ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

ফ্লয়েড ও নিখিলের মৃত্যুর পর

ফ্লয়েড ও নিখিলের মৃত্যুর পর
×

অমল আকাশ

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২০ | ০১:২৯ | আপডেট: ১০ জুন ২০২০ | ০২:৫৫

হ্যাঁ, ঠিক এভাবেই! এভাবেই ঘাড়ের উপর হাঁটু রেখে মাথাটাকে প্রাণপন চেপে ধরতে হয় কালো রাস্তার ওপর, প্রকাশ্য দিবালোকে। ওর কালো কন্ঠনালী থেকে যতবার বেরিয়ে আসবেআই কান্ট ব্রিথ’, ততবার তুমি বুক ভরে নিঃশ্বাস টেনে বলবে, জয়, সাদা আমেরিকার জয়! তুমি ওর ঘাড়টাকে চেপে ধরো ততক্ষণ, যতক্ষণ না হাড় ভাঙার শব্দ শোনা যায়, চেপে ধরো নাকে মুখে রক্ত উঠে আসার, ওর মাকে শেষবারের মতো ডাকবার আগ পর্যন্ত। তারপর হাঁটুর নিচে নিথর মুন্ডুটা রেখে, প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা সাবলিল ভঙ্গিতে ফটোসেশন করতে পারো। তোমার এই বীরত্বের ছবি ছড়িয়ে যাবে সারা পৃথিবীতে। তুমি পৃথিবীকে শিখাবে একটা বিশ ডলারের জাল নোট বহনকারী কালো মানুষকে কী করে হত্যা করতে হয়। শিখাবে, কী করে উস্কে দিতে হয় বর্ণবাদ, হোয়াইট সুপ্রিমেসি। তুমিতো জানো তোমার জন্য অপেক্ষা করছে দেশ প্রেমিক সাদাবীরের পুরস্কার।

আহা বুর্জোয়া গণতন্ত্র, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্র, তোমার সাদা-শুভ্রতায় দেখো একজন কালো জর্জ ফ্লয়েড নিঃশ্বাস নিতে পারছে না! তার রক্তাক্ত গোঙানীতে শুধু পৃথিবীর বাতাস ভারী হয়ে ওঠে আজ— ‘আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে, মা, আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না!’

ভাই আমার জর্জ ফ্লয়েড! তোমার মতো কৃষক নিখিলেরও দমবন্ধ হয়ে আসছিল সেইদিন বাংলাদেশের কোটালীপাড়ায়। আর আমরা শুধু তার হাড় ভাঙার শব্দ শুনেছি, চুপচাপ। বাতাস ভারী হয়ে আসা বোবাকান্নায়। আমাদেরও দমবন্ধ হয়ে আসছে  নিখিল, আর নিঃশ্বাস নিতে পারছি না ফ্লয়েড, উই কান্ট ব্রিথ! উই কান্ট ব্রিথ!!

আহা ফ্লয়েড, তোমার ঘাড়ের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে আছে যে নীল রঙা পুলিশ, তাকেই তো দেখলাম নিখিলের নিঃশ্বাস কেড়ে নিতে! তাকেই তো দেখছি, আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়ায়। শুধু পোশাকের রঙ বদলায়।

