যুদ্ধবন্দী শৈশব (পর্ব-৫)
সুরাইয়া পারভীন
সুরাইয়া পারভীন
প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০৮:০৪
ক্যাম্পে কুকুরের ছিল অবাধ বিচরণ। কুকুরগুলো যখন কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ক্যাম্প থেকে গ্রামে আর গ্রাম থেকে ক্যাম্পে দৌড়াদৌড়ি করতো, মনে হতো ওরা কত স্বাধীন। ওদের ইচ্ছার মূল্য আমার চেয়ে কত বেশি। কুকুরগুলো যখন কাঁটাতার অতিক্রম করে দৌড়ে চলে যায়, আমি কাঁটাতারের এপাড়ে দাঁড়িয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকি, দিগন্ত জোড়া মাঠ, মাঠে কার্পাস তুলার চাষ, সাদা রজনীগন্ধার মতো ফুটে আছে তুলার ফুল, বাতাস বইলে কিছু তুলা বাতাসের সঙ্গে উড়তে থাকে। অন্য পাশে আখ খেত। দূরে একটি ছোট্ট চালা ঘর, সারা দিন মেশিনের আওয়াজ। সেটি গিয়ে দেখার খুব ইচ্ছা, কিন্তু উপায় নেই।
সেই সময় আরও একটি সমস্যা বড় হয়ে দেখা দেয়, তা হলো- কিছু পরিবারে বিবাহযোগ্য ছেলে-মেয়ে ছিল। তাদের লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে সংক্রান্ত সমস্যাটিও বেশ ভাবিয়ে তোলে অভিভাবকদের। কবে দেশে ফেরা হবে, কবে বিয়েশাদি দেওয়া সম্ভব হবে- বিষয়টি নিয়ে তাদের অভিভাবকরা বেশ ভালো রকম সমস্যায় পড়ে গিয়েছিলেন। এই বন্দীশালার মধ্যেও ছেলে মেয়েদের চিরন্তন যে আবেদন- প্রেম-ভালবাসা, তা থেমে থাকেনি। সেখানে পছন্দ করা এক জুটি দেশে ফিরেও যখন তাদের সম্পর্ক ধরে রাখে, অভিভাবকরা তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন। যদিও দুইজনের জেলা দেশের দুই প্রান্তে।
সব বাঙালির দেশের সঙ্গে যোগাযোগ একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ সময় চিঠিপত্র আদান-প্রদানও একেবারেই বন্ধ ছিল। বিবিসি এবং অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম থেকে যেটুকু সংবাদ সংগ্রহ করা যেত, সেটুকুই ছিল দেশের সঙ্গে যোগাযোগ। এছাড়া 'শুভেচ্ছা বাণী' নামে একটি অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো বাংলাদেশ থেকে। সেখানে বাংলাদেশের আত্মীয়-স্বজনরা শুভেচ্ছা জানাতেন, বন্দী বাঙালি আত্মীয়-স্বজনদের৷ আমরা সাধারণত সেটি মিস করতাম না।আব্বার সঙ্গে গোল হয়ে, তীর্থের কাকের মত বসে থাকতাম কার কার আত্মীয়-স্বজন কাকে কাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তা শুনতে। এতে দেশের কিছু কিছু পরিস্থিতিও অনুমান করা যেত। কোরঙ্গী ক্রীক স্কুলের আমাদের একজন শিক্ষক পালিয়ে দেশে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিষয়টি তিনি জানিয়ে সব ছাত্রছাত্রীকে শুভেচ্ছা দেন। আমরা তখন বুলান্দ হীলে অবস্থান করছি, আমাদের সে কি আনন্দ!
এরই মাঝে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফেরেন। আমাদের আকাঙ্ক্ষা এবং অপেক্ষার গভীরতা দ্বিগুণ হয়। সবার আশা- এবার নিশ্চয়ই কিছু একটা হিল্লে হবে। কেবল নিরন্তর অপেক্ষা সেই সংবাদটির জন্য। সময় আর কাটে না। এভাবে দিন-মাস পেরিয়ে যেতে থাকে।
এক বিকেলে হঠাৎ করেই জানা গেল, দেশে ফেরার পথটি উন্মুক্ত হতে চলেছে। শিশুরা কাঠির আগায় কাগজ লাগিয়ে 'জয় বাংলা', 'জয় বাংলা' বলে আনন্দ করতে শুরু করে। তখন পর্যন্ত আমি ঠিক স্পষ্ট করে বুঝিনি- একবার তো দেশ স্বাধীন হয়েছে, আবার এত আনন্দের কি হলো! আসলে সে সময় রেডক্রসের মধ্যস্ততায় 'বন্দী বিনিময়' চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে। চুক্তিটির মূল বিষয় ছিল- এক প্লেন ভরে বাঙালি পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসবে এবং সেই প্লেনে বন্দী প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য যারা, আত্মসমর্পণের পর বাংলাদেশে বন্দী অবিস্থায় ছিল, তাদেরকে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। আমাদের তো আনন্দ আর ধরে না। মনে হচ্ছিল কালই দেশে ফিরে যাওয়া হবে। কিন্তু এই কাজটি সম্পন্ন করা এত সহজ ছিল না। কোন ক্যাম্পের বাঙালি আগে যাবে- চলছিল সেই হিসাব-নিকাশ। তবে যাই হোক, বাঙালিদের দেশে ফেরা তো অবশেষে শুরু হয়েছে। কিন্তু আমাদের অপেক্ষা যেন ফুরায় না, আমাদের ক্যাম্পের নাম যে সিরিয়ালে আসে না!
