ঘাড়ের কোনো ফোলায় এফএনএসি টেস্ট কতটা জরুরি
ডা. মো. আব্দুল হাফিজ শাফী
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঘাড়ে বা গলায় কোনো ফোলা দেখা দিলে অনেকেই বিষয়টিকে প্রাথমিকভাবে গুরুত্ব দেন না। কেউ এটিকে সাধারণ ঠান্ডা-সর্দির ফল মনে করেন, আবার কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। অথচ বাস্তবতা হলো–ঘাড়ের ফোলা বিভিন্ন রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। সুতরাং সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য সময়মতো উপযুক্ত পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। সন্দেহজনক হলে আমরা চিকিৎসকরা প্রায়ই একটি নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকি; যেটিকে বলে FNAC (Fine Needle Aspiration Cytology)।
FNAC কী?
FNAC একটি দ্রুত ডায়াগনস্টিক পদ্ধতি। এতে একটি সূক্ষ্ম সুঁইয়ের মাধ্যমে সন্দেহজনক ফোলা বা টিউমার থেকে অল্প পরিমাণ কোষ বা তরল সংগ্রহ করা হয়। পরে সেই নমুনা যথাযথ প্রক্রিয়াজাত করে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে (মাইক্রোস্কোপিক) পরীক্ষা করা হয়, যার মাধ্যমে ফোলার প্রকৃতি নির্ণয় করা সম্ভব হয়। টিউমার, সিস্ট বা সংক্রমণজনিত ক্ষত–সব ক্ষেত্রেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক মূল্যায়ন পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।
কেন এই পরীক্ষা প্রয়োজন?
ঘাড়ের ফোলা বিভিন্ন কারণে হতে পারে–লিম্ফ নোডের সংক্রমণ, থাইরয়েড গ্রন্থির নডিউল বা টিউমার, লালা গ্রন্থির সমস্যা কিংবা কোনো সিস্ট। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ সংক্রমণের ফল হলেও, কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর রোগের পূর্বাভাস হতে পারে।
বিশেষ করে ঘাড়ের ফোলা আসলে কী–ক্যান্সার, নাকি সাধারণ সিস্ট, নাকি কোনো বিনাইন (benign) টিউমার, নাকি গ্লান্ড টিবি–এই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য নির্ণয়ের জন্যই ইএনটি বিশেষজ্ঞরা FNAC পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের প্রকৃতি সম্পর্কে প্রাথমিক কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়, যা পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণে সহায়তা করে।
FNAC পরীক্ষা নিয়ে ভয়ের কিছু নেই:
FNAC নিয়ে অনেক রোগীর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় আশঙ্কা দেখা যায়। অনেকেই এটিকে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক বা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন। বাস্তবে FNAC একটি নিরাপদ ও সহনীয় প্রক্রিয়া।
l পরীক্ষা বহির্বিভাগেই সম্পন্ন করা যায়। এজন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
lFNAC সাধারণত পুরোটি সম্পন্ন হতে প্রায় ১০ মিনিট সময় লাগে, যার মধ্যে নমুনা সংগ্রহে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট।
l নমুনা প্রস্তুতি ও ল্যাবরেটরি প্রক্রিয়া শেষে রিপোর্ট পেতে স্থান-কাল ভেদে সাধারণত ১-২ দিন সময় লাগতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রিপোর্ট দিনে দিনেই দেওয়া সম্ভব।
l পরীক্ষার পর হালকা ব্যথা বা অস্বস্তি থাকতে পারে, যা সাধারণত দু’তিন দিনের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যায়।
l প্রয়োজনে হালকা ব্যথা বা অস্বস্তি কমাতে প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শে সেবন করা যেতে পারে।
রিপোর্টের নির্ভুলতার প্রয়োজনীয়তা ও করণীয়:
FNAC পরীক্ষার ক্ষেত্রে নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই প্যাথলজিস্ট যদি নমুনা সংগ্রহ ও মাইক্রোস্কোপিক বিশ্লেষণ উভয়ই সম্পন্ন করেন, তবে রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা আরও বৃদ্ধি পায়। রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসক রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করেন।
সচেতনতা জরুরি
ঘাড়ে কোনো ফোলা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলে কিংবা অন্যান্য উপসর্গ যুক্ত হলে তা কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, FNAC একটি সহজ, কম সময়সাপেক্ষ, নির্ভরযোগ্য এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী ডায়াগনস্টিক পদ্ধতি। তাই অযথা ভয় না পেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যথাসময়ে এই পরীক্ষা করানোই সচেতনতার পরিচয়।
[সহকারী অধ্যাপক (ইএনটি), সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল]
- বিষয় :
- অসুখ
