ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অর্থনীতি

খেলাপি ঋণের চক্র থেকে মুক্তি জরুরি 

খেলাপি ঋণের চক্র থেকে মুক্তি জরুরি 
×

দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে গিয়ে রাষ্ট্র ও ব্যাংক যৌথভাবে কাজ করতে হবে

মো. রিদওয়ান আল হাসান

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:৪৩

দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য নির্ভর করে আর্থিক খাতের সুশৃঙ্খল প্রবাহের ওপর। ব্যাংকিং খাত যদি অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হয়, তবে মূলধন হলো এর রক্তপ্রবাহ। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে রক্তস্বল্পতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আকাশচুম্বী খেলাপি ঋণ। অর্থনীতির প্রতিটি সূচক একে অপরের সাথে যুক্ত। এক জায়গার শূন্যতা পুরো ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। আমাদের ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি এর বড় উদাহরণ। 

খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান
অর্থমন্ত্রীর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকার বেশি। এই অঙ্ক পৃথিবীর কয়েকটি দেশের মোট জিডিপি বা বাজেটের চেয়েও বড়। এটি আমাদের জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশ! সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এর মধ্যে প্রায় ৯১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা আটকে আছে মাত্র ২০ জন শীর্ষ খেলাপির কাছে। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো ও কেয়া কসমেটিকসসহ শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছ থেকে ২০২৫ সালে আদায় হয়েছে মাত্র ৪৬৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আদায়ের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৫১ শতাংশ। বিগত সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এরা বেশ কয়েকটি ব্যাংক শুষে নিয়েছে। এস আলম গ্রুপ একাই ছয়টি ব্যাংক দখলে নিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে, যা পৃথিবীর অর্থনীতির ইতিহাসে বিরল।
 

অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবের চক্র
খেলাপিদের থেকে টাকা আদায় তলানিতে নামায় ব্যাংকগুলো বড় মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সরকারের নিজস্ব ঋণ। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। এই ‘'ক্রাউডিং আউট’ ইফেক্টের ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকছে না। নিয়মিত ব্যবসায়ীরা চলতি মূলধন পাচ্ছেন না। আবার ঋণের অতিরিক্ত মুনাফার কারণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। বিটিএমএর তথ্যমতে, ব্যাংক থেকে সহায়তা ও পুনঃঅর্থায়নের অভাবে প্রায় ৩৫০টি পোশাক কারখানা এবং ৫০টির বেশি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়েছে। ৫ কোটি টাকা দেনার কারণে ২০০ কোটি টাকার কারখানাও বন্ধ হওয়ার নজির রয়েছে। অথচ আমাদের জিডিপির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে।
শিল্প কারখানা বন্ধ হওয়ায় উৎপাদন কমছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে। বাজারে চাহিদা থাকলেও পণ্য মিলছে না, ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি টিকে থাকছে। কর্মসংস্থান হারানো মানুষের আয় কমায় তাদের কেনার সামর্থ্যও কমে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ কেবল নিত্যপণ্য কিনে বেঁচে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে বিলাস পণ্যের চাহিদা কমে গিয়ে উৎপাদনশীল খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সাথে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা যুক্ত হয়ে অর্থনীতিকে আরও সংকুচিত করেছে। 
যার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হারের দিকে তাকালেই। তা ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যা করোনাকালের পর সর্বনিম্ন। এডিবি বলছে, চলতি অর্থবছরেও এই হার ৪ শতাংশ পার হবে না। অন্যদিকে গেল অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমায় প্রবেশ করেছে (বিশ্বব্যাংক)। তবে, প্রায় ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি এবং সাড়ে তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধির দেশে এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। অন্যদিকে, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো বৈদেশিক ঋণের কিস্তি এবং বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে অর্থনীতিতে বড় দুর্যোগ চলছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মহামন্দা, বেকারত্ব ও চরম বৈষম্য দেখা দেয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। জ্বালানি তেলসহ আমদানিকৃত পণ্যের দাম সমন্বয়সহ নানান কারণে আসন্ন বাজেট প্রণয়ন এবং বাজেট ঘাটতি পূরণ সরকারের জন্য আরও চ্যালেঞ্জিং হবে। 

খেলাপি ঋণ আদায়ের ইতিবাচক প্রভাব ও সম্ভাবনা
এই বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব হলে অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে শুরু করবে।
প্রথমত, ব্যাংকের ভল্টে নগদ অর্থ বাড়বে এবং মূলধন ঘাটতি কাটবে। সরকারকে বারবার ব্যাংকগুলোতে মূলধন যোগান দিতে হবে না। সরকার এই অর্থ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, তারল্য বাড়লে বাজারে ঋণের সরবরাহ বাড়বে। ব্যবসায়ীরা সহজ শর্তে ঋণ পাবেন। স্থবির হওয়া হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আবার উৎপাদনে আসবে। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকগুলো কম মুনাফায় ঋণ দিতে পারবে। এতে উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ সম্ভব হবে। এটি সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাবে। বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়লে বেকারত্ব কমবে। চাকরি হারানো শ্রমিকরা কাজে ফিরবেন। নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে তরুণদের জন্য কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। মানুষের আয় বাড়লে বাজারের আকার ও চাহিদা বাড়বে। উৎপাদন বাড়লে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে, যা টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।


সংকট উত্তরণে করণীয়
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এক শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে। এতে কাগজে কলমে ৮৭ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমলেও প্রকৃত নগদ টাকা ফেরত আসেনি। এটি মূলত সাময়িক কসমেটিক সমাধান। দ্রুত এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। 
অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলে, কঠোর আইন প্রয়োগ হলে খেলাপি ঋণ কমে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা জনগণের টাকা আত্মসাৎ করে পার পেয়ে গেলে সমাজের দুর্ভোগ বাড়তেই থাকবে।
তবে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ ভিন্ন হওয়া উচিত। তাদের সরাসরি জেলে দিলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। কারখানা বন্ধ না করে, নৈতিক ও আইনি চাপের মাধ্যমে তদারকি বাড়িয়ে নিয়মিত কিস্তি আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে গিয়ে রাষ্ট্র এবং ব্যাংক যৌথভাবে ঋণগ্রহীতা এবং উদ্যোক্তাদের সমস্যা সমাধানে আলোচনা করলে ব্যাংকিং খাতের সংকট দ্রুত কাটবে।
মূলধন বাড়াতে মানুষকে ব্যাংক হিসাব খুলতে এবং টাকা জমা রাখতে আকর্ষণীয় স্কিম নিতে হবে। সঞ্চিত অর্থ যেন ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে না থাকে সে বিষয়ে ব্যাপক গণসংযোগ করতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্রে সফল ব্যাংকিং খাত ছাড়া উন্নতি সম্ভব নয়। ইসলামী ব্যাংকিং, স্কুল ব্যাংকিং বা সহজ অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে ব্যাংকে লেনদেনে আগ্রহী করতে হবে। হুন্ডি, অবৈধ লেনদেন ঠেকিয়ে ব্যাংকিং চ্যানলে লেনদেন বাড়ানো গেলে লেনদেন যেমন নিরাপদ থাকবে, তেমনি অর্থের প্রবাহও বাড়বে।  
নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা, শক্তিশালী আইন এবং পেশাদার ব্যাংক পরিচালনার মাধ্যমে আটকে থাকা মূলধন উদ্ধার করা গেলে আমরা অর্থনৈতিক অচলাবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারব। পাশাপাশি আর্থিক দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধে স্কুল পর্যায় থেকেই নৈতিক শিক্ষার প্রচলন জরুরি।

মো. রিদওয়ান আল হাসান: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×