চিকিৎসা ব্যবস্থার আমদানি-রফতানি
ড. কাজী ছাইদুল হালিম
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২০ | ০২:৪০ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২০ | ০৫:১৫
মজার ব্যাপার হল যে আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবারে এখনো তাদের সন্তানদের বলতে শেখানো হয় যে বড় হয়ে কি হবে, চিকিৎসক না ইঞ্জিনিয়ার! অনেক সময় অভিভাবকরাই আবার উত্তর শিখিয়ে দিয়ে বলায় যে বড় হয়ে চিকিৎসক হব বা ইঞ্জিনিয়ার হব বা পাইলট হব ইত্যাদি।
অনেকের অন্তরে শৈশব থেকেই গেঁথে যায় চিকিৎসক হবার বাসনা তা হোক নিজ ইচ্ছা থেকে বা পরিবারের চাপে। সাধারণত স্কুল-কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম সারির শিক্ষার্থীদের একটা ক্ষুদ্র অংশ খুব প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়তে আসে। পাঁচ বছর পড়াশুনা এবং এক বছর ইন্টার্ন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে এরা চাকরি জীবনে প্রবেশ করেন। ভাগ্য ভাল হলে বিসিএস পরীক্ষায় পাস করে সরকারি হাসপাতালে বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চাকরি জীবন শুরু করেন।
বাস্তবে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্হা এবং এর অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার জন্য যদিও অনেকেই দায়ী তবুও কিন্তু রোগী এবং সাধারণ জনগণের কাছে ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্য হয় প্রথমেই চিকিৎসকরা। এর অন্যতম প্রধাণ কারণ হিসেবে বলা যায় যে, রোগী এবং সাধারণ জণগণের ধারণা হচ্ছে রোগ মানেই চিকিৎসা, চিকিৎসা মানে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, আর চিকিৎসকের কাছেই আছে সব সমস্যার সমাধান। চিকিৎসককে যে একটা সিস্টেমের মধ্যে থেকে চিকিৎসা দিতে হয়, আর সেই সিস্টেমে চিকিৎসক ছাড়াও যে আরো অনেকে জড়িত থাকে তা অনেকে মানতে চান না।
এটা কখনোই বলা যায় না যে বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্হার অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার জন্য চিকিৎসকরা কোনক্রমেই দায়ী নয়। আংশিক ভাবে চিকিৎসকরা দায়ী হয়তো, তবে আমরা কেন অন্য দায়ীদের এখান থেকে বাদ দিব।
সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে যে অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা দেখা যায় তার প্রধান ভুক্তভোগী হচ্ছেন চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগী। রোগীরা সাধারণত তাদের অভিযোগ প্রকাশ করে থাকেন এভাবে যে হাসপাতালে (১) চিকিৎসক ঠিকমত থাকেন না (২) প্রয়োজনীয় ওষুধ সব সময় পাওয়া যায় না (৩) রোগীদের জন্য নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ করা হয় (৪) রক্ত বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনেক সময় হয় না (৫) প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি অনেক সময় নষ্ট থাকে (৬) ঠিকমত সেবিকা আসেন না (৭)রোগী বহনের স্ট্রেচার পেতে প্রায়ই টাকা দিতে হয় (৮) চিকিৎসকদের দালালের উপদ্রব (৯) কিছু কিছু চিকিৎসক চিকিৎসা সেবা না দিয়ে তাদের ব্যক্তিগত ক্লিনিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেন (১০) স্থাপনার ভাঙ্গাচোরা দৃশ্য (১১) অপরিষ্কার ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং (১২) চিকিৎসক অনেকসময় সঠিক রোগ নির্ণয় করতে পারেন না ফলে ভুল চিকিৎসা দেন।
এতসব বিস্তর সমস্যার সমাধান দেওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। তবে এর প্রধান দুটো উদ্দেশ্য রয়েছে; কেন আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্হার উ্ন্নয়ন সাধন করা অতীব জরুরী এবং এই উন্নয়ন সাধনের নিমিত্তে আমরা কিভাবে এগোতে পারি। প্রশ্ন দুটোর উত্তর খোঁজার আগে এর পটভূমি জানা জরুরি।
