ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

যুদ্ধবন্দী শৈশব (পর্ব- ২)

যুদ্ধবন্দী শৈশব (পর্ব- ২)
×

সুরাইয়া পারভীন

সুরাইয়া পারভীন

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০২:১৩

ইতোমধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের প্লেন নিয়ে পালানোর চেষ্টার ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা ভীষণ ভয় পেয়ে যায় তখন। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তারা ডিফেন্সে কর্মরত সব বাঙালিদের অফিস এবং বেতন বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া ডিফেন্সের সদস্যরা যে রেশন পেতেন, তাও বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সব এয়ারম্যানদের জন্য নতুন ডিউটি নির্ধারণ করা হয়- সকাল-বিকেল নতুন অফিসে হাজিরা দেওয়া। তারা রোল কল করে দেখতো সবাই আছে, নাকি কেউ পালিয়েছে।

এ সময় ঢালাওভাবে ডিফেন্সের সব র‍্যাঙ্কের এয়ারম্যানদের জন্য ১৫০ টাকা করে অ্যালাউন্সের ব্যবস্থা করা হয়। এখানে কার র‍্যাঙ্ক কী বা কার পরিবারে কতজন সদস্য, তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অথচ তাদের তখন বেতন ছিল ন্যূনতম ৪০০-৫০০ টাকা এবং অনেকের তারও বেশি। এ অবস্থায় বাঙালিরা মহাবির্পযয়ের  মধ্যে পড়ে যান। এ সময় এগিয়ে আসে রেডক্রস। কিন্তু ভুট্টো সাহেব তাদের কোনো কাজ করতে দিলেন না। অনেকে ক্যাম্পের গেটে রিলিফ আসতো, কিন্তু সেটা  গ্রহণ করা নিষেধ ছিল। তা ছাড়া এয়ারম্যানদের যত সমস্যাই থাকুক না কেন, রিলিফ গ্রহণ করা তাদের জন্য লজ্জাজনকও ছিল।

আল্লাহর রহমতে আমার বাবা, বেশ ভালো আর্থিক অবস্থা নিয়ে সৌদি থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে আসেন। সেই সময় বাবাকে দেখেছি কী নিঃস্বার্থ আর কী মমতা নিয়ে বাঙালিদের সাহায্য করেছেন। তিনি বলতেন, দেশে গিয়ে ফেরত দেবেন কী দেবেন না সেটা পারের কথা, আগে তো এ বিপদের দিনে বাঙালি ভাইয়েরা বাঁচুক।

আমাদের স্কুলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাঙালি অভিভাবকরা বেশ চিন্তায় পড়ে যান। কবে দেশে ফেরা যাবে বা আদৌ যাওয়া হবে কি-না সে বিষয়টি ছিল অনিশ্চিত। তাই ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে সব বাঙালি এয়ারম্যান মিলে একটি স্কুল কমিটি গঠন করেন। বিভিন্নজনের বাসায় থাকা ছোট্ট  জায়গাগুলোতে গড়ে তোলা হয় ক্লাসরুম। এয়ারম্যানরাই হয়ে যান শিক্ষক। ফের শুরু হয় আমাদের স্কুল।

ক্যাম্পে এক বিকেলে আমরা কয়েকজন বান্ধবী মিলে হাঁটাহাঁটি করছি। এয়ারম্যান কাকারাও বাচ্চাদের হাত ধরে হাঁটাহাঁটি করছেন। হঠাৎই ভীষণ শব্দ- মাথার ওপর ভারতীয় যুদ্ধবিমান। কী করবো বুঝতে পারছি না। কাকারা বললেন, 'সিঁড়িঘরে যাও, সিঁড়িঘরে যাও।' যে যার মতো সিঁড়িঘরে চলে গেলাম আমরা। আমি আমাদের বিল্ডিংয়ের সামনে যে বিল্ডিং ছিল সেটার সিঁড়িঘরে গিয়ে উঠলাম। যুদ্ধবিমান এতো নিচে দিয়ে যাচ্ছিল যে, মনে হচ্ছি এখনই বুঝি বিল্ডিংয়ের সঙ্গে ঘষা খাবে। আর যে প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছিল- কান দুই হাতে চেপে রাখার পরও মনে হচ্ছিল- কান ফেটে যাবে। যুদ্ধবিমানগুলো এতো নিচ দিয়ে যচ্ছিল যে, আমরা পাইলটকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল- এক্ষুনি বোম্বিং করবে আর সব শেষ হয়ে যাবে। আমার মনে হচ্ছিল- মৃত্যুর আগে আম্মকে আর দেখতে পাব না! কিছুক্ষণ পর প্লেন চলে গেল। জানিনা কতক্ষণ পর, কিন্তু মনে হচ্ছিল এক জীবন পার হয়ে গেছে।

