চীনকে জবাবদিহি করতেই হবে
স. আ. ম. শাহজাহান
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০ | ০৪:২৫ | আপডেট: ২৩ মে ২০২০ | ০৪:৪৭
অবধারিতভাবে কোভিড-১৯ মহামারির সংক্রমণ চীনের শুরু থেকে পরিচালিত কর্মকাণ্ড, দায়-দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে, আসতে বাধ্য হয়েছে। কোভিড-১৯ বা নোভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়ার পরে যে আতঙ্ক গ্রাস করেছে এই সমগ্র- গ্রহটিকে, সারা-বিশ্বের প্রতি বর্গ ইঞ্চি ভূমিকে, তাতে চীনের দায় কতোটা সেই প্রশ্ন এখন বিলিয়ন টাকার প্রশ্ন।
ডিসেম্বরের শেষ দিনটিতে ছড়িয়ে পড়েছে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে, যদিও তা স্বীকার করেন না চীনা বিজ্ঞানী ও প্রশাসকেরা। তবে এর আগেও, বছর-দশেক হলো, উহানের ইনষ্টিটিউট অব ভাইরোলজি থেকে একটা গবেষণার জন্য পালিত-ভাইরাস বিজ্ঞানীদের চরম-দায়িত্বহীনতার সুযোগে ল্যাবরেটরির বাইরে বেরিয়ে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রচুর মানুষের প্রানহানি ঘটায়, সে খবর প্রকাশিত হয়েছিল-সেটা ছিল সার্স ভাইরাস। চীনা বিজ্ঞানীদের একাংশ সেই বেকুবপনার কথা স্বীকার করে নিয়েছিলেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে চীনের উহানের কোভিড-১৯ ভাইরাস ছড়ানোর ব্যাপারে একটা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত অনুষ্ঠানের প্রস্তাব রেখেছে। এরই মধ্যে 'নিউইয়র্ক পোষ্ট' পত্রিকার খবরে জানা গেল-জার্মান পত্রিকা 'ডের স্পিজেল' সূত্রের খবর অনুযায়ী গত ২১ জানুয়ারি চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুসের সঙ্গে কথোপকথনের সময় করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশ্বব্যাপি সতর্কতা জারি বিলম্বিত করতে চাপ দিয়েছিল চীন। জার্মানির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বিএনডি-বরাত দিয়ে পত্রিকাটি এ খবর প্রকাশ করে।
জার্মান গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, তথ্য গোপন করতে চীনের এমন তৎপরতার ফলে কোভিড-১৯ মেকাবিলার ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় নষ্ট করে ফেলেছে বিশ্ববাসী। তবে ডবিতউএইচও বলেছে, এ অভিযোগ 'ভিত্তিহীন ও অসত্য'।
চীন হাজার হাজার বছর আগেকার সভ্য জাতি। শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় এক উন্নত জাতি আমরা নিশ্চিতভাইে জানি তা। চীন যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুশীলনে কতোটা উন্নত ছিল সেটা সবারই জানা। কিন্তু কোভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রমণে তার দায়-দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ড আমাদের হতাশ করেছে। চীনে যখনই করোণা-ভাইরাস সংক্রমণ শুরু হোক না কেন, তখুনি তার সংক্রমণ বিশ্বব্যাপি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা কায়েমে পুরো প্রদেশটিকে (হুবেই প্রদেশ এলাকা) লক-ডাউন করে সারাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখলো না কেন? কেন হুবেই প্রদেশ এলাকা থেকে করোণাভাইরাস যাতে হুবেই-বাইরের একজন মানুষ বা অন্য-প্রাণীতে সংক্রমণের পথে কার্যকর 'বতকিং' কেন দিলো না? এর কোনো যৌক্তিক জবাব চীনের কাছে আছে কি! না নেই।
