ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

করোনাকালে লেখাপড়া

করোনাকালে লেখাপড়া
×

ড. এম. জি. নিয়োগী

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২০ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ২৮ মে ২০২০ | ১০:২৮

সারাবিশ্বে করোনার যে সর্বগ্রাসী তাণ্ডব আমরা লক্ষ্য করছি, তাতে করে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে আমরা সত্যিই চিন্তিত। বিশেষ করে তাদের লেখাপড়া, তাদের ভবিষ্যত জীবন-জীবিকা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।

অধ্যাপক জাফর ইকবালও করোনাকালে লেখাপড়া নিয়ে আলোকপাত করেছেন, যা ১৫ মে দৈনিক সমকালে প্রকাশ হয়েছে। তিনি খুব সুন্দরভাবে ছাত্র-ছাত্রীরা করোনার সময়ে কিভাবে তাদের পড়াশুনা চালিয়ে নিতে পারে, তার কিছুটা রূপরেখা তিনি তুলে ধরেছেন। তবে বিষয়টি যতটা তিনি সহজভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন, আসলেই কি ততটা সহজ!

ব্যক্তিগতভাবে আমি জাফর ইকবাল সাহেবের একজন ভক্ত। তার লেখা, কথা-বার্তা, চিন্তা-চেতনা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি এক জায়গায় লিখেছেন - "কোনকিছু বলা বা শেখা লেখাপড়ার আসল উদ্দেশ্য নয়। লেখাপড়ার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে একজন ছেলে বা মেয়ের ভিতরে জানা বা শেখার ক্ষমতা তৈরি করে দেওয়া।" বিষয়টি কি সত্যিই তাই!

আমরা যুগ যুগ ধরে জেনে আসছি- লেখাপড়ার আসল উদ্দেশ্যই হচ্ছে জানা বা শেখা। শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীকে জানা বা শেখার ক্ষমতা তৈরিতে সাহায্য করেন। অর্থাৎ শিক্ষকের পাঠদানের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীকে বিষয়টি জানতে বা শিখতে সহায়তা করা।

এক জায়গায় তিনি যথার্থই বলেছেন- সব শিশুই কমবেশি জানা বা শেখার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। কথাটি শতভাগ সত্য। সব শিশুই সমান মেধা নিয়ে জন্মায় না। জনাব জাফর ইকবালকে আমরা সবাই জানি তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তার মত মেধা নিয়ে বাংলাদেশে শতকরা একজনও জন্মায় না। তার পক্ষে ঘরে বসে পুরো গণিত বইটা শেষ করতে হয়তো কোন সমস্যাই হবে না। কিন্তু বাকি ৯৯ ভাগ ছাত্র-ছাত্রীর কি হবে! তাদের ঘরে বসে পুরো গণিত বইটা শেষ করতে প্রতিক্ষণ শিক্ষকের সহায়তা প্রয়োজন হবে। কোচিং আজকে সারা বাংলাদেশে একটি বিতর্কিত বিষয়। কিন্তু কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোর সামর্থ্য আছে এমন একজনও কি আছেন- যিনি তার ছেলে-মেয়েকে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াচ্ছেন না!

আমি গত ২০ বছর ধরে আমার ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। একজন শিক্ষিত সচেতন নাগরিক হিসাবে আমি কেন আমার ছেলে-মেয়েকে এই কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোর থেকে বের হতে পারছিনা। কেন হাজার-লক্ষ্য টাকা খরচ করে সব বাবা-মা তাদের ছেলে-মেয়েদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াচ্ছেন! যেখানে কোচিং এর কুফল সম্বন্ধে প্রায় সব বাবা-মাই সমান অবগত।

একটি বিষয় না বলেই পারছি না, সেটি হলো আমাদের ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যত টার্গেট কি? বেশিরভাগই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বা ক্যাডার সার্ভিসের একটি সম্মানজনক চাকরী বা সরকারী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা বা এরকম কিছু! সেটি হতে হলে তাকে জিপিএ ফাইভ পেতে হবে। গোল্ডেন পেতে হবে। বিসিএস পরীক্ষায় অত্যন্ত ভাল ফলাফল করতে হবে। আজকে যারা মেডিকেল- ইঞ্জিনিয়ারিং এ চান্স পাচ্ছে বা বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসে সুযোগ পাচ্ছে, এমন একজনও কি আছেন যিনি কোচিং বা প্রাইভেট না পড়েই তা পেয়েছেন! কোচিং এর কুফল নিয়ে যারা সমালোচনা করছেন, তাদের ছেলে-মেয়েরা কি কোচিং বা প্রাইভেট না পড়েই বাংলাদেশের কাঙ্খিত প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেয়েছেন!

