বাসযোগ্য পৃথিবীর প্রত্যাশায়
মো. আব্দুল কাদের খান
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২০ | ০০:২৮ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
মানুষ আজ করোনার কারণে অসহায়। এতদিন আমরা জানতাম মানুষ প্রাকৃতিক দুযোর্গের কারণ বা মানুষসৃষ্ট যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে অসহায় ও বিপন্ন। কিন্তু আজকে আমরা দেখছি, একটি সাধারণ ভাইরাস হাজার বছরের জ্ঞান ও বিজ্ঞান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবিস্কারকে ধ্বংসের দিকে নয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানী ও গবেষকরা এখনও বুঝে উঠতে পারছে না কিভাবে এ ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে আনবেন।
ভাইরাসটি জন্মের পর হতে ইতোমেধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১২ বার তার আকার বা ধরন পরিবর্তন করেছে। যদি তার ভয়ংকর রূপ আরো পরিবর্তীত করতে থাকে তাহলে মানবসভ্যতার কি করুণ পরিণতি ঘটতে পারে! আমরা বিশ্বাস করতে পারি এর প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে সক্ষম হবো। তবে ততদিন আমাদেরকে এ ভাইরাসের সাথে যুদ্ধে টিকে থাকতে অক্ষরে অক্ষরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা সরকার ঘোষিত নিয়ম মেনে চলতে হবে।
প্রতিটি ধর্মের পবিত্র স্থানসমূহ সময়িক সময়ের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বা সীমিত করা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিমান চলাচল, সুপারমল, অফিস, খেলাধুলা। এককথায় আমারা বলতে পারি পৃথিবীকে সাময়িক সময়ের জন্য স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। উনিশ শতকের প্রথমভাগে ম্যালথাসের তত্ব অনুসারে স্বাভাবিক নিয়মে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে খাদ্যসংকট এমনকী দুর্ভিক্ষ অবশ্যম্ভাবী। এই কারণে ম্যালথাস মনে করতেন যে, দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের জন্য জন্ম নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষ মারা পড়বে এবং এভাবেই জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। এছাড়া সমসাময়িক সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রকৃতির ওপর বিরূপ আচারণ করলে প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেবে। তবে কি আমরা প্রকৃতির প্রতিশাধের পথে হাঁটছি?
এ ভাইরাস হতে রক্ষায় ও আমরা আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে যা করতে পারি তা হলো:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকার ঘোষিত নিয়ম মেন চলা, কারণ মনে রাখবেন আপনি যত ভ্রমণ করবেন ভাইরাস তার চেয়ে ৭০ গুণ জায়গা বেশি ভ্রমণ করছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি কার্যক্রমের মতে পৃথিবীতে খাদ্য ঘাটতির সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে, তার জন্য এ বছর সর্বোচ্চ খাদ্য উৎপদনে সকলের দায়িত্ব পালন করা অথাৎ প্রত্যেকের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে খাদ্য উৎপাদন করতে হবে।
আপদকালীন সমাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসাবে সাধ্যমত প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো ও তাদের খোঁজ খবর নেওয়া।
আগামীতে উন্নত দেশের পাশাপাশি সকলের উচিত প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা।
প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় ২৬০ মিলিয়ন টন প্ল্যাষ্টিক উৎপাদন হয়, যা মানবসভ্যতার জন্য খুবই ভয়ংকর এবং এগুলো কমানোর উদ্যোগ এখনই গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় প্রাকৃতিক বির্পযয় রোধ করা দূরহ হয়ে পড়বে।
গ্রিনহাউস গ্যাস যাতে আর না বাড়ে তা বন্ধে উন্নত দেশসমূহের এখন থেকে প্রয়াজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও এর কারণে ইতোমধ্যে বায়ুমণ্ডলের যে ক্ষতিসাধিত হয়েছে তা প্রতিরোধে সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে।
সকল কার্যক্রমে যতদ্রুত সম্ভব অনলাইন প্ল্যাটফরম ব্যবহার করা, যাতে একে অপরের সংস্পর্শে কম আসতে হয়। যেমন- একজন রোগী ডাক্তারের কাছে একবারই যেয়ে তার সবকিছু অনলাইনে লিপিবদ্ধ করবে। পরবর্তী সময়ে মোবাইল বা মেইলের মাধ্যমে সকল সেবা গ্রহণ করবে। এমনকি টেস্ট রিপোর্ট আনার জন্যও তাকে আর যেতে হবে না, তা মেইলের মাধ্যমে রোগী ও ডাক্তারের কাছে পৌছে যাবে।
বিভাগীয় শহরে সাধারণত অফিস ও বিদ্যালয়ের বাইরে সমাবেশ, সেমিনার, কর্মশালা, সাধারণ সভা, সুপারমলে যাওয়া ইত্যাদি অন্যতম যা অধিকাংশই অনলাইনে করা সম্ভব।
মানুষ চাকরির পরীক্ষা ও কর্মের জন্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করে। তাই চাকরির পরীক্ষা জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
ভাইরাস থেকে বাঁচতে সরকারের সকল বিভাগসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এর জন্য নিজেদের মধ্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং প্রতিটি শিক্ষককে এ কার্যক্রমের আওতায় আনতে হবে।
আমরা চাই এমন একটা বাসযোগ্য পৃথিবী যেখানে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যাতে এমন মহামারির দিকে আর ধাবিত না হয়। এজন্য প্রয়োজন এই মহামারি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আগামীতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো। দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ। সবাই মিলে শপথ নেই এই পৃথিবীকে বসবাসযোগ্য রাখবোই।
পরামর্শক, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা); মতামত লেখকের নিজস্ব