ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘায়িত মহামারিতে সামাজিক আচরণ

দীর্ঘায়িত মহামারিতে সামাজিক আচরণ
×

ডা. মো. আব্দুল্লাহ্ আল মামুন

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২০ | ১২:৩৪ | আপডেট: ৩১ মে ২০২০ | ০৬:৪৫

করোনাভাইরাস মহামারির শেষ কোথায়? কবে আবার আমরা আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবো? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে সতর্ক করে বলেছে, করোনাভাইরাস হয়ত কখনোই পুরোপুরি চলে যাবে না। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একটা সময় এর ভয়াবহতা বা আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসবে ঠিকই, তবে এর সংক্রমণ পুরোপুরি শেষ হতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। তবে এত লম্বা সময় কোনো দেশেই লকডাউন চালিয়ে যাওয়া হয়তো সম্ভব হবে না। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের কথা বিবেচনা করে সবদেশেই পর্যায়ক্রমে খুলে দেওয়া হতে পারে অফিস-আদালত, স্কুলকলেজ, গণপরিবহন।

যে কোনো মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধের হাতিয়ার মূলত তিনটি- টিকা, গণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও স্থায়িভাবে সামাজিক আচার-আচরণে পরিবর্তন আনা। টিকা ও গণরোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বিষয়ে গবেষণা চলমান এবং কার্যকর কোনো সমাধানে এখনও আসা সম্ভব হয়নি। তাই লকডাউন তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক আচরণে স্থায়ী কিছু পরিবর্তনের বিকল্প এ মুহূর্তে নেই। এর ফলে হয়তো সংক্রমণের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে অপেক্ষা করতে হবে কার্যকর টিকা বা ওষুধ আবিষ্কার ও বিশ্বজুড়ে এর সহজপ্রাপ্যতার জন্য।

এজন্য সংক্রমণরোধে সার্বজনীনভাবে নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা তৈরি এবং ঘরের বাইরে অর্থাৎ কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বাজারঘাটে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। একই সঙ্গে ঘরের বাইরে নাক-মুখ-চোখ যথাযথভাবে ঢেকে রাখতে পারে এমন মাস্ক ও গগলসের ব্যাবহারে অভ্যস্ত হতে হবে। হ্যান্ডগ্লভস ব্যবহার না করাই উত্তম। কারণ আপনার হ্যান্ডগ্লভস হতে পারে জীবানু সংক্রমণের উৎস। সেক্ষেত্রে যে কোনো কাজের পর হাত ধোয়া বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার হতে পারে উত্তম বিকল্প।

সামাজিক আচরণ- যেমন করমর্দন, কোলাকুলি, খুব কাছাকাছি বসা, হাত ধরে হাঁটা- এগুলো পরিহার করতে হবে। যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান যেখানে গণজমায়েত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যেমন- বিয়ে, জন্মদিন বা সভাসমাবেশ যতদূর সম্ভব পরিহার করে চলতে হবে।

গণপরিবহনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য যাত্রীসংখ্যা কমিয়ে আনা যেতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ক্লাসরুমে ছাত্রছাত্রীদের, গণপরিবহনে যাত্রীদের এবং অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট দূরত্বে বসার ব্যবস্থা করতে হবে। বাজারের জন্য খোলা মাঠ নির্ধারণ করা যেতে পারে অথবা ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বাজার করার ব্যবস্থা করতে হবে। অনলাইন শপিং এক্ষেত্রে একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। এজন্য অনলাইন শপিংয়ের ব্যাপ্তি আরও বাড়ানো যেতে পারে।

অহেতুক কারো বাসায় বেড়াতে যাওয়া বা কাউকে বাসায় আসতে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বন্ধু বা প্রিয়জনদের সঙ্গে আড্ডা পরিহার করতে হবে। রেস্টুরেন্টে একসঙ্গে খেতে যাওয়া বা রাস্তার পাশের দোকানে চা খাওয়া বা যেকোনো স্ট্রিট ফুড খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বাইরে থেকে এসে কাপড়চোপড় দ্রুত ডিটারজেন্টপানিতে ভিজিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। যে কোনো বাইরের জিনিস দ্রুত নিয়মানুযায়ী জীবানুমুক্ত করে নিতে হবে এবং সাবান দিয়ে ভালোভাবে গোসল সেরে নিতে হবে।

এ সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখাটাও জরুরি। দীর্ঘ সময় এ রকম সামজিক আচরণের পরিবর্তন আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। সেক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটানোর চেষ্টা করতে হবে। নিয়মিতভাবে যার যার ধর্মমতে প্রার্থনা করা যেতে পারে। বই পড়ে, ইনডোর গেম খেলে, গান শুনে, ভালো মুভি দেখে সময় কাটানো যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যদি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেক্ষেত্রে এটি কিছুটা এড়িয়ে চলা উত্তম।

আমরা আশা করি, খুব দ্রুত এই মহামারি সংকটের অবসান হবে। দ্রুতই আমরা কার্যকর কোনো ভ্যাক্সিন বা ওষুধ হাতে পাবো। ততদিন পর্যন্ত সামাজিক আচার-আচরণে পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা সুরক্ষিত রাখতে পারি আমাদের নিজেদের, পরিবারের সদস্যদের এবং আমাদের প্রিয়জনদের। এজন্য পারিবারিক বা সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি পালনের অভ্যাস গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

লেখক: নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল


আরও পড়ুন

×