নুহাশপল্লি
প্রকৃতির নীরবতায় যেন আজও হেঁটে বেড়ান হুমায়ূন আহমেদ
গাজীপুরে কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের স্মৃতিবিজড়িত নুহাশপল্লি। ছবি: সমকাল
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১১:২৮
আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে গাছের সবুজ পাতার দোল, পাখির ডাক– সব মিলিয়ে এ যেন এক স্বপ্নপুরী। যেখানে প্রকৃতি, নীরবতা আর স্মৃতি একাকার। ভেতরে পা রাখতেই উবে যায় নাগরিক জীবনের ক্লান্তি। বলছিলাম গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামের নুহাশপল্লির কথা।
নন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের ঠিকানা এই নুহাশপল্লি। এটি শুধু একটি রিসোর্টও নয়; এটি একজন সৃষ্টিশীল মানুষের কল্পনা, অনুভূতি, নান্দনিকতা এবং প্রকৃতিপ্রেমের বাস্তব রূপ।
১৯৯৭ সালে বড় ছেলে নুহাশের নাম অনুসারে ২৭ বিঘা জমির ওপর এই নুহাশপল্লি গড়ে তুলেন হুমায়ূন আহমেদ। তখনও হয়তো ভাবেননি, একদিন এই জায়গা হয়ে উঠবে অসংখ্য পাঠক-ভক্তের আবেগের কেন্দ্র। সময়ের পরিক্রমায় নুহাশপল্লি শুধু একটি ব্যক্তিগত অবকাশযাপন কেন্দ্র নয়, এটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবিজড়িত স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন আসেন প্রিয় লেখকের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে, তাঁর নির্মিত পৃথিবীকে নিজের চোখে দেখতে এবং কিছুক্ষণ নীরবে তাঁর উপস্থিতি অনুভব করতে।
নুহাশপল্লির ভেতরে প্রবেশ করতেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় প্রকৃতির নির্মল সৌন্দর্য। বিশাল সব গাছ, পরিচ্ছন্ন সবুজ ঘাস, ছায়াঘেরা পথ আর পাখির কলতানে ভরে থাকে পুরো পরিবেশ। এই পরিবেশেই ছড়িয়ে রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের নানা ভাবনার প্রতিফলন।
নুহাশপল্লির অন্যতম আকর্ষণ ‘খুলি পুকুর’। কঙ্কালের খুলির আদলে নির্মিত একটি স্থাপনার মুখ দিয়ে অনবরত ঝরে পড়ে পানি। নামের ভিন্নতা যেমন কৌতূহল সৃষ্টি করে, তেমনই নির্মাণশৈলীও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। একটু এগিয়ে গেলে দেখা যায় লেখকের প্রিয় ‘হোয়াইট হাউস’। এখানেই তিনি লেখালেখি করতেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন কিংবা একান্তে প্রকৃতিকে উপভোগ করতেন। চারপাশের গাছপালা আর খোলা বারান্দা যেন আজও তাঁর উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে।
নুহাশপল্লির ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বুলবুল বলেন, হুমায়ূন আহমেদ এই হোয়াইট হাউসেই থাকতেন। জলচকিতে বসে লিখতেন। কখনও পড়াশোনায় মগ্ন হতেন। সশরীরে তিনি নেই, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি সব সময়ই অনুভব করেন তারা।
নুহাশপল্লি আরেকটি আবেগঘন স্থান লীলাবতী দিঘি। দিঘির শান্ত জলে চারপাশের সবুজের প্রতিবিম্ব যেন আরও গভীর করে তোলে নীরবতাকে। কাঠেরপুল পেরিয়ে দ্বীপে যাওয়ার অভিজ্ঞতা দর্শনার্থীদের এক অন্যরকম অনুভূতি দেয়। চারদিকে গাছ, জলের মৃদু ঢেউ– সব মিলিয়ে এটি যেন ধ্যানমগ্ন এক প্রকৃতি।
তবে নুহাশপল্লির সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে আবেগময় স্থান নিঃসন্দেহে লিচুতলা। সেখানেই শায়িত আছেন কালজয়ী কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। সাদাপাথরে নির্মিত তাঁর সমাধির সামনে দাঁড়ালে অনেকেরই চোখই অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। কেউ নীরবে প্রার্থনা করেন, কেউ ফুল রেখে শ্রদ্ধা জানান, আবার কেউ দীর্ঘক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকেন। মনে হয় লেখক যেন এখানেই আছেন– এই গাছ, এই বাতাস আর নীরবতার মাঝে। নুহাশপল্লির সহকারী ম্যানেজার মো. পাপন বলেন, ‘কতো ভক্ত অনুরাগীকে যে এই লিচুতলায় এসে কাঁদতে দেখি। তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারি না।’
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নুহাশপল্লির কিছু স্থাপনা পুরোনো হয়েছে, কোথাও কোথাও রঙ ফিকে হয়েছে, টিনের চালে মরিচা ধরেছে। তবুও তাঁর আবেদন এতটুকু কমেনি। কারণ এই জায়গার সৌন্দর্য শুধু স্থাপত্যে নয়; এর প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে আছে স্মৃতিতে। একজন লেখকের স্বপ্ন, অনুভূতি এবং জীবনবোধ এখানে প্রতিনিয়ত নতুন করে ধরা দেয়।
হুমায়ূন আহমেদ একবার লিখেছিলেন– ‘মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তার সৃষ্টি বেঁচে থাকে’। নুহাশপল্লিতে গেলে সেই কথার সত্যতা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন এখনও সবুজ হয় বেঁচে আছে। বাতাসে, গাছের পাতায়, পাখির ডাকে, বৃষ্টির শব্দে এবং প্রতিটি পথের নীরবতায় যেন তিনি আজও হেঁটে বেড়ান।
রোববার নুহাশপল্লিতে গিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদের প্রকাশক অন্যপ্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম। তিনিও সে কথাই বললেন। মাজহারুল ইসলাম বলেন, নুহাশপল্লিতে এলে মনে হয় না প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ প্রয়াত হয়েছেন। মনে হয় প্রতি ঘাসে, প্রতি গাছে, প্রতি স্থাপনায় তিনি মিশে আছেন।
- বিষয় :
- গাজীপুর
- হুমায়ূন আহমেদ