ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

যুদ্ধবন্দী শৈশব (পর্ব- ৪)

যুদ্ধবন্দী শৈশব (পর্ব- ৪)
×

সুরাইয়া পারভীন

সুরাইয়া পারভীন

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০৯:৩৪

বুলান্দহীলের এয়ারম্যান কাকাদের কৃষিকাজকে অনেকটা কৃষি বিপ্লবই বলা যায়। এ বিপ্লব ঘটালেন যারা বাংলোতে ছিলেন তারা। তাদের চারপাশে বড় বড় বাগান ছিল। প্রচুর জায়গা খালি পড়ে ছিল। এখানেও দুইবেলা রোলকলে যাওয়া ছাড়া, অফিসে যাওয়ার ব্যাপারটি তেমন ছিল না। সবাই কৃষিকাজ নিয়ে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

যারা ক্যাম্পের উল্টো দিকে শেল্টার টাইপের বাসায় ছিলেন, তাদের চারপাশে তেমন জায়গা ছিল না। ফলে তাদের চাষাবাদের সুযোগটি ছিল না। ওইসব বাসার যাদের সঙ্গে সখ্য রয়েছে তাদের উপহার হিসেবে শাকসবজি পাঠাতে লাগলেন 'কৃষি বিপ্লবীরা'। বেড়াতে গেলেও নিজ হাতে উৎপাদিত শাকসবজি  নিয়ে যেতেন। এটা নিয়ে বেশ আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হত। কার বাগানে কেমন ফলন হলো তা নিয়ে বেশ প্রতিযোগিতার ভাব থাকত সবার মাঝে।

নিজেদের এ আনন্দে ভুলিয়ে রাখা। এছাড়া যে ঘটনাগুলো ঘটছিল তা মেনে নেওয়া ছাড়া কিছু করার ছিল না। আর্থিকভাবে তো প্রথমেই পঙ্গু করে দিয়েছিলো। তার ওপর ক্যাম্পের একমাত্র ক্যান্টিনটি আরও বেশি করে মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছিল। ক্যান্টিনে বাচ্চাদের জন্য দুধটুকু পর্যন্ত বাইরের তুলনায় চড়া দামে কিনতে হতো। আর দুধে ইচ্ছামতো পানি মেশানো হতো- এটা জেনেশুনেও ওই দুধ বাচ্চাদের খাওয়াতে হতো। ক্যান্টিনে মাঝে মাঝে দুধও পাওয়া যেত না। কিছুই করার থাকতো না তখন । এছাড়া অনেক সময় প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই সেখানে পাওয়া যেতো না। আবার কেনাকাটার প্রয়োজনে ক্যাম্পের বাইরে যাওয়ারও অনুমতি ছিলো না।

কোনো হাসপাতাল ছিল না সেখানে। প্রথম দিকে নানাজনের নানা অসুখ-বিসুখ হলেও হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কয়েক মাস পর থেকে বড় ধরনের অসুখ-বিসুখে আবেদন করে অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হাসপাতালে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া যেতো। তবে শর্ত দেওয়া থাকতো, বাইরে কারো সঙ্গে কথা বলা যাবে না, কোনো দোকানে ঢোকা যাবে না, কিছু কেনাকাটা করা যাবে না। এটি করেই তারা ক্ষান্ত  থাকলো না,বাঙালি যারা বাইরে যেতো তাদের পেছনে সাদা পোশাকের স্পাই পাঠানো হতো। 

একবার এক এয়ারম্যান কাকা (নাম মনে নেই এখন)  অনুমতি নিয়ে ক্যাম্প থেকে বিশ মাইল দূরে সারগোদা হাসপাতালে যান। তিনি হাসপাতালের পাশের দোকান থেকে কিছু একটা কেনাকাটা করেন। উনি হয়তো ভেবেছিলেন এতো দূর দেখার কেউ নেই। কিন্তু এ সংবাদ ঠিকই ওসি'র কানে পৌঁছে যায় এবং তাকে এ বিষয়ে জবাবদিহি করতে হয়৷ তিনি বিষয়টির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং লিখিতভাবে ক্ষমা চান।

কিন্তু তাকে ক্ষমা করা হয়নি। ডিফেন্সের নিয়মে শাস্তির মুখোমুখি করা হয়েছিল। শাস্তি হিসেবে তাকে রোদের মধ্যে ডাবলিং (মধ্যদুপুরে ঘণ্টাব্যাপী অত্যন্ত কষ্টকর শারীরিক কসরত) করতে বাধ্য করা হয়। ডাবলিংয়ের নিয়ম হলো- নির্ধারিত সময়ের এক মিনিট আগেও যদি থেমে যাওয়া হয়, তাহলে আবার শুরু থেকে করতে হবে। অনেক সময় ডাবল সময় দলে ডাবলিং করার নির্দেশ দেওয়া হতো। এটি ছিল অত্যন্ত লজ্জার। 

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই কাকার বাসার সামনেই ছিল মাঠ। ঘণ্টাব্যাপী তার সন্তান ও স্ত্রীর সামনেই ডাবলিং করতে হয়েছিল তাকে। আমি সেদিন সকালে স্কুলে গিয়ে দেখি ক্লাস হবে না। যিনি ডাবলিং করাবেন তিনি আমার শিক্ষক, আমাদের তৃতীয় শ্রেণির ক্লাস নেন। আমি হতভম্ব হয়ে মাঠের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে উনাকে দেখে ফিরে আসি। সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও ভুলিনি। 

