আমাদের অভিভাবক
সুদীপ্ত সাহা
সুদীপ্ত সাহা
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২০ | ০৫:৩৫ | আপডেট: ০২ জুন ২০২০ | ০৬:৫৮
লেখাটার শিরোনাম প্রথমে লিখেছিলাম, ‘তিনি ছিলেন বুয়েটের অভিভাবক’, পরে মনে হল ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী আসলে শুধু বুয়েট নয়, আমাদের গোটা প্রকৌশল সমাজের একজন অবিসংবাদী অভিভাবক ও আশ্রয়দাতা ছিলেন; অন্যভাবে বললে তিনি ছিলেন একটি বিশ্বস্ত ও পূজনীয় প্রতিষ্ঠানের মত।
একজন বাংলাদেশি হিসেবে একাধিক প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানীকে নিয়ে গর্ব হয় বিশ্বময়দানে তাদের অবদানের জন্য- যেমন ড. এফ আর খান বা ড. ফজলে হুসেইন— কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের মনের প্রিয় স্থানটি পেয়ে যান ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী| তার পেশাগত শ্রেষ্ঠত্ব ও সামাজিক অবদান- এই দুইয়ের দুর্দান্ত সম্মিলনের কারণে।
প্রকৌশলী হিসেবে ড. জামিলুরের অবদান নিয়ে বিস্তর লেখা হয়েছে গণমাধ্যমে। এর বাইরে তার সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা শেয়ার করতে চাই। ২০১২ সাল, বুয়েট তখন ভিসিবিরোধী আন্দোলনে কয়েকমাস বন্ধ। শিক্ষকদের ক্লাস বর্জন ও ধর্মঘটের পর এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যুক্ত হলে প্রতিবাদ ভীষণ মাত্রায় বেগ পায়। কারণ শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামলে তা পত্রিকার শিরোনাম হয়, আর পত্রিকার শিরোনাম হলে পরেই যেন তা কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। দীর্ঘদীন ক্লাস বন্ধ এবং এ বিষয়ে কোন সমাধান না হওয়ায় একদিকে শিক্ষার্থীরা যেমন অধৈর্য হয়ে পড়েছিল, আর সেই সাথে অকারণে হঠাৎ ক্লাস ছাড়ার নির্দেশে দীর্ঘদিন প্রশাসনিক দুর্নীতি, ফল জালিয়াতি ও ক্রমের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ছাত্র রাজনীতিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেন ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেসময় শিক্ষার্থীদের একজন নৈতিক অভিভাবক হিসেবে যেন মহীরুহ হিসেবে আবির্ভূত হলেন ড. জামিলুর স্যার। এমন মানুষ যখন ক্যাম্পাস এসে আমাদের সাথে একসাথে বসে আলোচনা করলেন, তখন মনেই হচ্ছিলনা যে উনি আমাদেরকে নিতান্তই ছোটখাটো মানুষ হিসেবে দেখছেন। ফলভারে অবনত বৃক্ষের এই সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি দেখে আমরা যারপরনাই অবাক ও আনন্দিত। মূলত এমন একজন মানুষ আমাদের সাথে একই কাতারে বসে একাত্মতা প্রকাশ করছেন—এইটা দেখেই শিক্ষার্থীদের মনোবল কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
শুধু একাত্মতা প্রকাশ করে আমাদের মনবোল বৃদ্ধিই নয়, বুয়েটের অচলাবস্থা দূরীকরণে উনি নিজের সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। স্বাভাবিক কারণেই ওনার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ ছিল। উনি সর্বোতভাবে চেষ্টা করেছিলেন বুয়েটের সত্যিকার সমস্যা ও এর বিপরীতে শিক্ষার্থীদের দাবির ন্যায্যতার কথা। এমনকি ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটিও আমাদের কয়েকজনকে দিয়েছিলেন যাতে ওনার কাছে আমরা পৌছাতে পারি। শুধু আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা নয়; পরবর্তীতে সুপরামর্শের জন্য ওনাকে ফোন করলে উনি ভীষণভাবে স্বাগত জানিয়েছিলেন| এমনকি আমাদের কয়েকজনকে উনার অফিসে দেখা করার সময়ও দিয়েছিলেন। খুবই আন্তরিকতার সাথে আমাদের কথা শুনতেন এবং বুয়েটের অচলাবস্থা দূরীকরণে কি করলে আমাদের ভাল হবে সে বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। আমাদের অনুরোধে তিনি বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করেছেন যে্ন সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়। আর এই পুরো বিষয়টাই তিনি করেছেন সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। কারণ আমাদের শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়ায় ওনার তো ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ ছিল না। উপরন্তু এই মাধ্যমে অনেকের চক্ষুশূল হওয়ার সুযোগ ছিল। উনি চাইলেই এ কারণে আমাদের আহবান এড়িয়ে যেতে পারতেন। সেটি তিনি করেননি। বরং স্বপ্রোণদিত হয়ে যতখানি ভূমিকা পালন করা সম্ভব তিনি সেটি করেছিলেন। এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও সামাজিকভাবে প্রচণ্ড দায়বদ্ধ ছিলেন এই নিঃস্বার্থ মানুষটি। আর এজন্যই তাকে যেন মনে হয়েছে বিশাল এক মহীরুহ, যিনি আদতে ছিলেন আমাদের একজন অভিভাবক। হয়তো নিজের প্রতিষ্টান বলে বুয়েটের প্রতি তার একটা আলাদা মমতা ছিল, কিন্তু তিনি সর্বোপরি আমাদের পুরো প্রকৌশলী সম্প্রদায়েরই অঘোষিত অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্যারের কাছ থেকে সারা জীবন মনে রাখার জন্য দুইটা শিক্ষা পেয়েছি- ১) বিনয়ী হওয়া। বয়সে বা অবস্থানে ছোট হলেও মানুষের সাথে সম্মানের সাথে আচরণ করা। ২) পেশাগত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি যতটা সম্ভব সামাজিকভাবে দায়িত্ব পালন করা। সমাজ ও রাজনীতি সচেতন হওয়া।
অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর মৃত্যুতে বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা তাই যেন একজন ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ হারালো। আশা করি কয়েক দশক ধরে তিনি যে অসাধারণ মানবিক গুণাবলির দীপ প্রজ্জ্বলিত করে গেছেন, আমরা তা থেকে নিজেদেরকে কিছুটা হলেও দীপান্বিত করে নিতে পারবো। সেটাই হবে এই অসাধারণ মানুষটির স্বৃতির প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো ন্যাশনাল ল্যাবোরেটরিতে নিউক্লিয়ার ফুয়েল মডেলিং ইন্টার্ন পদে কর্মরত