উল্লেখ্য যে, এই সময় আমাদের ক্যাম্পের বাঙ্গালিদের বাহিরে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। ক্যাম্পের বাহিরে যাওয়ার জন্য দরখাস্ত করে, অনুমতি নিয়ে গ্রুপ গ্রুপ করে গ্রাম দেখতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছিল। অনেকেই সুযোগটি গ্রহণ করে এবং গ্রাম দেখতে যায়। বিশেষ করে ভাইয়ারাই বেশি অনুমতি নিয়ে ক্যাম্পের বাহিরে ঘুরতে যেত। এই সময় গ্রামবাসীদের কাছ থেকে কিছু কিছু অভিযোগও আসছিল যে, তারা মাল্টা বাগান, আখ ক্ষেত এবং অন্যান্য বাগান নষ্ট করেছে। এই সময় বিভিন্ন পরিবারও অনুমতি নিয়ে বাহিরে ঘুরতে যেতেন। আমার ভাগ্যেও সেই সু্যোগ এসেছিল। ক্যাম্পের ভেতর থেকে কালো পাথরের যে বিশাল পাহাড়টি দেখা যেত, প্রথমে গিয়েই আমরা সেই পাহাড়টিতে চড়লাম। বিশাল পাহাড়, ছোট-খাট হিমালয় বলা যায়। বাংলাদেশে যেমন সবুজ মাটির পাহাড় রয়েছে, পাকিস্তানে তা নয়- কালো কুচকুচে পাথরের বিশাল আকৃতির বিশাল বড় বড় পাহাড়। আমরা বাচ্চারাই সবার আগে আগে দৌড়ে উঠে যাচ্ছিলাম। কিছুটা ওঠার পর, সেখান থেকে নেমে গ্রাম দেখতে যাই আমরা। গ্রামে বেশিরভাগই ছিল মাটির ঘর এবং মহিলারা ভুট্টা বা পপকর্ণ বিক্রি করছিল। পাহাড়ে চড়ে অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ায় গ্রাম আর ঠিকমত দেখা হয়নি, আমরা ফিরে যাই ক্যাম্পে।
এরই মধ্যে আমাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝিতে দেশে ফেরার জন্য আমাদের ক্যাম্পের সিরিয়াল আসে। পুরো ক্যাম্প যখন আনন্দে ভাসছিল, তখনই আবার জানা যায়, আমাদের ফেরার তারিখ পিছিয়ে গেছে। এভাবে বারবার নাম আসে আর পিছিয়ে যায়। কয়েক মাস কেটে যায় এভাবেই। আসলে এভাবে তারিখ পেছানোর জন্য দায়ী ছিলেন ওসি সাহেব নিজেই। তিনি চাননি আমরা এতো দ্রুত চলে যাই, কারণ বাঙালিদের ওসি হিসেবে থাকা তার জন্য লাভজনক ছিল। ফলে আমাদের ক্যাম্পের বাঙালিদের অপেক্ষা ছাড়া কিছুই করার ছিল না।
অবশেষে সেই ক্ষণ! এলো পিঞ্জিরা বদ্ধ পাখিদের আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার দিন। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই বার্তা। স্বপ্নের সেই তারিখ এবং সময়। রূপকথার গল্পকে হার মানিয়ে সত্যি সত্যি সামনে এসে দাঁড়ালো দেশে যাওয়ার তারিখটি! আমরা নিজ নিজ মালামাল গুছিয়ে প্রস্তুত। দশ মাসের বুলান্দহীল জীবনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে! সকলের যেমন গোছগাছ চলছিল, পাশাপাশি অন্য একটি তোড়জোড়ও চলছিল বেশ জোরে-সোরে। সেটা হলো ক্যাম্পে যে বিশাল বিশাল বৃক্ষরাজি ছিল, সেগুলো নিধন চলছিল। সেই রূপকথার বটগাছটিও বাদ যায়নি। খারাপ লাগছিল তো বটেই, পরিত্যক্ত, জঙ্গলাকীর্ণ ক্যাম্পটিকে যারা নিজ হাতে সুশোভিত করে তুলেছিল, এ ধ্বংসযজ্ঞ দেখে একটু হলেও খারাপ লাগাই স্বাভাবিক।ওসি সাহেব ব্যাক্তিগতভাবে গাছগুলো কাটিয়ে নিচ্ছিলেন। অবশ্য এজন্য তাকে পরে জবাবদিহি করতে হয়েছিল।