বিশ্বায়নের যুগে পণ্য, সেবা, শ্রমিক, মূলধন এবং বিনিয়োগকারীর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা যেমন কঠিন, তেমনই কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেআইনীও বটে। আর এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য বাধার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং মুক্ত বাণিজ্যের জন্য সংস্থা প্রণীত নিয়ম-কানুন। সুতরাং মুক্ত বাণিজ্য বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যের মৌলিক রূপ। মুক্ত বাণিজ্যের সাদামাটা ধরন হচ্ছে যে ভোক্তা বাজার থেকে সেইসব দ্রব্য সামগ্রী বা সেবা সমূহ কিনবে যেখান থেকে তিনি তার সীমিত অর্থের বিনিময়ে সর্বোচ্চ তৃপ্তি পাবেন। আর অন্য দিকে এই মুক্ত বিশ্ব বাণিজ্যে উৎপাদনের উপকরণ সমূহ যেমন শ্রমিক, মূলধন এবং বিনিয়োগকারীরা সেখানে যাবে যেখান থেকে তারা তাদের শ্রম এবং বিনিয়োগের সর্বোচ্চ মজুরি এবং লভ্যাংশ পাবে। মোদ্দাকথা পণ্য, সেবা, শ্রমিক, মূলধন এবং বিনিয়োগকারীর গতিবিধি থাকবে মুক্ত এবং বাধাহীন। মুক্ত বিশ্ব বাণিজ্য বেশির ভাগ সময় ভোক্তার পক্ষে গেলেও কিন্তু এটা বেশির ভাগ সময় দেশজ উৎপাদনকারীর বিপক্ষে যায়, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।
আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিকিৎসা সেবাপ্রার্থী প্রতি বছর চিকিৎসা সেবা গ্রহণের জন্য আমাদের নিকটতম প্রতিবেশি দেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যায়। আর অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেতো কথাই নেই – অবস্থা দেখে অনেক সময় মনে হয় যে বিদেশই হয়তো তাদের চিকিৎসা সেবা গ্রহণের একমাত্র ভরসাস্থল।
বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায় যে, প্রতি বছর ১৫ লাখের মত রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যায়। এর সংখ্যাগুরু একটা অংশ যায় ভারত, থাইল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুরে। বাংলাদেশি রোগীদের বিদেশে চিকিৎসা সেবা গ্রহণের এই চিত্র দেখে যে কেউ খুব সহজেই অনুমান করতে পারবে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার আস্থা সংকটের কথা।
অর্থনীতির ভাষায় আমরা যখন বিদেশি কোন দ্রব্য বা সেবা ক্রয় করি তখন তাকে বলে আমদানি, আবার আমরা যখন বিদেশে নিজ দেশের কোন দ্রব্য বা সেবা বিক্রয় করি তখন তাকে বলে রপ্তানি। রপ্তানি থেকে আমরা মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি আর আমদানির জন্য মূল্যবান ও কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা আমদানি পণ্যের মূল্য হিসেবে প্রদান করি। অধিকন্তু, বিদেশিরা যখন বাংলাদেশের কোন দ্রব্য বা সেবা ক্রয় করে তখন তারা বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, আমরা যখন কোন বিদেশি দ্রব্য বা সেবা ক্রয় করি তখন আমরা সেই দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করি। যেমন একজন বাংলাদেশি রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণের জন্য থাইল্যান্ড গেল। সেই রোগী থাই একটি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিল, এতে করে সেই বাংলাদেশি রোগী থাই হাসপাতালে কিছু পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করল এবং জাতিও পর্যায়ে বাংলাদেশে সেই থাই চিকিৎসা সেবা আমদানি হিসেবে গণ্য হবে।
