বয়স বাড়ছে হাড়ের যত্ন নিন
ডা. লুৎফুন্নাহার নিবিড়
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি কমে যাওয়া। সাধারণত ৬০ বছরের পর থেকে হাড় ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে, ফলে হাঁটু, কোমড় ও পায়ে ব্যথা অনুভূত হতে পারে এবং অল্প আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই বার্ধক্যে হাড়ের সুস্থতা বজায় রাখতে সচেতন জীবনযাপন অত্যন্ত জরুরি।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য সপ্তাহে অন্তত আড়াই ঘণ্টা মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা উপকারী। এটি দৈনিক গড়ে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট ব্যায়ামের সমান। যারা একবারে এত সময় ব্যায়াম করতে পারেন না, তারা দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে শারীরিক কর্মকাণ্ড করতে পারেন। হাঁটা, হালকা দৌড়, সিঁড়ি ব্যবহার, বাগান করা বা দৈনন্দিন কাজকর্মের মাধ্যমেও শরীর সক্রিয় রাখা সম্ভব। দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকা থেকে বিরত থাকা উচিত এবং প্রতি ২০ থেকে ৩০ মিনিট পরপর উঠে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করা প্রয়োজন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে। ফলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, যা হাড় ভাঙার একটি বড় কারণ। তাই ভারসাম্য রক্ষার জন্য নিয়মিত চোখ ও কান পরীক্ষা করা জরুরি, কারণ দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি শরীরের ভারসাম্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। যারা হাড়ক্ষয়জনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। ভারী কোনো বস্তু তুলতে হলে কোমড় বাঁকিয়ে না তুলে হাঁটু ভাঁজ করে নিচ থেকে তোলা নিরাপদ।
খাদ্যাভ্যাসও হাড়ের সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শরীরের ওজন স্বাভাবিক মাত্রায় রাখা জরুরি, কারণ অতিরিক্ত ওজন বা অত্যধিক কম ওজন উভয়ই হাড়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম এবং ১০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন ডি প্রয়োজন হয়। এসব পুষ্টি উপাদান মূলত খাবার থেকেই গ্রহণ করা উচিত।
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে রয়েছে দুধ ও দুধজাত খাবার, সামুদ্রিক মাছ, ডিম, কলিজা, সবুজ শাকসবজি এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল ও সয়াবিন। ছোট মাছসহ দেশীয় মাছও ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। এছাড়া সূর্যালোকের মাধ্যমে শরীরে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি তৈরি হয়, যা হাড়ের শক্তি বজায় রাখতে সহায়ক। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।
জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস হাড়ের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ধূমপান হাড়ের ক্ষয় ত্বরান্বিত করে এবং হাড়ের পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই হাড় ভালো রাখতে ধূমপান পরিহার করা প্রয়োজন। এ ছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমোনের পরিবর্তন ঘটে, যা হাড়ের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নারীদের মেনোপজের পর হাড়ক্ষয়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ কারণে
নির্দিষ্ট বয়সের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিশেষ করে হরমোনজনিত পরীক্ষা
করানো গুরুত্বপূর্ণ।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বার্ধক্যে হাড়ের সুস্থতা বজায় রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সচেতনতা ও নিয়মিত যত্নের মাধ্যমে হাড়ের দুর্বলতা কমানো সম্ভব এবং সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন বজায় রাখা যায়।
[সহকারী রেজিস্ট্রার (মেডিসিন), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ, ফরিদপুর ]
- বিষয় :
- হাড় ও দাঁত
