঁধগুলোর কারণে অনেক নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে গিয়েছে। ড্রেজিং করে নদীগুলোকে, নৌ-পথকে বাঁচিয়ে তুলতে হবে। কারখানাগুলো সব সরিয়ে নিতে হবে নদী বা সাগরের ধারে যাতে পণ্য পরিবহণ কম খরচে করা যায়। কারখানা বানানোর পরিকল্পনা এমনভাবে দরকার যাতে সড়ক পথে পণ্য পরিবহণের একদম প্রয়োজন না হয়। বাড়াতে হবে নৌ চলাচলের রুট। আধুনিকায়ন দরকার লঞ্চ, স্টিমার,জাহাজে।

দেশের বেশির ভাগ স্কুল, মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয় এখন বেসরকারি খাতে। সরকারি স্কুলে যারা পড়ে তাদের আবার নোট বই ও গাইডের জন্য বেসরকারি খাতের উপর নির্ভর করতে হয়। তাছাড়া রয়েছে প্রাইভেট টিউটর এবং কোচিং সেন্টার। সরকারি স্কুলগুলোর ক্লাসে লেখাপড়া হয়না বলেই সকলে মনে করে। শিক্ষা ব্যবস্থা এখন অনেকখানী বেসরকারি খাতের উপর নির্ভরশীল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিভাগের সম্পর্কে সাধারণ মানুষ মনে করে যে তারা সনদ বিক্রি করে,পড়ায় না, শেখায় না।পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেয়া বেসরকারিকরণ প্রকল্পের কারণে চিকিৎসা সেবার মত শিক্ষাও পণ্যে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা এখন শুধু জীবিকা অর্জনের উপায়, জ্ঞানার্জনের বিষয় নয়। সত্যিকারের জ্ঞানার্জন না হওয়ায় পিছিয়ে পড়ছে সমাজ; বাড়ছে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, কুসংস্কার, গুজব। স্বাধীনতার পর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের বিনিয়োগ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক অনেক কম হয়েছে। যদিও গত ১০/১২ বছরে পাবলিক শিক্ষায়তনে সরকারের বিনিয়োগ আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে তবুও তা যথেষ্ট হয়নি।শিক্ষকদের দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে, দুর্নীতির কারণে সরকারের বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা পাওয়া যায়নি। শিক্ষকদের রাজনীতি এবং দুর্নীতি এখন মহামারী পর্যায়ে। এসব রুখতে হবে।

বর্তমান সময়ে চিকিৎসা এবং শিক্ষাদান অন্যতম প্রধান দুর্নীতিগ্রস্ত পেশায় পরিণত হয়েছে। কোচিং সেন্টার, নোট বই আর গাইড বই বাণিজ্য চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে। লেখাপড়া এবং সুকুমার বৃত্তির চর্চা শিক্ষার্থীরা শুধুই শিক্ষায়তনে করবে। শিক্ষার্থীদের যেন ঘরে ফিরে পড়তে না হয়। ঘরে ফিরে তারা বিশ্রামও বিনোদনে সময় কাটাবে; পরিবার-পরিজন আর সমাজের সেবায় ব্যয় করবে। শিক্ষায়তন শুধু ক্লাসরুমে পাঠদানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবেনা। শিক্ষায়তন শিক্ষার্থীর প্রাণের মেলায় পরিণত করতে হবে। ছাত্রছাত্রীরা যেন হাতে-কলমে শিখতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। তার জন্য প্রতিটি শিক্ষায়তনে পর্যাপ্ত পরিমাণে গবেষণাগার এবং তা চালিয়ে রাখার জন্য যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণের পর্যাপ্ত সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে।গবেষণায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। গবেষণার জন্য সরকারের সাহায্য অনেক গুণ বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে সরকারি স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়।বন্ধ করতে হবে মাদ্রাসা আর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের দৌরাত্ব। এই দুই ধারায় শিক্ষিতরা দেশের কাজে আসেনা। মাদ্রাসাশিক্ষিতরা দেশকে, সমাজকে পেছনে টানে।

অরাজকতায় বসবাস করতে করতে আমরা ভুলে গেছি কি করে সুস্থ সমাজ গঠন করা যায়; কি করে সবাই মিলে সুন্দরভাবে একসঙ্গে বাঁচা যায়।আমাদের সমাজে এত কিছুর দরকার নেই। করোনাকালে প্রায় দেড় মাস বাসায় থেকে নতুন করে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উপলব্ধি করেছি সুন্দরভাবে জীবনধারণের জন্য অনেক কিছুর দরকার নেই। জীবনের জন্য দরকার একটা বাসস্থান, সুষমখাদ্য, অসুখ হলে চিকিৎসা, মানসম্পন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, পরিচ্ছন্ন পোশাক,  সুশৃঙ্খল ও নিপীরণহীন পরিবহণ, দুষণমুক্ত পরিবেশ। ভেজালবিহীন খাবা রখেলে অসুখ-বিসুখ কম হয়, চিকিৎসাও কম লাগে। তারপর লাগে শরীর ঠিক রাখতে শরীরচর্চার কেন্দ্র, পরিচ্ছন্নপার্ক; সুকুমার মনোবৃত্তির খোরাক সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, কবিতা, নাটক আর বই। ডজন ডজন জামা কাপড় দরকার নেই। সপ্তাহান্তে দামি রেস্তোরাঁয় বন্ধুদের নিয়ে পার্টি –দরকার নেই; বরং বারবার মনে হয়েছে আজ যদি অমুক বন্ধু তার পরিবার নিয়ে বাসায় আসত! এয়ারকন্ডিশন–বাংলাদেশের আবহাওয়ায় শুধুই বিলাসিতা। দামী ঘড়ি, স্যুট, গহনা, শাড়ি – বাহুল্য। গাড়ি একটা থাকলে সুবিধা– তবে রাস্তার জ্যামের বিনিময়ে তা চাইনা। আর কী লাগে জীবনধারণ করতে?

করোনা উত্তর পৃথিবী আগেরম তহ বেনা।বদলে যাবেঅনেককিছু –

মানুষের সঙ্গে মানুষের, দেশের সঙ্গে দেশের সম্পর্কগুলো বদলাবে অনেক। অভ্যন্তরীণ সম্পর্কগুলো বদলে যাচ্ছে ইউরোপে। করোনা উত্তর অর্থনৈতিক সঙ্কট চরম আকার ধারণকরলে অনেক দেশ বেড়িয়ে যাবেই উরোপিয় ইউনিয়ন থেকে। আমেরিকাকে টেক্কা দিয়ে উঠে যাচ্ছে চীন। করোনা পরবর্তী পৃথিবীর প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হবে চীন। বদলে যাবে বিশ্ব ব্যবস্থা। বাংলাদেশকে এখন আর কোন দেশের ধর্না ধরে চলতে হয়না। অর্থনীতি আরও অনেক সুশৃঙ্খল করতে হবে। পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেয়া নির্বিচার মুক্তবাজার অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় অর্থনীতি সাজাতে হবে। 

একপাল পুঁজিপতি নির্ধারিত ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দরকার নেই। বৈষম্যহীন সাদামাটা, বিজ্ঞানভিত্তিক, উন্নত সংস্কৃতির, সাম্যবাদী বাংলাদেশ চাই। এ চাওয়া আজকের নয়। এই চাওয়া পাওয়ার জন্য শহীদ হয়েছে ৩০ লাখ মানুষ। সামনে বাজেট। এবারের বাজেট তৈরি হোক সকলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য নিয়ে।

কলাম লেখক ও পরামর্শক



আরও পড়ুন

×