একটি সত্যিকারের গল্প বলি। একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস চলাকালীন একজন শিক্ষকের সাথে আমার দেখা করার প্রয়োজন হয়েছিল। আমি ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দোতালায় উঠে বারান্দায় অপেক্ষা করছি। শিক্ষক সে সময় ক্লাস নিচ্ছিলেন। লক্ষ্য করলাম ক্লাস চলাকালীনও ছাত্র-ছাত্রীরা গল্প-গুজব করছে। ক্লাসে যথেষ্ট রকম হৈ-চৈ হচ্ছে। হৈচৈতে স্যারের কথা ক্লাসের পিছন পর্যন্ত আসছেও না। অথচ স্যারসহ সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই।

অন্য একদিন সেই শিক্ষকের সাথে দেখা করতে তার কোচিং সেন্টারে যাই। তিনি তখন কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিচ্ছিলেন। সেখানে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। শুধুমাত্র শিক্ষকের কথা ছাড়া আর একটি কথাও শোনা যাচ্ছেনা। শিক্ষক যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথে পড়াচ্ছেন। হোম ওয়ার্ক দিচ্ছেন। ছাত্র-ছাত্রীরা এবার কিন্তু হৈচৈ করছেনা বা করতে পারছেনা। শিক্ষক তার ছাত্র-ছাত্রীদের রেজাল্ট বা ফলাফল অভিভাবককে জানাচ্ছেন। সবকিছু যেন একটা সিস্টেমের মধ্য দিয়ে চলছে।

বিষয়টি একটু ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে কি? একটু চিন্তা করার অবকাশ আছে কি- কেন সাধারণ মানুষ তার কষ্টার্জিত টাকার বিনিময়ে ছেলেমেয়েদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াচ্ছেন বা পড়াতে বাধ্য হচ্ছেন! তাই কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোর বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রী বা তাদের অভিভাকদের দোষারোপ না করে, রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থাকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে পারলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব এবং সেটাই মনে হয় একমাত্র সমাধান।

এখন মূল বিষয়ে আসি। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কতোদিন থাকবে- কেউ বলতে পারছেনা। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র বিভিন্ন মেয়াদে লকডাউন ঘোষণা করছে এবং সংগত কারণে তা ক্রমান্বয়ে বেড়েই যাচ্ছে। অনেক দেশ এই ভাইরাসের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে না আসার পরও জীবিকার তাগিদে দোকান-পাট, কল-কারখানা, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। দেখা গেছে, যে সমস্ত দেশ লকডাউন শিথিল করেছিল, দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্কুল-কলেজ খুলে দিয়েছিল, সে সমস্ত দেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ আবার বেড়ে যাচ্ছে। লকডাউন শিথিল করলে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করছে। অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করছে এই ভাইরাসের প্রকোপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বাংলাদেশ মত ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্র করোনাভাইরাসের জন্য যথেষ্ট ঝুকিপূর্ণ। আশংকা করা হচ্ছে, উপযুক্ত প্রতিষেধক আবিস্কার না হওয়া পর্যন্ত এই ঝুকি থেকেই যাবে।

তাহলে, রাষ্ট্র এই অবস্থায় কি সিদ্ধান্ত নিতে পারে! গত দুই মাসের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, করোনাকালে অনেক অফিসের কার্যক্রম ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে বসে বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলার সাথে সংযুক্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন তথ্য পাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। বলা যায়, রাষ্ট্র এখন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

আমাদের বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার যৌথ গবেষণা কার্যক্রমে গত দুই মাস যাবত অস্ট্রেলিয়ার পার্থ, ক্যানবেরা এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতি মঙ্গলবার সকাল ৯টায় স্কাইপ মিটিং হচ্ছে। পাওয়ার পয়েন্টে মাঠের গবেষণার কর্মকাণ্ড দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। এতে হয়তো আমরা শতভাগ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারছিনা, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের কর্মকাণ্ড থেমে থাকেনি বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

করোনাকালীন সময়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও এভাবে চলতে পারে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে ক্লাস করতে পারে। যেহেতু প্রায় সবার স্মার্ট ফোন আছে, এমনকি অনেকের ল্যাপটপও আছে, ওয়াই-ফাই কানেকশন আছে, তাই বোধকরি এই ব্যবস্থা চালু করলে সবাই উপকৃত হবেন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. উইলিয়াম এরসকিন যার অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে, তার সাথে স্কাইপে মতামত বিনিময়কালে তিনি তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন করোনাকালে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। এটা একেবারেই বসে থাকার চেয়ে ভাল। অন্তত ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের পড়ার মধ্যে রাখতে পারবে।

তবে এটা ঠিক, মুখোমুখী ক্লাসের বিকল্প হিসাবে এই ব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের শিক্ষক উভয়ের একটু সময় লাগবে। তবে মন্দ কি, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যদি করোনার মধ্য দিয়েই ডিজিটালাইজেশনের যুগে প্রবেশ করতে পারে! অন-লাইন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হলে প্রথমদিকে অনভিজ্ঞতার কারনে হয়তো বেশকিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। আস্তে আস্তে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পাবে। ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের শিক্ষকরা এ ব্যবস্থায় অভ্যস্থ হয়ে উঠবে। তাতে করে হয়তো একটা বছর করোনার কারনে হারিয়ে যাবে না। শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

লেখক: ডেপুটি প্রজেক্ট লিডার, ইউনির্ভাসিটি অব ওয়েষ্টার্ন অষ্ট্রেলিয়া

[email protected]




আরও পড়ুন

×