এখানে উল্লেখ্য যে, আমার মা তখন সন্তানসম্ভবা ছিলেন। নির্ধারিত সময়ে তাকে হাসপাতালে নিতে কোনো গাড়ির ব্যবস্থা করা যাচ্ছিল না। মাকে নিয়ে যখন মহবিপদে, ওসি সাহেব তখন তার জিপটিতে করে মাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। বিশ মাইলের দীর্ঘ উঁচুনিচু পথ। সারগোদা হাসপাতালে যাওয়ার পথে জিপের মধ্যেই আমার ছোটভাই বিপ্লবের জন্ম হয়। এজন্য রোলকলের সময় সবার সামনেই আমার বাবাকে তিরস্কার করা হয়। যা আমার মা অন্যের কাছে শুনেছেন, বাবা বিষয়টি মাকে জানাননি। 

দুইবেলা এয়ারম্যানদের রোলকলে যাওয়ার এবং প্রতি সপ্তাহে পরিবারের সদস্য গণনার বিষয়টি অব্যাহত ছিল সেখানেও। ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেও দেখে যাওয়া হতো। ওসি সাহেব পরের সপ্তাহে মাথা গণনার দিন এসে জিপে জন্ম নেওয়া আমার ছোট ভাইটিকে দেখার ইচ্ছা পোষণ করেন। দুধের মতো ভাইটিকে, আমার কোলে দেওয়া হলো তার সামনে নিয়ে যাওয়ার জন্য। উনি আমার ভাইটিকে দেখে খুব খুশি হন এবং দোয়া করেন, 'বড় হয়ে তুমিও যেন এমন জিপ চালাতে পারো।' আমার পরিচয়ও জানতে চান তিনি। তখন বাবা এগিয়ে গিয়ে বলেন, 'She is my daughter'। ওসি সাহেব বললেন, 'She is your daughter? She is like a Pathani'। এরপর আমাকে 'পাঠানি' বলে দুষ্টুমি করা হতো।

একদিন সন্ধ্যায় আব্বু ও তার সহকর্মীরা সবাই রোলকলে গেছেন। কোনো এক কারণে রোলকল থেকে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশ থেকে গার্ডরা হঠাৎ চিৎকার করতে ও হুইসেল দিতে শুরু করল। তারা ক্রমাগত গুলি ছুড়ছিল। আমরা তো ভয়ে কাঁপছিলাম। মনে হচ্ছিল কেয়ামত নেমে এসেছে। আমার আম্মা ও জসীম খালাম্মা কী করবেন বুঝে উঠতে না পেরে, আমার ভাই শাহিন, শামীম, বোন নাসরিন, ইয়াসমিন এবং আমার কোলে থাকা ছোটভাই বিপ্লব, চঞ্চল ভাই, স্বপন ভাই, সেলিম, আপ্পিসহ সবাইকে আমাদের দুই বাসার মাঝখানে যে বাথরুমটি ছিল, সেটির মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে দিলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে তারা বলছিলেন, 'মারতে এলে আমাদের আগে মেরে যাক।' এরপর আমাদের বললেন, বাথরুমের দুই পাশের দরজার শক্ত করে  ছিটকিনি লাগিয়ে রাখার জন্য। পাকিস্তানিরা তাদের মেরে ফেললে এবং এরপর বাথরুমের দরজা ধাক্কা দিতে থাকলে আমরা যেন না খুলি। 

কী এক অজানা কারণে মনে নেই, সেদিন বাবা একটু বেশিই দেরি করেছিলেন। বাবা ও তার সহকর্মী কাকা এসে যখন দরজা ধাক্কা দিচ্ছিলেন, পাকিস্তানিরা এসেছে ভেবে মা ও খালাম্মা অনেকক্ষণ দরজা  খোলেননি। বাবা ও তার সঙ্গে থাকা সহকর্মী কাকাও ভয় পেয়ে গেলেন৷ তারা চিৎকার করে আমাদের নাম ধরে ডাকছিলেন। এক সময় বাবার কণ্ঠ বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দরজা খোলেন মা৷ তারা এসে দেখেন সব বাচ্চারা বাথরুমের ভেতরে। বাথরুমের দরজা ধাক্কা দেওয়ার পরও আমরা দরজা খুলছিলাম না। পাকিস্তানিরা এসেছে ভেবে আমরাও ভয় পাচ্ছিলাম। এক পর্যায়ে বাবা ও মায়ের কণ্ঠ চিনতে পেরে আমরা বের হয়ে আসি।

পরদিন জানা যায়, অন্ধকারে কোনো একটা কুকুর ক্যাম্প থেকে বাইরে দৌড়ে গিয়েছিল,সেটি ভালো করে ঠাহর করতে না পেরে সেখানকার ডিউটিরত গার্ড, কোনো বাঙালি পালিয়ে যাচ্ছে মনে করে বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে তাদের সাংকেতিক ভাষায় চিৎকার করতে থাকে এবং এটি সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য এ ভুলের কারণে তাকে চাকরি হারাতে হয়েছিল। 

[চলবে]

আরও পড়ুন

×