যাই হোক বাঙালিদের বাঁধভাঙা আনন্দে চলছিল প্রস্তুতি। ক্যাম্পে আসে ডিফেন্সের বড় বড়ে লড়ি। গন্তব্য করাচি। আবার তিন দিন তিন রাতের পথ! এবার বাঙালিদের গন্তব্য জানা! সেই ট্রেন, প্যাসেঞ্জার বগি আছে কিন্তু গার্ডদের বগি নেই, কোনো গার্ড নেই, তালা নেই, সিলগালা নেই, কারো সঙ্গে কথা বলতে বাধা নেই! আছে উদ্যাম আনন্দ, আছে দীর্ঘ অনিশ্চিত অপেক্ষার অবসান, আছে একটু একটু করে স্বপ্ন জয়ের কাছাকাছি যাওয়ার আনন্দ। নিজেদের বিশ্বাস। আছে আপেক্ষার সুখকর পরিণতি।
অবশেষে ট্রেন চলতে শুরু করেছে। কী আনন্দ! প্রতি স্টেশনে ট্রেন থামছে। স্টেশনে নেমে হাঁটাহাঁটি করছে অনেকে, এটা সেটা কিনছে, বিশেষ করে মহিলারা, কাঁচের চুড়ি কেনায় ব্যস্ত। দেশে ফিরছেন, বহু প্রতীক্ষিত ফেরা, আত্মিয়-স্বজনের জন্য কিছু কিছু গিফট নিয়ে যেতে কার না ইচ্ছা করে। কী বাঁধভাঙা আনন্দ বাঙালিদের।
আমাদের ফ্লাইট ছিল ভোররাতে। আগের সন্ধ্যা রাতেই প্রচণ্ড শীতের মধ্যেই হাজিরা দিতে হয় এয়ারপোর্টে গিয়ে। আমাদেরকে এয়ারপোর্টে নাস্তা দেওয়া হলো। এখানে উল্লেখ্য যে, আসার পথে যে ক্যাম্পগুলোতে আমাদের অবস্থান নিতে হয়েছে, তারাই আমাদের খাবার সরবরাহ করেছে। অবশেষে সেই ক্ষণ। আমাদের নিয়ে প্লেন আকাশে উড়লো৷ প্লেন থেকে নামা না পর্যন্ত একটা মৃদু ভয় কাজ করছিল, দেশে সত্যিই পৌঁছাতে পারবো তো? উল্লেখ্য যে, রেডক্রসই বিভিন্ন দেশের বিমান ব্যবহার করেন দুই দেশের বন্দী বিনিময়ের জন্য। আমাদের বন্দীর শৃঙ্খল ভেঙে, উড়িয়ে নিয়ে এসে, নিজ দেশে পৌঁছে দেয় আরিয়ানা আফগান এয়ারলাইন্স।
১৯৭৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর আমাদের বহনকারী প্লেনটি কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। দেশের মাটিতে পা রাখলাম আমরা! কী এক অদ্ভূত অনুভূতি! এটি আমার দেশ! আমার মায়ের দেশ! আমার বাবা-মায়ের জন্মভূমি! আমার মাতৃভূমি!
যখন এয়ারপোর্টে প্লেন থেকে নেমে রানওয়েতে একটি সাইনবোর্ডের দিকে আমার চোখ পড়লো। আমি প্রচণ্ড রকম বিস্মিত হয়ে পড়লাম। সাইনবোর্ডটি বাংলায় লেখা। এ বিষয়ে আমার বড় ভাইকে বললে উনি বললেন, বাংলাদেশের সব কিছু তো বাংলাতেই হবে৷ এয়ারপোর্ট থেকে আমাদেরকে সরাসরি কুর্মিটোলা এয়ারফোর্সের ব্যাচেলরদের ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হলো। এয়ারফোর্স ব্যারাক খালি করে সেখানে পাকিস্তান থেকে আসা বাঙালিদের জন্য প্রাথমিক স্টেশন তৈরি করা হয়েছিল, থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখান থেকে যেন সকলে যার যার সুবিধা মতো নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যেতে পারে। আমি সেখানে এসে দোকানের সব সাইনবোর্ডে বাংলা লেখা দেখতে পাই। যেখানে তাকাই সেখানেই বাংলা। হাত বাড়ালেই বাংলা পত্রিকা, বাংলা বই, মাঠে-ঘাটে সর্বত্র বাংলা কথা শোনা যায়, দূর থেকে মাইকে বাংলা গান ভেসে আসে, ভিক্ষুকেরা ভিক্ষা চাইছে বাংলায় গান গেয়ে গেয়ে। আমি ভীষণভাবে আপ্লুত। এই বাংলায় আমি প্রবেশ করেছি অবশেষে!
[সমাপ্ত]
- বিষয় :
- মুক্তিযুদ্ধ
- আত্মজীবনী