বেশিরভাগ সময়ে রাতের বেলায় বিমান হামলা হতো। এমনই এক রাতে আমরা একই রুমে রাতে অবস্থান করি। আমাদের বাচ্চাদের এবং মায়েদের শোওয়ার ব্যবস্থা হলেও, আব্বা ও কাকা কানের কাছে রেডিও নিয়ে নব ঘুড়িয়ে সংবাদ শোনাতেই ব্যস্ত ছিলেন। তখন বিবিসির সংবাদের ওপরই নির্ভর করতো সবাই। কাকা রেডিও শুনতে শুনতে হঠাৎ উচ্ছ্বসিত, বললেন, যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেছে। দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। এত বড় আনন্দের কথা, কিন্তু উচ্ছ্বাস প্রকাশের কোনো উপায় ছিল না। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও পাকিস্তানের হাতে বন্দী। সকলে তাঁকিয়ে তার দিকে- তিনি দেশে ফিরলে আমাদেরও নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা হবে।

এদিকে ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাঙালিদের ওপর অত্যাচার বেড়ে যায়।  ক্যাম্পের শেষ প্রান্তের ডাবল রুম অর্থাৎ বিল্ডিং গুলোয় এক ফ্ল্যাটে দুই বাঙালি ফ্যামিলিকে রেখে একত্র করে ফেলার ব্যবস্থা করা হলো। এভাবে ডাবল রুমে একত্র করা হলো সব বাঙালিকে। বড় ফ্যামিলির সঙ্গে ছোট ফ্যামিলি- এভাবেই সমন্বয় করে রাখা হলো বাঙালি পরিবারগুলোকে। যখন সব বাঙালিকে ক্যাম্পের এক পাশে একত্রিত করা হলো তখন সকলের মনে ভয়- এখন সব বাঙালিকে ইচ্ছে হলেই বম্বিং করে মেরে ফেলতে পারে তারা। কান্নাকাটি শুরু হলে আমার বাবাসহ এয়ারম্যান কাকারা বললেন, ডিফেন্সের লোকদের মেরে ফেলা এত সহজ নয়। সারা বিশ্বের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তা ছাড়া পাকিস্তানি সেনারাও তো বাংলাদেশে বন্দী ছিল। আমাদের কিছু হলে তারাও তো রেহাই পাবে না। সব বাঙালিদের ঘিরে পাহারার ব্যবস্থা হলো।

এরই মাঝে খবর চাউর হলো- বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে বাঙালিদের অন্য জায়গায় সরানো হচ্ছে। কোনো কোনো ক্যাম্পের বাঙালিদের মাঠের মাঝে তাঁবুতে নিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে পানির সমস্যা, শৌচাগারের সমস্যা, বিদ্যুতের সমস্যা। মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। ১৯৭৩ সালের জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারির একদিন আব্বা এসে জানালেন, তাদের তৈরি হতে বলা হয়েছে- এ ক্যাম্প থেকে অন্যত্র সরানো হবে। তবে কবে কোথায় নেওয়া হবে তার কিছুই জানানো হয়নি। কেবল জানিয়েছে- তিন রাত তিন দিনের পথ, পথের খাবার যেন সঙ্গে রাখা হয়।

[ চলবে ]

আরও পড়ুন

×