বিশ্ব বাণিজ্যে আমদানি রপ্তানি অবশ্যই থাকবে তবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বাণিজ্য ভারসাম্যের নিমিত্তে আমদানি এবং রপ্তানির মাঝে একটা সমতা থাকা দরকার। এই যে প্রতি বছর ১৫ লাখের মত বাংলাদেশি রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণের জন্য বিদেশে যান, তাহলে আমাদের দেখতে হবে যে কতোজন বিদেশি রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশে আসেন। যদি দেখি যে বিদেশি কোন রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশে আসেন না তাহলে আমরা বলতে পারি যে চিকিৎসা সেবা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ভারসাম্যহীন। অর্থাৎ চিকিৎসা সেবা বাণিজ্যে বাংলাদেশ শুধু আমদানিই করছে, কোন রপ্তানি নেই। এর প্রধান কারণ হতে পারে চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারীদের কাছে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্হার আস্হাহীনতা অথবা গুনগত মানের দিক দিয়ে বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেনা। যার ফলে আমরা প্রতি বছর হারাচ্ছি মোটা অংকের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা। একই সঙ্গে বাংলাদেশি চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারীরা সৃষ্টি করছে হাজার হাজার চিকিৎসক, সেবিকা এবং স্বাস্হ্য কর্মীর কর্মসংস্হান বাংলাদেশের পরিবর্তে চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারী দেশসমূহে।
আগামীতেও এই প্রবণতা চলতে থাকলে আমাদের চিকিৎসা খাতের অবস্থা আরও লেজেগোবরে পর্যায়ে চলে যাবে। কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ে, বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতকে বাঁচাতে এবং এর উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য যত সত্ত্বর সম্ভব বাংলাদেশি চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারীদের বিদেশ মূখিতা কমাতে হবে। আর এজন্য দরকার বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতের মৌলিক পরিবর্তন আনা। যার জন্য প্রথমেই দরকার জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সদ্বিচ্ছা। আর দরকার চিকিৎসা ব্যবস্হার উন্নয়নে বাস্তব ভিত্তিক পরিকল্পনা, কর্ম পন্থা এবং কার্যকরী লক্ষ্য। এসবের আওতায় পড়বে চিকিৎসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ যেখানে গবেষণা ভিত্তিক শিক্ষা প্রাধান্য পাবে, আর মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্হা তাত্ত্বিকের চেয়ে বেশি ব্যাবহারিক করতে হবে।
স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা খাতের উন্নয়নের জন্য অতি সত্ত্বর দেশি এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে একটা টাস্কফোর্স গঠন করা, যার উদ্দেশ্য হবে (১) স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা খাতের বর্তমান সক্ষমতা, দুর্বলতা, সুযোগ সুবিধা এবং হুমকি চিহ্নত করা (২) জাতীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরিমাপণ এবং (৩) স্বাস্হ্য এবং চিকিৎসা খাতের উন্নয়নে বাস্তব ভিত্তিক পরিকল্পনা প্রনয়ণ। স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা খাতের উন্নয়ন হলে (১) বাংলাদেশি চিকিৎসা সেবা গ্রহণকরীদের বিদেশমুখীতা হ্রাস পাবে (২) সাশ্রয় হবে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার (৩) কর্মসংস্থান হবে হাজার হাজার দেশীয় বেকার চিকিৎসক, সেবিকা ও স্বাস্থ্য কর্মীর (৪) অর্থনীতি হবে গতিশীল (৫) এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ এবং (৬) এগিয়ে যাব আমরা জাতি হিসেবে। মুক্ত বাণিজ্যের বদৌলতে তখন বিদেশি চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারীরা বাংলাদেশে আসবে, আমরা পরিণত হব চিকিৎসা সেবা আমদানিকারক দেশ থেকে চিকিৎসা সেবা রপ্তানিকারক দেশে। এর চেয়ে বড় গর্বের আর কি হতে পারে, আমাদের কাছে বাঙালি জাতি হিসেবে!
লেখক: ফিনল্যান্ড প্রবাসী, শিক্ষক ও গবেষক
- বিষয় :
- ড. কাজী ছাইদুল হালিম
- চতুরঙ্গ