পৃথিবীর দেশে দেশে আবার ফ্যাসিবাদের জয়ধ্বনি শুনি। সংকটে উন্মাদ মুনাফার দুনিয়া প্রকাশ্যে নেমেছে পথে উদাম হয়ে। তাই যখন যেখানে যা দরকার, সাম্প্রদায়ীকতা, বর্ণবাদ, কিংবা কথিত বৈধ অস্ত্র, তাই নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের পাঁজরের ওপর। অথচ ফ্লয়েড, তোমার কালো পেশী গড়েছে এই পুঁজির সভ্যতা। তোমার সংগীত, শিল্পকলার বেচাকেনায় আজও টিকে আছে তাদের কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি। কৃষক নিখিল দিয়েছে সমুদয় খাদ্যের যোগান। তবু তোমারই ঘাড় ভেঙে দেয়া হবে, তবু তোমারই মেরুদণ্ড হবে চৌচির। কেননা তোমার পেশীময় শক্ত ঘাড়, তোমার সোজা টানটান মেরুদণ্ড ওরা ভীষণ ভয় পায়! ওদের ভয় অমূলক নয়! যতবার বদলে গেছে পৃথিবীসে তোমার কালো পেশী, লৌহদৃঢ় সিনা, নতুন সভ্যতা বয়ে নেবার মতো শক্ত ঘাড় আর সোজা মেরুদণ্ডের দাপটে। সে দাপট দমনে ওরা বানিয়েছে মেশিনরাষ্ট্র-পুলিশমেশিন!

আহা, কি নিখুঁত সাবলিল ভঙ্গিতে খুন করতে জানে তোমাকে আমাকে। তোমার মতো আমাকে অথবা আমার মতো তোমাকে ওরা হত্যা করে দেশে দেশে। শোনো জর্জ ফ্লয়েড, পিচ ঢালা পথের উপর ছুঁড়ে দেয়া তোমার শেষ নিঃশ্বাসে, কেঁপে উঠেছিল সারা পৃথিবী। আর নাক থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তের দাগ মুছে ফেলবার আগেই, ছুটে চলেছে দেশে দেশে সকল রাজপথে। মা, শুনছো! মৃত্যুর আগে তোমাকে ডেকেছিলো জর্জ। মাশুনছো, দেশে দেশে তোমাকেই ডাকে নিখিল, ‘আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে, মা, আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না! ফুসফুসের পর্দা ফাটবার শব্দে বাতাস ভারি হয়ে আসবে পৃথিবীর।

তবু বলি, মা কেঁদো না তুমি। ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর দেখো বিক্ষোভে উত্তাল পৃথিবী, রাজপথে তোমার লক্ষ কোটি সন্তান। ভোটের হিসাবনিকাশ যেদিকেই নিতে চাক ট্রাম্প, যতই উস্কে দিক বর্ণর্বাদী রায়ট, দেখো একদিন নিপীড়িত ঠিক তার প্রতিটি খুনের হিসাব বুঝে নেবে। একদিন সাদাকালো সকলে জেনে ফেলবে, কী করে রাষ্ট্রের মেশিনে তৈরি করা হয় বর্ণ, ধর্ম কিংবা জাতিগত বিভেদ। একদিন পৃথিবী জানবেই, কী করে নিখিল পেয়েছিল মেরুদণ্ডের হাড়ভাঙা গণতান্ত্রিক মৃত্যুদণ্ড।

ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর তবু আমেরিকা কেঁপে ওঠে, কাঁপছে ইউরোপ। আর কোটালীপাড়ায় নিখিলের মৃত্যুর দাম হাঁকে পাঁচ লক্ষ টাকা! জয় পুঁজিবাদের জয়, এখানে সবই কেনাবেচা হয়!

না! ফ্লয়েড নিখিলের মৃত্যুর পর আমরা এখনো বেঁচে আছি। টাকার দামে মানুষের মৃত্যু কেনার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে হে রাষ্ট্র? ফ্লয়েড নিখিলের মৃত্যুর পর আমরা লড়ে যাবো। লড়ে যাবো ভারতের পরিযায়ী শ্রমিকের সাথে, সিরিয়ার অনাথ শিশু আর প্যালেস্টাইনে টগবগে যুবকের সাথে, আমাজনের আদিবাসী, আফ্রিকা, পৃথিবীর দেশে দেশে। ফ্লয়েড নিখিলের মৃত্যুর পর সবকিছু সুনসান একই থাকতে পারে না। বদলাবেই জুলুমের এই দুনিয়া! বদলাতে হবেই নিখিলের বাংলাদেশ।

লেখক : সংস্কৃতিকর্মী

আরও পড়ুন

×