আপন আয়নায় ঐতিহাসিক ৭ জুন
অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০ | ০২:৩২ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
প্রতিবছর ৭ জুন অনেকটা নীরবে নিভৃতে আসে এবং চলে যায়। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এই দিনটি উদযাপন করলেও সাধারণ্যে দিনটি কোন সাড়া বা অনুরণ সৃষ্টি তেমন করেনা। অথচ এই দিনটি না এলে আমাদের আজকে স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসাবে অভ্যূদয় ও বেড়ে উঠা সম্ভব হতো না। সেদিনের মাঠ পর্যায়ের একজন কর্মী হিসাবে এমন উপলব্দি আমার ছিল; এত বছর পর সেই স্মৃতির বিশ্লেষণে এটাই মনে হচ্ছে। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ধপ করে আকাশ থেকে পড়েনি। তাই তার আবেদন দপ করে জ্বলা বাতির ন্যায় বাতাসের আঘাতে নিভে যাবার স্মৃতি নয়।
আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক (এফএইচ হল) হলের আবাসিক ছাত্র। আমার কক্ষ নম্বর ছিল ২৩২। জনাব আবদুর রাজ্জাকও এফএইচ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। একই সাথে তিনি তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আবদুর রাজ্জাক ছাড়া এ হলে ছিলেন সাতক্ষীরার এন্তাজ আলী (মরহুম), আবদুল কুদ্দুস মাখন (মরহুম), মনিরুল হক চৌধুরী, আবদুল খালেক, সজল (আমেরিকা প্রবাসী), শেখ ফজলুল করিম সেলিম প্রমূখ। এ হলে আরও যাদের বেশি আনাগোনা ছিল তারা হলেন শেখ ফজলুল হক মনি (মরহুম), সিরাজুল আলম খান, ফেরদৌস কোরেশী, নূরে আলম সিদ্দিকী, আল আমীন চৌধুরী প্রমূখ।
১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখে ৬ দফা প্রস্তাব পেশের পর শেখ মুজিব (তিনি তখনও বঙ্গবন্ধু খেতাব পাননি) পাদ প্রদীপের আলোকে দ্রুত আসতে শুরু করলেন। এসময় তার উপর নির্যাতন হয়েছে, জেল জরিমানা জুলুম হয়েছে। তার জীবনের হুমকি ছিল, পরিবারের জন্য দুর্গতি ছিল, কিন্তু এসময় থেকে তিনি সবাইকে পিছে ফেলে দ্রুত সামনে এগিয়ে যেতে শুরু করেন। ৬ দফার দাবী নিয়ে তিনি চারণের মত বাংলার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। বলতে গেলে প্রতিদিনই তাকে বন্দী হতে হোল, জামিন পেয়ে আবার মাঠে নামতেন, বাড়ী এলেন, ঘুমাতে গেলেন এবং ঘুম থেকে জেগে ওয়ারেন্ট হাতে পুলিশকে দেখলেন; জেলে গেলেন আবার ছাড়াও পেলেন। মে মাসের দিকে বলতে গেলে অনেকটা স্থায়ীভাবে তিনি জেলের বাসিন্দা হয়ে গেলেন। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের প্রায় সকলে জেলে নীত হলেন। এই সময়ে আওয়ামী লীগকে ভেঙে তছনছ করার প্রক্রিয়াও সচল হোল। এক গৃহবধূর অসামান্য প্রচেষ্টায় সেদিন দল টিকে রইল, আন্দোলন এগিয়ে গেল, নিরাশার জমাট আঁধারে আমরা আলোর রশ্মিসহ গন্তব্যের ঠিকানা পেলাম। নেপথ্যে থেকে যিনি এ কাজটি করলেন তিনি হলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।