চীনের কোভিড-১৯ সংক্রমণের দায়-দায়িত্ব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও শতভাগ পরিচ্ছন্ন তদন্ত সম্পাদন করতে হবে- অবিলম্বে এবং স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের ও অন্যসব প্রযুক্তিবিদদের সহযোগিতায়। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে- চীন এই তদন্তের ধারে-কাছে দিয়ে যেত চায় না। কেন চায় না? তাদের ভাষ্য-চীনকে দুনিয়ার বিজ্ঞানীদের একাংশ ও মার্কিন প্রশাসন 'মিথ্যা-রিপোটের্র ভিত্তিতে দায়ী' বানাতে চায়।
আসলে চীন এখন নয়া-উপনিবেশবাদী ও নয়া-সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলে। মিয়ানমারের রাখাইনে ভয়ঙ্কর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সত্ত্বেও চীন তাদের সমর্থনে যা করেছে, তাতে আর কোনো উদাহরণ প্রয়োজন হয় না। কিন্তু করোনা ভাইরাসের নেপথ্য চিত্র নিয়ে জবাবদিহি করতেই হবে। কারণ কভিড-১৯ ভাইরাসআজ পুরো মানবসভ্যতার জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে। 'ট্রমা' কাকে বলে, 'ত্রাস' কাকে বলে বিশ্ব-সন্ত্রাস কারে কয়-দুনিয়ার-মানুষ আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সাউথ পোল-নর্থ পোল একাকার-মানুষের কান্নায় সমগ্র আকাশ-বাতাস ভারি। সে ভারি বোঝার ভার বহনের ক্ষমতা মানুষের শক্তির মধ্যে নেই।
সেদিন দেখা গেল দুই ভাইবোনের কান্নার এক দৃশ্য। ছাপা হয়েছে পত্রিকার পাতায়-এক বিদেশি বার্তা সংস্থারর আলোকচিত্র সাংবাদিকের ক্যামেরার লেন্সে তোলা। বাবা মারা গেছে সদ্য, হাসপাতালে কভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। মা গুরুতর অসুস্থ একই ভাইরাসের সংক্রমণে। বাড়ীতে ফিরে এসে মা একটা ঘরে একা আইসোলেশনে। বাড়ির পিতৃহারা ছেলে ও মেয়েটি চীৎকার করে কাঁদছে। মা-এর ঘরের বাইওে দাঁড়িয়ে। কে দেবে তাদের স্বান্ত্বনা! সমগ্র নিউইয়র্ক মহানগরে তখন কান্না আর লাশের মিছিল। এই কিশোর-কিশোরী ভাইবোনদুটিকে এতটুকু স্বান্তনা দেওয়ার মতো মানুষও নেই। হৃদয়-ভাঙ্গা ওই ছবি দেখার ক্ষমতা এই বিশ্বে কোনো দানবেরও হয়তো নেই।
মনে পড়েছে, আমাদের প্রিয়-কবি নির্মলেন্দু গুণ সম্প্রতি রচিত কবিতায় ক্রোধে, সখেদে কোভিড-১৯ নিয়ে লিখেছেন- 'তোকে তৈরী করলো কোন সে ইতর!' কবি বেদনায় নীল হয়ে যান, করোনা-ভাইরাসে প্রান-হারানো মানুষগুলো্র জন্য সহমর্মিতা প্রকাশ করতে গিয়ে বেশ খানিকটা ব্যক্তিগত আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন, হয়তো আক্ষরিক অর্থে অশ্রু সংবরনও করতে পারেন না। সে দশাই তো হবার কথা কবির। কবি মানুষকে ভালোবাসেন, মানুষ ও মানবতার ভালোবাসাই তো তার কাজ-সাহিত্য তখুনি সাহিত্য হয় যখন থাকে তাতে খাঁটি মানবপ্রেম। করোনা কিংবা তা ছড়িয়ে দেওয়ার দানবরা মানব জাতিকে ভালো বাসে না।
লেখক: সাংবাদিক