ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

বিকেন্দ্রীকরণ যে কারণে জরুরি

বিকেন্দ্রীকরণ যে কারণে জরুরি
×

মো. শফিকুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২০ | ০৮:২৫ | আপডেট: ২৮ মে ২০২০ | ১৩:১৫

করোনায় থমকে আছে পৃথিবী। করোনা মোকাবেলায় সার্বিক পরিস্থিতি দুশ্চিন্তায় ফেলেছে মানুষকে। করোনা ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ অনেকটা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সবকিছু ঢকা কেন্দ্রিক হওয়ার ফলেই আজ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এমন পরিণতি। বিকেন্দ্রীকরণ হলে ঢাকার ট্র্যাফিক জ্যাম কমে যেত, কমে যেত বায়ুদূষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রাখা সম্ভব হতো।

দেশের বস্ত্রশিল্প ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা কাঁচামালের জন্য চীনের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বাংলাদেশে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় চারশ' সুতার মিল রয়েছে; কিন্তু এসব মিলে সুতার উৎপাদন খরচ বেশি। তাই চীনসহ অন্যান্য দেশ থেকে সুতা আমদানি করতে হয়। করোনার প্রভাবে কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং ঝুঁকিতে আছে গার্মেন্টস শিল্প। এক পোশাক শিল্পের কারণে ঢাকায় করোনায় সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা বেশি। কেন্দ্রীয়করণের কারণে রাজধানী ও আশেপাশের এলাকাগুলোতে পোশাক শিল্প ঘনীভূত হয়ে গড়ে উঠেছে। এমনকি চট্টগ্রামে একই অবস্থা। যদি সব বিভাগীয় শহরে গার্মেন্টস শিল্প গড়ে উঠতো তাহলেই এসময়ে এই অবস্থা নাও হতে পারত।

বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসন ব্যবস্থা থাকলে আজ সিলেটের বহুল আলোচিত চিকিৎসক নাও মারা যেতে পারতেন। কারণ উনাকে ভালো চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনতে হলো, সিলেটের মত উন্নত শহরে ভালো চিকিৎসা নেই। কেন্দ্রিয়করণের কারণে সবকিছু রাজধানী কেন্দ্রীক। যদি বিভাগীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ হতো, তাহলেই আজ করোনা সনাক্তকরণ পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল ঢাকায় পাঠানোর দরকার ছিল না। কেন্দ্রীয়করণের জন্য সবাইকে রাজধানী মুখি হতে হয়, নানান কাজে ঢাকায় যেতে হয়। তাই আজকে ঢাকা সবচেয়ে বেশি করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতে। অন্তত এরকম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো বিকেন্দ্রীকরণ হলে এসব সমস্যা অনেকাংশে কমে যেত।

কেন্দ্রীয়করণে নেতিবাচক কিছু বিষয় রয়েছে। প্রথমত, কেন্দ্রীভূত পরিচালনায় আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্ব ও রূপের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কার্যক্রম বেশি দেখা যায়। এই ব্যবস্থাপনায় নিম্ন শ্রেণির কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ কম পায় এবং তারা কেবল উচ্চমহলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয়ত, এমনকি যখন নিম্নস্তরের কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অসুবিধার সম্মুখীন হয়, সেই ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ সহজেই সমস্যা সমাধান করতে বা বুঝতে পারেন না, কারণ তারা কেবল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নকারী নয়। এতে কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়, কারণ নিম্ন-স্তরের কর্মচারীদের মতামত ব্যতিত শীর্ষ স্তরের নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রেরণার অভাব লক্ষ্য করা যায়। সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের তদারকি করার জন্য নির্বাহীদের হাতে তেমন সময় থাকে না, কারণ তারা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকে। এতে কর্মীদের কাজের প্রতি অনীহা ও অবহেলা বৃদ্ধি পায়।

এছাড়াও কেন্দ্রীকরণের আরও সমস্যা রয়েছে যেমন, এ প্রক্রিয়ায় কাজ সম্পন্ন করতে বিলম্ব হয় কারণ সবকিছু কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হয়। কোনকিছু বাস্তবায়নের জন্য সকল প্রকারের কাগজপত্র ঢাকায় পাঠাতে হয়, যা প্রকল্পের কাজ বিলম্বিত করে। কর্মচারীরা উপর মহল থেকে প্রদানকৃত তথ্যের উপর নির্ভর করে কাজ করে। এতে তাদের সৃজনশীলতা হ্রাস পায়। এছাড়াও কেন্দ্রীয়করণে নিম্নশ্রেনীর কর্মচারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কম থাকে, কারণ তারা শীর্ষ নির্বাহীদের মতামত অনুযায়ী কার্য সম্পাদন করে।

অন্যদিকে বিকেন্দ্রীকরণের অনেক ইতিবাচক দিক আছে যা অনেক সমস্যারই সহজ সমাধান এনে দিতে পারে। যেমন, ১) বিকেন্দ্রীকরণে মাঠ পর্যায়ে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব। এতে কর্মের বাস্তবতা ও ক্ষেত্রের সাথে সমন্বয় রাখা হয়। এতে নিম্নলেভেলে কাজের গতি বৃদ্ধি পায় এবং তাদের বেশি কাজ করার অনুপ্রেরণা পাওয়ার সম্ভবনা থাকে। ফলে তারা তাদের নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সতর্ক ও তৎপর থাকে এবং কোন সমস্যা বা ভুল ধরা পড়লেও সাথে সাথে তারা তা সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে। ২) বিকেন্দ্রীকরণে অধীনস্ত কর্মচারীরা ব্যাপক উৎসাহ পেয়ে থাকে, যা তাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে। এ প্রক্রিয়ায় তারা নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় বলে তাদের মেধা ও সৃজনশীলতা প্রয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হয়। ৩) বিকেন্দ্রীকরণ শীর্ষ নির্বাহীদের কাজের চাপ হ্রাস করে এবং বিভিন্ন কার্য সম্পাদন করার ঝামেলা থেকে শীর্ষ কর্মকর্তাদের মুক্তি দিয়ে থাকে। ফলে শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা এই সময়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যপরিচালনায় মনোনিবেশ করতে পারে। ৪) বিকেন্দ্রীকরণে সকল এলাকার প্রত্যেক মানুষের জীবন মান উন্নত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। সাথে সাথে সমাজে বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব। এটা সম্ভব হলে সমতা ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যায়।

স্বাধীনতার পরে সর্বপ্রথম হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন, যাতে স্থানীয়ভাবে ক্ষমতা ও সম্পদ ন্যস্ত করার উদ্যোগ গৃহীত হয়। এ কর্মসূচি বঙ্গবন্ধুর বাধ্যতামূলক গ্রাম-সমবায় নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যা তার একটি অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ছিল। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে প্রয়োজনে সংবিধানের ১১, ৫৯ ও ৬০ ধারা পরিবর্তন করে নতুন বিধান সংযোজন করা যেতে পারে। দেশে প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি জাতীয় বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি। তবেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার নিরসন ঘটিয়ে দ্রুত উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।

শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 





আরও পড়ুন

×