উল্লেখ্য, সেদিন যদিও ৬ দফাকে আমাদের বাঁচার দাবী বলে জনগণ গ্রহণ করেছিল আমাদের দেশের উঠতি ডান বাম কোন দলই এই আন্দোলনকে ভালভাবে গ্রহণ করেনি। এমনকি কোন কোন বাম দল তদানিন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খানের সাথে সুর মিলিয়ে একে বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন হিসাবে চিহ্নিত করে প্রতিহত করতে মাঠে নেমে পড়ল। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা কর্মীরা জেলে নীত হলে অন্যরা সক্রিয় থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। তবুও শেখ মুজিব বা তার বিশ্বস্ত ও নিকটস্থরা দমে গেলেন না। জেল থেকে শেখ মুজিব নির্দেশ দিলেন ৭ জুনে হরতাল পালন করার।
এই নির্দেশের পর একদিন শেখ মনি ও সিরাজুল আলম খান এফএইচ হলে এলেন। বিস্তারিত আলোচনা হোল, কর্মসূচি প্রণীত হলো এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য কর্মকৌশল প্রণীত হলো। গোপনে এসব চললেও পাকিস্তানী গোয়েন্দাদের কাছে তা অজ্ঞাত ছিল না। তাছাড়া ছিল তদানিন্তন গভর্নর মোনেম খানের গুণ্ডা বাহিনী এনএসএফ। এফএইচ হল ও ঢাকা হল ছাত্রলীগের দুর্গ বলে পরিচিত হলেও এদুটো হলে এনএসএফ সমর্থক গুণ্ডা পান্ডার সংখ্যা কম ছিল না। একদিন রাতে সাদা পোষাকী পুলিশ ও গোয়েন্দা হল ঘেরাও করে ফেলল। অবস্থা বেগতিক। সিরাজুল আলম খানের প্রকাশ্যে তেমন পরিচিতি না থাকায় তার কেটে পড়াটা কঠিন ছিল না, সমস্যা হোল শেখ ফজজুল হক মনিকে নিয়ে। শেখ মুজিবের ভাগ্নে হিসাবে তো বটেই, ছাত্রলীগের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক হিসাবে গোয়েন্দার শ্যন দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া তার জন্যে দুষ্কর ছিল। সিদ্ধান্ত হলো, আমি তাকে আগামসিলেন পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়ে আসব। আমার পিঠে ভাল ছাত্রের একটা ছাপ ছিল এবং গোয়েন্দারা আমাকে ধরেও তেমন কাবু করতে পারবে না ভেবেই মনি ভাইকে গোয়েন্দা বেষ্টনী পার করার দায়িত্ব আমার কাঁধে বর্তাল। আমার কক্ষেই সেলিম উপস্থিত ছিল। মনি ভাইয়ের মাথার চুল দু'ভাগ করে ঠিক মাঝখান দিয়ে সিঁথি কাটা হোল আর সেলিমের চশমাটা তাকে পরিয়ে অতি সাদা সিধে পোষাকে গোয়েন্দাদের চোখের সামনে দিয়ে আমরা চলে গেলাম। সেদিন মনি ভাই অ্যারেষ্ট হয়ে গেলে আন্দোলনের হয়ত এমন রূপ হতো না।
তবে একটা কথা সত্যি যে সারাদেশ তলে তলে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত ছিল। জাতির প্রতিটি সচেতন মানুষের কাছে বৈষম্য বঞ্চনার চিত্রতা প্রকট ছিল। তার প্রমাণ মিলল ৭ জুন। আমরা অল্প দিনের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। খুব বেশি নেতা বা বিশিষ্ট কর্মী এ প্রয়াসের সাথে সম্পৃক্ত না হলেও সাধারণ মানুষ ৭ জুন তাদের নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের দিন হিসাবে বেছে নিল। আমরা যে ক'জন সেদিনে মাঠে ছিলাম তাদের সংখ্যা ছিল মুষ্টিমেয়। আগের রাতগুলোতে পুলিশের তাড়া আর গুণ্ডাদের অত্যাচারে আমরা বড্ড সন্ত্রস্ত ছিলাম। নেতারা আমাদের বুকে সাহস এনে দিতেন। ৭ জুন আসার আগেই অর্থাৎ ৬ জুন আমরা সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিলাম। আমি, রাজ্জাক সাহেব, মনির, মাখন, খালেক, সজল হাইকোর্টের সামনে যানবাহন অবরোধের দায়িত্ব পেলাম। অতি ভোরে এসে পিকেটিং শুরু করলাম। রাজ্জাক ভাই বলেছিলেন, সকাল ৮টা পর্যন্ত ধরে রাখতে পারলে বাকীটা টোকাইরাই করে ফেলবে। তাই আমার মনে তখন ৮টা পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখার চিন্তা। আমার পাশেই অবস্থান করছেন আবদুর রাজ্জাক। হঠাৎ রাজ্জাক সাহেব আমাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে (পুরাতন) হাইকোর্টের রাস্তার উপর ফেলে দিলেন। কনুই কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হলো। আমি তাতে ক্ষুব্ধ হলাম। কারণ জিজ্ঞেস করলে জানতে পারলাম যে, পুলিশের আলম-নামের এক অফিসার আমার মাথা লক্ষ্য করে গুলি করেছিল। রাজ্জাক ভাই ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে না দিলে আমার মাথার খুলি উড়ে যেত। মুহূর্তে আমার রক্ত শীতল হয়ে যাবার উপক্রম হলো। আমার কি অনুভূতি হলো তা আর বুঝতে পারলাম না। মুহূর্তে আমি বদলে গেলাম।
১৯৬৬ সালের ৬ জুন পর্যন্ত কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করলেও ৭ জুন নির্বিচারে ছাত্র জনতার নিহত হবার পরই আমাদের মনোভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন হলো। জীবন দিয়ে হলেও উপনিবেশিক শাসন থেকে মাতৃভূমিকে মুক্তির শপথ আমরা নিলাম। বিরাজমান সশস্ত্র সংগঠন বিএলএফ বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টের কার্য পরিধি বিস্তারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আমাকে পুলিশ বন্দী করলে, দুপুরে ছাড়া পেয়েছিলাম বাঙালিত্বের আবেগ জাগিয়ে আর বিকালে ছাড়া পেয়েছিলাম ভাল ছাত্রের নামাবলী তথা লাইব্রেরি কার্ড পকেটে রেখে। সেদিনের বিকালে মনু মিয়ার রক্তমাখা শার্টটি আমি দেখেছি। তবে এখন মনে হচ্ছে শার্টটা ছিল আবুল হোসেনের যিনি বুক চেতিয়ে আধা-সামরিক বাহিনীকে তাকে হত্যার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। সেদিন মনুমিয়া, আবুল হোসেনসহ ১১ জন নিহত হয়েছিলেন; যা সরকারি ভাষ্য। সংখ্যা অন্তত তারও দশ গুণ হতে পারে। আমরা শুনেছি সেদিনে আহত ও নিহত মিলিয়ে সংখ্যাটা ছিল হাজারের উপর।
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশে অভূতপূর্ব গণজাগরণের আভাস পেয়ে আমরা ধরে নিলাম আমাদের শুভদিন এগিয়ে আসছে। সেদিন বিকালে কার্জন হলে যখন আমরা আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি পর্যালোচনা করছি তখনই মতিয়া চৌধুরী এলেন, আমাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করলেন, আমরাও উৎসাহিত হলাম। এতদিন পর কত ঘটনার আড়ালে কত কিছু চাপা পড়ে গেছে কিন্তু এগুলো ঠিকই মনে আছে। সেদিন মনে হয়েছিল ইচ্ছা শক্তিটাকে যদি আদর্শবাদিতার মোড়কে মুড়ে ফেলা যায়, তাহলে অসম্ভবও সম্ভব হয়। ওই যে ‘ভাবের যখন জোয়ার আসে তখন মূক বাচাল হয়, খঞ্জও গিরি লংঘন করে’।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা; উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